ঢাকা মহানগরীর রাজনীতিতে মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের ইলিয়াস মোল্লাহ ও এখলাস মোল্লাহের পরিবার সবার কাছে পরিচিত। কিন্তু এই পরিবারের অপকর্মের বিষয়টি অনেকের কাছেই অজানা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ইলিয়াস ও এখলাসের ক্যাডারবাহিনীর দৌরাত্ম্যের কথা গত সাড়ে ১৫ বছরে কেউই মুখ ফুটে বলতে না পারলেও এখন অনেকে মুখ খুলছেন। তারা বলছেন, বস্তির চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে, ঢাকা-১৬ আসনের এই এলাকার গার্মেন্টসগুলোর পাশাপাশি এলাকার ঝুটব্যবসা, মাদকের কারবারসহ সবকিছুতে একক নিয়ন্ত্রণ ছিল এই দুজনের ক্যাডারদের। আর খালি জমি চোখে পড়লে নজর এড়াত না এই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাডারবাহিনীর। জোর-জবরদস্তি করে ছলে-বলে-কৌশলে যেভাবেই হোক ওই জমি দখলে নিত এই পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ না কেউ। তাদের ক্যাডারবাহিনীর দৌরাত্ম্য এলাকার পাড়া-মহল্লায় পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। মোট কথা, এই পরিবারের হুকুমই ছিল এলাকায় শেষ কথা!
তবে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মোল্লাহ পরিবারের প্রভাবশালীরা সবাই পলাতক রয়েছেন। তাদের ক্যাডারবাহিনীও এখন গা-ঢাকা দিয়েছে।
ইলিয়াস মোল্লাহরা মোট চার ভাই। তাদের মধ্যে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ মিরপুরের পল্লবী ও রূপনগর থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ছিলেন। এখলাস একসময় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হলেও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। বাকি দুই ভাই হলেন- আলী মোল্লাহ ও বিপ্লব মোল্লাহ। আসনটিতে মোল্লাহ পরিবারের হুকুমই শেষ কথা! ভূমি দখল, বাড়ি দখল, মার্কেট দখল, চাঁদাবাজি, খুন-খারাবিসহ সব অপকর্মই ক্যাডারদের দিয়ে করাতেন এই চার ভাই। তাদের অপকর্মের রক্ষাকর্তা ছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহ। স্থানীয় একাধিক সূত্রে এই পরিবারের অপকর্মের বিভিন্ন তথ্য জানা গেছে।
নাটক সাজাতেন মোল্লাহরা: ঢাকা-১৬ আসনের খালি জায়গা দেখলেই লোভ সামলাতে পারত না মোল্লাহ পরিবার। সরকারি জায়গা দেখলেই দখলে নিতে দেরি হতো না তাদের। সরকারি জায়গার পাশে থাকা সাধারণ মানুষের জমি তাদের ক্যাডারবাহিনী দিয়ে দখল করাতেন। কেউ বিচার চাইলে তারাই আবার সুরাহা করে দেওয়ার নাটক সাজাতেন। বিনিময়ে জায়গার ভ্যালু (বাজার মূল্য) অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। স্থানীয়রা এটিকে ‘মোল্লাহ পরিবারের নাটক ও ঐতিহ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আওয়ামী লীগের আমলে গত ১৫ বছর তারা এমনই নাটক বহুবার সাজিয়েছেন। এমন এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বিমল চন্দ্র মণ্ডল রাজধানীর রূপনগর থানায় গত বছরের ২৯ নভেম্বর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি মেসার্স শিখা ট্রেডার্স নামে এক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তার পক্ষে অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানটির পরামর্শক শেখ আব্দুল মান্নান।
বস্তি থেকে আদায় করতেন বড় অঙ্কের টাকা: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-১৬ আসনে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি বস্তি রয়েছে। প্রতিটি বস্তিতে ৫০০ থেকে ১ হাজারের বেশি ঘর রয়েছে। ঘরের কক্ষ অনুযায়ী ভাড়া আসত ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার করে টাকা। প্রতিটি ঘর থেকে আবার অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংযোগের জন্য আলাদাভাবে টাকা নেওয়া হতো। সব বস্তির অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগের মূল হোতা ছিলেন মোল্লাহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ‘লিয়াকত বিন্দাবন’। প্রতিটি বস্তিতে ভাড়া কালেকশন করতেন ইলিয়াস মোল্লাহর ঘনিষ্ঠ ক্যাশিয়ার- সাগর, হযরত, শাহজাহানসহ ২০ জন। এই টাকার ৪ ভাগের ৩ ভাগ চলে যেত ইলিয়াস মোল্লাহ ও তার পরিবারের পকেটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিরপুরের এমপি রোডে ইলিয়াস মোল্লাহর বাসভবনের পিছনে সরকারি খাস জমিতে মোল্লাহ বস্তির টাকা তুলতেন সাগর। পাশে ঝিলপাড় বস্তির টাকা ওঠাতেন হযরত। এভাবে প্রতিটি বস্তির জন্য একেকজন ক্যাশিয়ার দায়িত্বে ছিলেন।
মিরপুর ১২ নম্বরে ইলিয়াসের প্রত্যক্ষ মদদে ‘সুলতান ম্যানশন’ নামে একটি ভবনে মদের ‘বার’ চালাতেন তার ভাগনে সালমান মোল্লাহ। এই বারের আড়ালে চলত নারীদের দিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড। রাত হলেই গানের তালে তালে চলত নারীদের দিয়ে রঙ্গলীলা। রাত গভীর হলে বারের মেয়েদের খদ্দের ঠিক করে দিতেন বারের স্টাফরা। নারীদের নিয়ে খদ্দেররা চলে যেতেন মিরপুর-১২ নম্বরের নিজস্ব মালিকানাধীন হোটেলে। ওই বারটিতে কেনা-বেচা হতো নিষিদ্ধ মাদক। প্রশাসনের নাকের ডগায় বার ও হোটেলের অপকর্ম চললেও ইলিয়াসের প্রভাবে কেউই কিছু করতে পারতেন না। ইলিয়াসের ছোট ভাই বিপ্লব মোল্লাহ পল্লবীর একাধিক বাড়িতে নারীদের নিয়ে সময় কাটাতেন। মিরপুর-১২ নম্বরে তাদের আবাসিক হোটেলে নারীদের দিয়ে দেহব্যবসা করাতেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা আসত।
ভূমি দখল করে আবাসন: খাস জমি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন- মিরপুর এলাকায় ফাঁকা জমি মানেই তাতে নজর ইলিয়াস ও তার ভাইদের। জায়গা দখল করেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়তো বস্তি বানিয়েছেন। তাদের অপকর্ম দেখভালে গড়ে তুলেছেন অর্ধশতাধিক সদস্যের সশস্ত্র ক্যাডারবাহিনী। পল্লবীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সাধারণ মানুষের জমি দখল নিয়ে তৈরি হয় সাগুফতা ও স্বপ্ন নগর আবাসিক এলাকা। যেখানে সুইমিং পুল, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। অবৈধ এই আবাসন থেকে আসা সব টাকা ভাগ হতো চার ভাইয়ের মধ্যে। এই প্রকল্পের মূল দায়িত্বে রয়েছেন বড় ভাই এখলাস। আবাসনের পুরো বন্দোবস্ত করেছেন ইলিয়াস মোল্লাহ নিজেই। পল্লবীর ঝিলপাড়ের ৭ একর জমি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষর। সেই জমি দখল করে ইলিয়াস মোল্লাহ একাংশে বস্তি বানিয়েছেন। অন্য অংশে করেছেন গরুর খামার।
ইলিয়াসের জলসাঘর: মিরপুর বেড়িবাঁধের বিরুলিয়ায় বিএনপির এক নেতার জমি দখল করে ইলিয়াস মোল্লাহ তৈরি করেন জলসাঘর। যেটি এমপির বাগানবাড়ি হিসেবে পরিচিত। রাত হলেই সেখানে নারীদের আনাগোনা বেড়ে যেত। অনেক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে জানা যায়। এখানে এক একর জায়গা দখল করে জলসাঘর বানিয়েছেন ইলিয়াস মোল্লাহ। এর পাশের জমি দখলে নেওয়া হয়েছে। যেখানে এখনো ভরাটের কাজ চলছে। বাগানবাড়ির পাশের জমির তিন ভাগই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ও নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের। কর্তৃপক্ষ একাধিকবার প্রশাসনকে জানালেও কোনো লাভ হয়নি।
অবৈধ ব্যবসার ফিরিস্তি: পল্লবী ও রূপনগর থানার অধীনে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ঝুটব্যবসা নিয়ন্ত্রণেও একক আধিপত্য ছিল ইলিয়াস মোল্লাহের, যা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব ছিল মোল্লাহর নিজস্ব বাহিনীর। কারখানাগুলোর ঝুট কাকে দেওয়া হবে বা কে পাবে, তা নির্ধারণ করে দিতেন ইলিয়াসই। বিনিময়ে মোট টাকার ২ থেকে ৩ পার্সেন্ট তিনি নিতেন।
