আধুনিক ফ্যাশনের যুগে আমরা অনেকেই জানি না চুল রাখার ব্যাপারে নবিজি (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ ও এর বিবর্তন কেমন ছিল! রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র অবয়বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর পরিপাটি কেশবিন্যাস। তিনি সর্বদা চুল পরিষ্কার ও সুবিন্যস্ত রাখতেন। সাহাবিদের বর্ণনা থেকে তাঁর চুলের দৈর্ঘ্য, ধরন এবং তা আঁচড়ানোর চমৎকার পদ্ধতি জানা যায়।
নবিজি (সা.)-এর চুল একদম সোজা বা অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস (রা.)-কে তাঁর চুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি অত্যধিক কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজা কেশবিশিষ্ট ছিলেন না। তাঁর কেশ উভয় কানের লতি পর্যন্ত শোভা পেত।’ (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১৩)
অবস্থাভেদে তাঁর চুল কখনো কাঁধের কাছাকাছি আবার কখনো কানের লতি পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) একত্রে একই পাত্রের পানি দ্বারা গোসল করতাম। আর তাঁর চুল কানের লতি এবং মধ্যবর্তী স্থান বরাবর লম্বা ছিল।’ (মিশকাত: ৪৪৬০, শারহুস-সুন্নাহ: ৩১৩৭)
হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবিজি (সা.) ছিলেন মধ্যমাকৃতির দেহবিশিষ্ট এবং তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান ছিল প্রশস্ত, যেখানে কানের লতি পর্যন্ত ঝুলন্ত চুলগুলো এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করত। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১, সহিহ মুসলিম: ৬২১০)
নবিজি (সা.) কীভাবে চুল আঁচড়াতেন, তার মাঝেও একটি সুন্দর ইতিহাস রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কার প্রাথমিক জীবনে রাসুল (সা.) তাঁর চুল সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন, অর্থাৎ কোনো সিঁথি করতেন না। সে সময় মক্কার মুশরিকরা মাথায় সিঁথি করত, আর আহলে কিতাবরা (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) চুল ঝুলিয়ে রাখত। ওহি না আসা পর্যন্ত রাসুল (সা.) আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি চুলে নিয়মিত সিঁথি করা শুরু করেন এবং এটিই তাঁর স্থায়ী সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫৮, নাসাঈ: ৫২৩৮)
নবিজি (সা.)-এর চুল রাখার আরেকটি বিশেষ রূপের কথা জানা যায় মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে। হজরত উম্মে হানি বিনতে আবু তালিব (রা.) বলেন, ‘একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি চুলের বেণি নিয়ে মক্কায় আগমন করেছিলেন।’ (আবু দাউদ: ৪১৯৩, ইবনে মাজাহ: ৩৬৩১)
মুহাদ্দিসিনদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বেণি বা ঝুঁটি নারীদের মতো ছিল না। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে চুল যেন ধুলোবালিতে এলোমেলো না হয়ে যায়, সেজন্য পুরুষালি গাম্ভীর্য বজায় রেখে চুলগুলোকে চারটি ভাগে সুন্দর ও পরিপাটি করে গুটিয়ে রাখা হয়েছিল। এটি পুরুষদের জন্য নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন নয়, বরং চুলের বিশেষ যত্নের একটি রূপ ছিল।রাসুল (সা.)-এর সুবিন্যস্ত চুলের এই বিবরণ আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিনের বাহ্যিক অবয়ব সর্বদা পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও সুন্দর হওয়া কতটা জরুরি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক