‘কিছুক্ষণ বসে থাকলেই পিঠে ব্যথা করে। বেশিক্ষণ পড়তে পারি না। তার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে মাথা ব্যথা। যা পড়ি তা কিছুক্ষণ পর ভুলে যাচ্ছি। জানি না কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেব। চিকিৎসকরা বলেছেন পিঠের গুলি বের করতে গেলে শরীর প্যারালাইসিস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
কথাগুলো বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে গিয়ে আহত ছাত্র মো. শেফাতুল কাদের সাজ্জাদ (১৮)। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের মো. আবদুস সালামের ছেলে সাজ্জাদ হোসাইনীয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু তীব্র ব্যথার কারণে তিনি পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছেন।
সাজ্জাদের বাবা আবদুস সালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গ্রামে ছোট একটি মুদি দোকান চালিয়ে সংসার চালাই। আন্দোলনে গিয়ে ছেলে আজ শরীরে গুলি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। চিকিৎসকরা পিঠের গুলি বের করতে অপারগতা জানিয়েছেন। কারণ গুলি বের করার জন্য অপারেশন করতে গেলে ছেলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি আমার সন্তান আজীবন গুলি বয়ে বেড়াবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি জুলাই বিপ্লবে আহত অনেককেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। সরকার এবং জুলাই ফাউন্ডেশনে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার ছেলেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানো হোক।’
ঘটনার বর্ণনায় সাজ্জাদ বলেন, ‘গত ৪ আগস্ট বাঁশখালী সদরের দক্ষিণে চাম্বল বাজারে প্রায় তিন শ’ ছাত্র-জনতা মিলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ করে। বাঁশখালীর প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিকেল ৩টা থেকে আমাদের মিছিল শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ এসে মিছিলের ওপর হামলা করে সড়ক অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ছাত্র-জনতাও প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশ-ছাত্রলীগ পিছু হটে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এবং ছাত্রলীগ বেপরোয়াভাবে গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলির মুখে ছাত্র-জনতা সড়ক থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সেদিন আমি ছাড়াও ওই ঘটনায় আরও অনেকেই রাবার বুলেটে আক্রান্ত হন। কেউ কেউ ইট-পাথরের আঘাতপ্রাপ্ত হন। আমার এ সময় মাথার পেছনের দিকে রাবার বুলেট লাগে। পিঠে এবং দুই উরুতেও লাগে। গুলি লাগার পর আমি সড়কের ওপর পড়ে গেলে আশপাশের লোকজন এসে আমাকেসহ আরও কয়েকজন আহতকে উদ্ধার করে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ক্যাডাররা খুঁজতে গেলে পরিবারের নারীরা আমাদেরকে লুকিয়ে রাখেন। যে কারণে সেদিন আমরা প্রাণে বেঁচে যাই।’
সাজ্জাদ জানান, পুলিশ এবং ছাত্রলীগ ক্যাডাররা চলে গেলে ঘণ্টাখানেক পর তারা আশ্রয় থেকে বের হন। তবে হাসপাতালে যাওয়ার সাহস পাননি। তাদেরকে গোপনে চিকিৎসা দেন চাম্বল এলাকার পল্লি চিকিৎসক প্রবীর চৌধুরী। সেদিন ওই চিকিৎসকের লিখে দেওয়া ওষুধ সেবন করে ৫ আগস্ট আরেক পল্লি চিকিৎসক মফজল আহমদের কাছে গেলে তিনি উরুর একটি গুলি বের করেন। বাকি তিন জায়গায় গুলি রয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাঁশখালী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেন তিনি। এরপর গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা অপারেশন করে মাথার গুলি বের করেন। পিঠের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তারা গুলি বের করতে রাজি হননি। চিকিৎসকরা বলেছেন, সেটি বের করলে প্যারালাইসিস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডান উরুর গুলিটা তখন খুঁজে না পাওয়ার কারণে সেদিন চিকিৎসকরা সেটা বের করতে পারেননি। শরীরে এখনো দুইটি গুলি রয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে পিঠের গুলিটি। একদিকে আর্থিক অনটন, অপরদিকে প্রচণ্ড ব্যথায় দিশেহারা সাজ্জাদ ও তার পরিবার।
জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোথাও থেকে আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সাজ্জাদ বলেন, ‘আমার বাবার পক্ষে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো অসম্ভব। আমরা তিন ভাই চার বোনের মধ্যে বড়জন বান্দরবানে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। তারও বাড়তি কোনো আয় নেই যে, আমার উন্নত চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করবেন। জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা সরকার যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আমি সুস্থভাবে বেঁচে হয়তো এক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারব।’