বর্তমান যুগ হলো তথ্য-প্রযুক্তির যুগ বা ডিজিটাল যুগ। স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি যেমন উপকার বয়ে এনেছে, তেমনি এর অপব্যবহার ব্যক্তি, পরিবার ও জাতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম অনলাইন আসক্তি, ভুয়া তথ্যে প্রচার-প্রসার, সাইবার বুলিংসহ নৈতিক অবক্ষয় ও সময় অপচয়ের শিকার হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা Gaming Disorder-কে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ২০১৮ সালে Journal of Social and Clinical Psychology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত করলে বিষণ্নতা ও একাকিত্ব কমে।
Stanford University-এর একজন গবেষক দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কের মনোযোগ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয়। MIT-এর গবেষণা প্রমাণ করে— অনলাইনে ভুয়া খবর সত্য খবরের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সামাজিক বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ ও সহিংসতা পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে।
অনলাইনে অশালীন কনটেন্ট সহজলভ্য হওয়ায় কিশোর-কিশোরীদের চরিত্র ও নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে গড়ে একজন মানুষ প্রতিদিন প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা ইন্টারনেটে সময় ব্যয় করে। এই সময়ের বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে চলে যায়, যা ব্যক্তি ও জাতির উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মসংযম, নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ মাস। রোজার আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির এই শিক্ষা অনলাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রযোজ্য। রোজায় মানুষ হালাল খাবার থেকেও বিরত থাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এতে ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, সংযমের অনুশীলন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়। রমজানের এই সংযমের শক্তি অনলাইন ব্যবহারে প্রয়োগ করলে আসক্তি কমানো সম্ভব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারি, ১৯০৩) এ হাদিস স্পষ্ট করে—রোজা শুধু ক্ষুধা সহ্য করা নয়; মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা। অনলাইনে ভুয়া খবর শেয়ার করা, কটূক্তি করা বা অশ্লীল কনটেন্ট দেখা—এসব রোজার চেতনার পরিপন্থি।
রমজানে সাহরি, ইফতার, তারাবি—সবকিছু নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী হয়। এতে সময়ের মূল্য শেখা যায়। এই অভ্যাস অনলাইন সময় ব্যবহারে প্রয়োগ করলে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমে এবং ফলপ্রসূ কাজে সময় বাড়ে। রমজানে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কমে। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত—সোশ্যাল মিডিয়া কম ব্যবহার করলে মানসিক প্রশান্তি বাড়ে।
রমজানে মানুষ দান-সদকা ও কল্যাণমূলক কাজে আগ্রহী হয়। অনলাইনে ইতিবাচক, শিক্ষামূলক ও সত্য তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া একটি সওয়াবের কাজ হতে পারে। এতে ডিজিটাল পরিবেশও সুস্থ হয়।
অনলাইনের নানামুখি আসক্তি কমাতে পাশে দাঁড়িয়েছে কাহাফ পরিবার। মুসিলম পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল সুরক্ষা দিতে তারা তৈরি করেছে একটি ইকোসিস্টেম। ডিভাইসে Safe Internet, Focus Mode, Parental Control, Habit Tracker-এর কাজ করবে Kahf Guard। নিরাপদ ব্রাউজারের (ছবি/ভিডিও blur, DNS সুরক্ষা) নতুন অভিজ্ঞতা দিবে Kahf Browser। শিশুদের জন্য নিরাপদ কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম Kahf Kids। পরিবারের নেটওয়ার্কে Safe Internet সংযোগ রাখতে তৈরি করেছে Kahf Internet। অশ্লীলতায় পূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়ার বিকল্প হিসেবে তারা এনেছ নিরাপদ সোশ্যাল মিডিয়া Hikmah। এছাড়া রয়েছে ইউটিউবের বিকল্প নিরাপদ ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাপফর্ম Mahfil। ডিজিটাল দুনিয়ায় মুসলিম পরিবারের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে Kahf। কাহাফের প্রতিটি সেবা—একটি অপরটির পরিপূরক।
অনলাইন প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি দিয়ে যেমন জাতি গড়া যায়, তেমনি ধ্বংসও ডেকে আনা যায়। গবেষণা বলছে—অসংযত ব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতি করছে। আর রমজান আমাদের শেখায় সংযম, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। যদি আমরা রোজার আত্মসংযম, সময়শৃঙ্খলা ও তাকওয়ার শিক্ষা অনলাইন জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে ডিজিটাল জগৎ হবে নিরাপদ ও কল্যাণকর। সচেতন অনলাইন ব্যবহারই পারে একটি সুস্থ, নৈতিক ও উন্নত জাতি গড়ে তুলতে।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক