বস্তুবাদিতার এ যুগে আমাদের ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও আচার-ব্যবহার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বস্তুবাদ শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করেছে। এর জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই–আমাদের ধর্মীয় জ্ঞানের প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা ও আত্মকেন্দ্রিকতা। যার ফলে বস্তুবাদ ও প্রয়োগবাদ আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। আমরা চাইলেও এসব থেকে দূরে থাকতে পারি না। কারণ, বস্তুবাদ আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীটাকে রঙিন করে সাজিয়ে রেখেছে। তারা বলে–এই চাকচিক্যময় দুনিয়াকে উপভোগ করো, বিলাসবহুল জীবনযাপন করো, জীবন তো একটাই। মৃত্যুর পর আর কোনো জীবন নেই। সুতরাং জীবনটা উপভোগ করো, খাও-দাও, ফুর্তি করো। এই বস্তুবাদিতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা।
আল্লাহ পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন আমাদের জ্ঞানার্জনের উপায় হিসেবে। পড়ো—আর সে পড়াটা হবে একমাত্র আল্লাহর নামে। আল্লাহতায়ালা সুরা আলাকের শুরুতেই বলেন, পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এক টুকরো জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। (সুরা আলাক, ১-২) এখানে আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির রহস্যও বলে দিয়েছেন, যা জীববিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি।
শিশুকাল থেকেই ধর্মীয় জ্ঞানে আগ্রহী হওয়া জরুরি। তা সম্ভব না হলে এখন থেকেই শুরু করা দরকার। জানার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ৮০ বছরের বৃদ্ধও চাইলে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা অনুকরণপ্রিয়। তারা চোখ দিয়ে শেখে। শিশুদের শিক্ষার প্রথম ও প্রধান বিদ্যালয় হলো পরিবার।
মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন বলেন, জন্মের পর থেকে প্রায় ছয় মাস বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর পৃথিবীকে চেনার প্রধান মাধ্যম হলো তার মা-বাবা ও পরিবার। এ সময় শিশু তার মা-বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। সুতরাং আমাদের নিজেদেরও ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। পরিপূর্ণ জ্ঞান ছাড়া সামান্য বিপদেই আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। আমাদের ধর্মীয় জ্ঞানের মূল উৎস হলো কোরআন ও হাদিস। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, আনুগত্য করো আল্লাহ ও তার রাসুলের, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো। (সুরা আলে ইমরান, ১৩২)
ফুজাইল ইবনু ইয়াজ (রহ.) বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে যখন দেখি একজন মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে জানে, তথাপি সে আল্লাহর অবাধ্য হয়। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তাদের মধ্যে একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করত এবং তা বোঝার পরও জেনেশুনে তা পরিবর্তন করত। (সুরা বাকারা, ৭৫)। তিনি আরও এরশাদ করছেন, এরাই সেই লোক, যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়াকে কিনে নিয়েছে। (সুরা বাকারা, ৮৬)
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বস্তুবাদী হওয়ায় সামান্য বিপদে আমরা হতাশ হয়ে যাই। আত্মহত্যাও সহজলভ্য হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। (সুরা বাকারা, ১৫৫) তিনি আরও এরশাদ করেছেন, যখন বিপদ আসে, তখন তারা বলে—নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং আমরা তার কাছেই ফিরে যাব। (সুরা বাকারা, ১৫৬)। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। কাফেরদের শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে ইসলামিক শিক্ষার সংস্কার প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, হে ঈমানদাররা, তোমরা যদি কাফেরদের অনুসরণ করো, তবে তারা তোমাদের উল্টো পথে ফিরিয়ে দেবে; ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সুরা আলে ইমরান, ১৪৯)
ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে ভালো ও ধার্মিক বন্ধু অপরিহার্য। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তার রাসুল এবং মুমিনরা–যারা নামাজ কায়েম করে ও জাকাত দেয়। (সুরা মায়িদা, ৫৫) তিনি আরও এরশাদ করেছেন, আর যারা আল্লাহ, তার রাসুল ও মুমিনদের বন্ধু বানায়, তারাই আল্লাহর দল; তারাই বিজয়ী হবে। (সুরা মায়িদা, ৫৬)
সর্বশেষে বলা যায়, ধর্মীয় জ্ঞান ছাড়া বস্তুবাদিতা, প্রয়োগবাদ এবং পশ্চিমা মোহে আবদ্ধ এই সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এখনই সময় ইসলামিক শিক্ষার আলোয় ফিরে আসার।
লেখক: শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়