ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে গত বছরের ৮ আগস্ট। গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত হয় এই সরকার। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ অভ্যুত্থান ছিল না। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বমূলক রক্তক্ষয়ী বিস্ফোরণ ঘটেছিল এই আন্দোলনে। দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন, দুর্নীতি, ক্ষমতার উগ্র প্রকাশ এই আন্দোলনকে সফল করে তুলেছে। এই সফলতার পেছনে যে বিষয়টি প্রবলভাবে কাজ করেছে, সেটি হচ্ছে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষা। নিজের ইচ্ছেমতো নির্ভয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে উপভোগ করা, যাকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার পরিভাষা অনুসারে ‘গণতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করা হয়। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বহুত্ববাদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সর্বজনবান্ধব উদারনৈতিক গণতন্ত্রের অভিপ্রায় থেকে ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ছাত্র-জনতা। কিন্তু বাংলাদেশ গত এক বছরে কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে কতটা এগোল, সালতামামি করলে সফলতা ও ব্যর্থতা- উভয় চিত্রই সামনে চলে আসে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রেগ কাউফমান তার ‘গণতন্ত্রায়ণ’ শীর্ষক লেখায় বলেছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দিকে যেতে হলে পাঁচটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পরিবর্তন ঘটাতে হয়: রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সম্পৃক্তি ও ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন আর সিভিল সোসাইটির সম্মতি। গত এক বছরে সাফল্য ও ব্যর্থতা, প্রত্যাশা ও হতাশা, অর্জন ও বিসর্জন- এ রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
প্রথম যে সাফল্যটি এসেছে, সেটি অবাধ মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার। বিগত সরকারের সময়ে রাজনীতি চর্চার সুযোগ সীমিত ছিল। সভা, আন্দোলন করার ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন, সভা, ভিন্ন অবস্থান নেওয়াকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখা হতো। দমন করা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই চর্চা উন্মুক্ত হয়ে যায়। ব্যতিক্রম হিসেবে বিদায়ী সরকারি দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিষিদ্ধ করা হয়। এই উন্মুক্ত অবাধ রাজনৈতিক চর্চার ধারাতে এ পর্যন্ত ৩০টি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনে ১৪৫টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, এদের অধিকাংশই নামসর্বস্ব দল। এতে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তে নৈরাজ্য সৃষ্টির সম্ভাবনাই বেশি।
নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেছে জনপ্রশাসনেও। বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করার ব্যাপক হিড়িক পড়ে যায় এ সময়। সৃষ্টি হয় একদিকে ভয়, অন্যদিকে উল্লসিত হওয়ার পরিবেশ। একদিকে সুবিধাভোগীদের অবসরে পাঠানো-চাকরিচ্যুতি, অন্যদিকে বঞ্চিতদের পদোন্নতি। প্রশাসনে এখনো স্থিরতা আসেনি। তাদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কথা শোনা গেছে। কাটেনি ভয়, ফেরেনি কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ।
তবে সচিবালয়ে যেভাবে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটত, ব্যাঘাত ঘটত কাজের; ধীরে ধীরে তা কেটে যাচ্ছে।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নাজুক অবস্থায় আছে। প্রথম দিকে ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটেছে। পরে স্বাভাবিক হতে থাকে। তবে পুলিশের অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। সেনাবাহিনীকে এ কারণেই এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে সহায়তা করতে হচ্ছে। পুলিশের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এখনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ঘটেছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী জুলাই-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবার ফলে শিক্ষাঙ্গন ছিল অনেকটাই টালমাটাল। নানা স্তরের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাজপথ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মিছিল-আন্দোলন করেছেন। অটোপাস, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া, পরীক্ষা স্থগিত, পরীক্ষা বাতিল, রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, শিক্ষকদের হেনস্তা করা, শিক্ষকদের পদচ্যুতির মতো অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। পরিমার্জনার নামে যথাসময়ে পাঠ্যবই ছাপা না হওয়ায় তা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। কারিকুলামে পরিবর্তন এনে আবার সেই পুরোনো কারিকুলাম ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের শেষের দিকে শিক্ষাঙ্গনের এ অস্থিরতা কমে এলেও অস্থিরতা কাটেনি। মতাদর্শিক কারণে এখন আবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা কমিয়ে আনা না গেলে শিক্ষা ক্ষেত্রের সংকট থেকেই যাবে।
বৈদেশিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও টানাপোড়েন দেখা গেছে এই এক বছরে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখন শীতল। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। তবে বাংলাদেশ অনেক কাছাকাছি এসেছে চীনের। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিস্তা নদীব্যবস্থাপনা নিয়েও বাংলাদেশকে সহায়তা করবে চীন। শুল্ক সমস্যার সমাধান হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও সম্পর্ক আগের মতোই আছে।
সরকারের প্রথম দিকে অর্থনীতি ছিল সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির শুল্ক কূটনীতিতে সাফল্য পাওয়ায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। রেমিট্যান্সও দুই বার রেকর্ড স্পর্শ করেছে। কিন্তু শিল্পকারখানা ও বাণিজ্য স্বাভাবিক হয়নি। আগের তুলনায় বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছিল পুঁজিবাজারে। বড় অঙ্কের অর্থ এই বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে। শেয়ারগ্রহীতারা এ নিয়ে আন্দোলনও করেছেন। ধীরে ধীরে পুঁজিবাজার স্থির হচ্ছে, কিন্তু আস্থা ফিরে আসেনি।
নিয়োগ পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, তার কাজের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা। জুন মাসে তা কমলেও জুলাইয়ে আবার বেড়েছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম এখনো চড়া। বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হয়নি।
সাফল্য এসেছে ব্যাংকিং খাতে। তবে এ ক্ষেত্রে পতন ঠেকানো গেলেও অস্থিরতা কমেনি। গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। সাফল্য আছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ক্ষেত্রেও। বিশ্বব্যাংক, এডিবির ঋণ ছাড় এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থনীতির এ সূচকগুলো ইতিবাচক বলা যায়।
জ্যঁ লাচাপেল্লে, সেবাস্তিয়ান হেলমেইয়ার, আন্না লুরমান একটি গবেষণাপত্রে বলেছেন, ‘গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যাওয়া সহজ নয়। এ জন্য দরকার: (১) স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, (২) শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্গঠন, (৩) ঐতিহাসিক ক্ষোভকে প্রশমনে রাখা, (৪) অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং (৫) কর্তৃত্ববাদী নস্টালজিয়াকে গুরুত্ব দিয়েও তা থেকে সরে আসা। এসবের বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক হস্তান্তর, সংস্কার ও বিচার।
গণ-অভ্যুত্থানের বছরপূর্তির দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এর আগে এই নির্বাচনের দাবি নিয়ে সরকার, বিএনপিসহ কয়েকটি দলের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছিল। এখন এ নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তীব্র না হলে আগামী বছরেই বাংলাদেশ নির্বাচিত সরকার পেতে যাচ্ছে। নির্বাচনের এই উদ্যোগকে নিঃসন্দেহে সরকারের সাফল্য বলা যায়। কীভাবে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর হয়, সেটাই এখন দেখার।
গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে সাহায্য করেছে সরকার। আহতদের অনেককে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছে। তবে আহতদের বেশ কয়েকবার রাস্তায় নেমে আসতে দেখা গেছে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের কাছে অবস্থানের কর্মসূচিও তারা পালন করেছেন।
সংস্কারের পথেও সরকার অনেক দূর এগিয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। কিন্তু দুই দফা আলোচনার পর বছরের একেবারে শেষ দিকে রাষ্ট্র সংস্কারের ৮১ টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এর মধ্যে অন্তত ১০টি বিষয়ে একাধিক দলের ভিন্নমত রয়েছে। এখনো ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।
বিচারপ্রক্রিয়াও এই সময়ে শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। সাবেক সরকারের অনেক মন্ত্রী হত্যা মামলায় এখন কারাগারে। অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে খোদ আইন উপদেষ্টাও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে আদালতে অভিযুক্ত রাজনীতিকরা হেনস্তা হয়েছেন, যা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশে চাঁদাবাজি অনেক বেড়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও ঘটেছে, যা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ছিল না।
এ ধারাতেই ‘মব জাস্টিস’ ছিল এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এই মবের শিকার হয়েছে ক্রমাগত মাজার, ভাস্কর্য, ম্যুরালসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভেঙে ফেলা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। দেশে-বিদেশে এটি ছিল আলোচনার শীর্ষে। মবের শিকার হয়ে গত ১০ মাসে ১৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই মব ভায়োলেন্স প্রতিবন্ধক হয়ে থেকেছে প্রায় বছরজুড়ে। মব ভায়োলেন্সের কারণে সরকারের অনেক সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে।