দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে ভোট দেওয়াকে শাহাদাত বা সাক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়। তাই কাউকে নির্বাচিত করার আগে, তার মধ্যে প্রকৃত নেতার গুণাবলি রয়েছে কি না সেটি যাচাই করে দেখা দরকার। নিচে কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন আদর্শ জনপ্রতিনিধির ১০টি গুণ তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহভীতি: একজন নেতার হৃদয়ে যদি আল্লাহর ভয় না থাকে, তবে তার দ্বারা জনগণের কল্যাণ আশা করা যায় না। নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহভীরু (সুরা হুজুরাত, ১৩)। বংশপরম্পরা বা সম্পদ নয়, তাকওয়াই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।
২. যোগ্যতা ও শক্তি: নেতৃত্বের জন্য কেবল ভালো মানুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং দায়িত্ব পালনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা থাকাও জরুরি। আল্লাহতায়ালা বলেন, আপনার কর্মী হিসেবে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত (সুরা কাসাস, ২৬)। এখানে শক্তিশালী বলতে কাজের দক্ষতা ও প্রজ্ঞাকে বোঝানো হয়েছে।
৩. আমানতদারিতা: জনগণের পবিত্র আমানত হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানুষের অধিকার রক্ষা করা নেতার ইমানি দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও (সুরা নিসা, ৫৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যার আমানতদারিতা নেই, তার ইমান নেই (মুসনাদে আহমদ, ১২৩৮৩)।
৪. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: একজন নেতার অন্যতম প্রধান কাজ হলো সমাজে ইনসাফ কায়েম করা। স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে বিচারকাজ সম্পন্ন করা অপরিহার্য। এরশাদ হয়েছে, তোমরা মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে (সুরা নিসা, ৫৮)। ন্যায়পরায়ণ শাসকের পুরস্কার সম্পর্কে নবিজি (সা.) বলেন, তার জন্য কিয়ামতের দিন আরশের নিচে বিশেষ ছায়ার ব্যবস্থা থাকবে (বুখারি, ৬৬০)।
৫. সত্যবাদিতা: মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা জনগণকে ধোঁকা দেওয়া একজন নেতার চরম নিন্দনীয় কাজ। নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার সত্য হতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথি হও (সুরা তাওবা, ১১৯)। হাদিস অনুযায়ী, ৩ শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না... তাদের মধ্যে একজন হলো মিথ্যাবাদী শাসক (মুসলিম, ১০৭)।
৬. পরামর্শভিত্তিক কাজ করা: ইসলামে একনায়কতন্ত্রের স্থান নেই। একজন যোগ্য নেতা কখনোই নিজের মতকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন না, বরং অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, তাদের কার্যাবলি সম্পাদিত হয় পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে (সুরা আশ-শুরা, ৩৮)। এমনকি আল্লাহ রাসুল (সা.)-কেও সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
৭. সেবার মানসিকতা: নেতা হবেন জনগণের সেবক, শোষক নন। যার মধ্যে জনসেবার মানসিকতা নেই, তিনি নেতা হওয়ার যোগ্য নন। রাসুল (সা.) বলেন, নেতা হলেন জনগণের সেবক (কানজুল উম্মাল, ১৭৫১৭)। তিনি দায়িত্বশীলদের জন্য এভাবে দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ, যে উম্মতের দায়িত্ব নিয়ে কঠোরতা আরোপ করে, তুমিও তার প্রতি কঠোর হও। আর যে নম্রতা প্রদর্শন করে, তুমিও তার প্রতি সদয় হও।’ (মুসলিম, ১৮২৮)।
৮. সহজলভ্যতা: নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়া নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য নয়। সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই তাদের অভাব-অভিযোগ জানাতে পারে, নেতার দরজা তাদের জন্য সব সময় খোলা থাকতে হবে। যাকে আল্লাহ কোনো বিষয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন, এর পর সে যদি তাদের প্রয়োজনের সময় নিজেকে আড়াল করে রাখে, তবে আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার কাছে নিজেকে আড়াল করে রাখবেন (আবু দাউদ, ২৯৪৮)।
৯. পদের লোভ না থাকা: যে ব্যক্তি নিজে থেকে ক্ষমতা চায়, তাকে ওই পদের জন্য অযোগ্য মনে করা হয়। কারণ পদের লোভ তাকে দুর্নীতিপরায়ণ করতে পারে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, চেয়ে চেয়ে নেতৃত্ব নিও না। কেননা, চাওয়ার পর কোনো কিছু দেওয়া হলে, সেটা তোমার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হবে অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য পাবে না (বুখারি, ৬৬২২)।
১০. প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা: নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যেসব ওয়াদা করেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তা রক্ষা করা ফরজ। ওয়াদা ভঙ্গ করা মোনাফিকির লক্ষণ। পবিত্র কোরআনে এসেছে, তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে (সুরা বনি ইসরাইল, ৩৪)। তাই একজন নেতার কথা ও কাজে মিল থাকা আবশ্যক।
ভোট একটি আমানত। তাই কেবল আবেগ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে নয়, বরং গুণাবলি বিচার করে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া আমাদের ইমানি দায়িত্ব।
লেখক: শিক্ষার্থী, টেকেরহাট পপুলার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাদারীপুর