আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সিফাত বা গুণের বিবেচনায় জান্নাতের নাম ও সংখ্যা একাধিক হলেও মৌলিকতা বিচারে জান্নাত মূলত একটি-ই। মৌলিকতার বিচারে এক কিন্তু গুণগত বিবেচনায় একাধিক।’ (হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১১)
সাধারণত আটটি জান্নাতের কথা, নাম ও পরিচয়ের তথ্য প্রচলিত থাকলেও পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণনায় প্রায় ১২টি জান্নাতের কথা, নাম ও পরিচয় পাওয়া যায়—
১. জান্নাত—জান্নাতের শাব্দিক অর্থ বাগান বা উদ্যান। পরকালীন জীবনের শান্তির নিবাস বোঝাতে এ নামটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে এবং এ নামটি সর্বজনবিদিত। এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যে আমল করতে তার প্রতিদানস্বরূপ তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সুরা নাহল, ৩২)
২. দারুস সালাম—দারুস সালাম আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। ‘দার’ মানে দরজা, ঘর, নিবাস আর ‘সালাম’ মানে শান্তি বা নিরাপত্তা। দারুস সালাম মানে শান্তি বা নিরাপত্তার নিবাস। এরশাদ করেছেন, ‘তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে দারুস সালাম বা শান্তির নিবাস রয়েছে।’ (সুরা আনআম, ১২৭)
৩. দারুল খুলদ—দারুল খুলদ আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। ‘দার’ মানে দরজা, ঘর, নিবাস আর ‘খুলদ’ মানে স্থায়ী। দারুল খুলদ মানে স্থায়ী নিবাস। এ জান্নাতে প্রবেশপথ আছে কিন্তু বের হওয়ার কোনো দরজা নেই।
৪. দারুল মুকামাহ—দারুল মুকামাহ আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। ‘দার’ মানে দরজা, ঘর, নিবাস আর ‘মুকামাহ’ মানে স্থায়ী বা চিরস্থায়ী। দারুল মুকামাহ মানে চিরস্থায়ী নিবাস।
৫. জান্নাতুল মাওয়া—জান্নাতুল মাওয়া আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এ জান্নাতকে শহিদদের জান্নাত বলা হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেকবার সিদরাতুল মুনতাহার বরইগাছের কাছে দেখেছেন, যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত।’ (সুরা নাজম, ১৩-১৫)
৬. জান্নাতুল আদন—জান্নাতুল আদন আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ স্থায়ী বা অবিনশ্বর বাসগৃহ। চিরন্তন নীড়। জান্নাতুল আদন হলো স্থায়ী ও চিরঞ্জীব জান্নাত। (হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১৪)
৭. দারুল হায়াওয়ান—দারুল হায়াওয়ান আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ স্থায়ী নিবাস। মুমিনদের পরকালীন স্থায়ী নিবাস বোঝাতে এ নামটি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই পরকালীন নিবাসই স্থায়ী।’ (সুরা আনকাবুত, ৬৪)
৮. জান্নাতুল ফেরদৌস—জান্নাতুল ফেরদৌস আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ উৎকৃষ্ট বা উত্তম স্থান। সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট জান্নাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। এরশাদ করেছেন, ‘তারাই জান্নাতুল ফেরদৌসের অধিকারী হবে; সেখানে তারা বসবাস করবে অনন্তকাল।’ (সুরা মুমিনুন, ১০-১১)
৯. জান্নাতুন নাঈম—জান্নাতুন নাঈম আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ সুখময় নিসাব। এ জান্নাতে থাকবে শুধু সুখ আর শান্তি। থাকবে না কোনো দুঃখ-কষ্ট। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে; তাদের জন্য রয়েছে সুখময় জান্নাত।’ (সুরা লুকমান, ৮)
১০. মাকামুন আমিন—মাকামুন আমিন আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ নিরাপদ বা নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থান। এ জান্নাতে সব ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। (হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১৬)। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘মুত্তাকিরা থাকবে মাকামুন আমিন বা নিরাপদ স্থানে।’ (সুরা দুখান, ৫১)
১১. মাকআদু সিদক—মাকআদু সিদক আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ উপযুক্ত আসন। যথাযোগ্য আসন। এ জান্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো, যত সুন্দর সুন্দর আসন ও বসার স্থান চাওয়া হবে, সবই পাওয়া যাবে। (হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১৭) আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘মুত্তাকিরা থাকবে নদীবিধৌত জান্নাতের উপযুক্ত আসনে বা যথাযোগ্য আসনে।’ (সুরা কমার, ৫৪-৫৫)
১২. কদামু সিদক—কাদামু সিদক আরবি দুটি শব্দের যুগল রূপ। অর্থ হলো সুউচ্চ মর্যাদা। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের সুসংবাদ দিন, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা।’ (সুরা ইউনুস, ২)
জান্নাতের সংখ্যা ৮টি নাকি ১২টি এটা যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—জান্নাতের সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে বা কমও হতে পারে।
কারণ, এটা পরকালীন বিষয়। এ বিষয়ে কোনোভাবেই তা মতবিরোধ নয়। সুতরাং এটা নিয়ে কোনো তর্ক-বিতর্কে জড়ানো উচিত না। মৌলিকভাবে জান্নাত একটি হতে পারে, হতে পারে আরও বেশিও ।
লেখক: প্রাবন্ধিক