মিরপুরের প্রতিটি ওয়ার্ডে মোল্লাহ পরিবারের নিজস্ব বাহিনী রয়েছে। হাজি রজ্জব হোসেন, আশিক, ঝুট বাপ্পি, আশিকুল ইসলাম আশিক, রুহুল আমিন, মনির মোল্লাহ, চশমা রুবেল, বিএইচপি বাবু, খাডো খোকনসহ অন্তত শতাধিক সদস্য রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সদস্যদের আবার প্রত্যেকের কাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য ছোট্ট ক্যাডারবাহিনী রয়েছে এবং তারাই আবার কিশোরগ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে। কিশোরগ্যাং দিয়ে ওয়ার্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ফলে মিরপুরের একেবারে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত মোল্লাহ পরিবারের ভয়ে তটস্থ থাকত। এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পল্লবী ও রূপনগর থানায় খুন, ভূমি দখল, মাদক, হত্যা, চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে।
ঢাকা-১৬ আসনে অবস্থিত প্রতিটি ওয়ার্ডের মার্কেট-শপিং মলগুলো থেকে প্রতি মাসে চাঁদা তুলতেন তারা। পল্লবীর ৭ নম্বর সেকশনে ফুটপাতে, মিরপুরের পূরবী সুপার মার্কেটের সামনের ফুটপাত, পল্লবীর ৭ নম্বর সেকশনের পল্লবী প্লাজার আন্ডারগ্রাউন্ডে, মাদকের হাট, অবৈধ স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন তারা। মাসে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হতো। প্রতি মাসে এই চাঁদার ৪ ভাগের ২ ভাগ যেত ইলিয়াসের পকেটে। বাকি এক ভাগ ক্যাডারবাহিনীর কাছে ও অন্য ভাগ যেত প্রশাসনের পকেটে।
একক বলয় নিতে হত্যা: ঝুটব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঢাকা-১৬ আসনে প্রতি মাসেই খুন-খারাবি হতো। এর মধ্যে সবুজ, শাকিল নামের দুজন ক্যাডারকে হত্যা করা হয়। মিরপুর বিহারিপল্লিতে ৪ জনকে হত্যার দায়ে ইলিয়াস মোল্লাহ ১ নম্বর আসামি হয়েছে। তার বাহিনীর সদস্যরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহের সঙ্গে ছবিসংবলিত বিলবোর্ড-ব্যানার-পোস্টার লাগিয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। ইলিয়াসের ঘনিষ্ঠ ওসব ক্যাডারবাহিনীও শতকোটি টাকার মালিক। তাদের রয়েছে আলিশান বাড়ি, তৈরি পোশাক কারখানা, দামি গাড়ি, নামে-বেনামে প্লট-ফ্ল্যাট, মার্কেটসহ সম্পদের পাহাড়।
মন্দির দখল: ইলিয়াস মোল্লাহর থাবা থেকে বাদ যায়নি পল্লবীর ‘শ্রীশ্রী গৌর নিতাই মন্দির’। মোল্লাহের লোকজন সেবায়েতদের মারধর করে মিরপুর মন্দিরটি দখল করেছেন। অভিযোগের সঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান ভুক্তভোগী ও বঞ্চিতরা। মন্দিরের কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ কৃষ্ণ দাস খবরের কাগজকে বলেন, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লাহর ছত্রচ্ছায়ায় সুধীরগং আমাদের শ্রীশ্রী গৌর নিতাই মন্দির দখল করেছে, মন্দিরের ভক্তদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করে সন্ত্রাসী কায়দায় এবং অন্যায়ভাবে ২০১৮ সালে মন্দির থেকে বের করে দেয়। এখনো যারা মন্দিরের দায়িত্বে রয়েছেন, তারা কেউ বৈধ নন। তাদের কারও নিবন্ধন নেই। এখনো তারা আছেন।
বেড়েই চলছিল ইলিয়াস মোল্লাহর অর্থ: চারবারের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর নির্বাচনি হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার স্ত্রীর নগদ এক টাকাও ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী তার স্ত্রীর নগদ ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা রয়েছে। এই হিসাবে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে ইলিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী শূন্য থেকে এখন কোটিপতি। স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি ও একটি গাড়ি আছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলিয়াসের কোনো বাড়ি না থাকলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তার নামে দুটি বাড়ি ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন দেখিয়েছেন। হলফনামায় এগুলোর মূল্য দেখানো হয়েছে ৮০ লাখ ৪১ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকৃত মূল্য কয়েক গুণ বেশি। এ ছাড়া তার স্ত্রীর নামে ৬০ ভরি সোনার উল্লেখ আছে। এর বাইরে রয়েছে অঢেল সম্পত্তি।