বিএনপির বিভিন্ন উপকমিটি গঠন না হওয়ায় অনেক নেতাই আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এখনো দলীয় কোনো ফোরামে ঢুকতে পারছেন না। দলের গঠনতন্ত্রে বিষয়ভিত্তিক উপকমিটির কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। তবে দলের নীতিনির্ধারকদের নজর না থাকায় উপকমিটি গঠন দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
গত সাড়ে আট বছরে মাত্র দুটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাকি ২৪টি উপকিমিটি গঠনে কোনো অগ্রগতি নেই। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এ বিষয়ে ঐকমত্য না থাকায় কোনো উপকমিটি আলোর মুখ দেখেনি। উপকমিটি গঠনে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ দেখা গেলেও অজ্ঞাত কারণে তা বারবার থেমে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে-সংগ্রামে বিএনপির অনেক নেতাই পদবিহীন অবস্থায় অংশ নিয়েছেন। পদহীনের তালিকায় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৭ শতাধিক সাবেক নেতা রয়েছেন।
কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এবার হয়তো উপকমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে কমিটি গঠন হয়ে ওঠেনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘উপকমিটি গঠনের বিষয়ে সম্প্রতি কোনো আলোচনা হয়নি। আশা করি, আগামী দিনে হয়তো বিষয়ভিত্তিক কমিটি গঠন হতে পারে।’
আওয়ামী লীগের উপকমিটি আছে বলেই বিএনপি করছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ কথা ঠিক নয়। ইতোমধ্যে আমরা অনেক উপকমিটি গঠন করেছি। যেখানে যে কমিটি প্রয়োজন সেখানে দিয়েছি। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মীরা কাজ করছেন।’
যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সাবেক একাধিক নেতা বলেন, উপকমিটি না থাকায় সংগঠনের দায়িত্ব ছাড়ার পর যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের বছরের পর বছর পদহীন থাকতে হচ্ছে। সূত্রমতে, বিএনপিতে ২৬টি বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠনের কথা থাকলেও গঠন হয়েছে মাত্র দুটি। বিএনপির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টারের (বিএনআরসি) কমিউনিকেশন উইং নিজেদের মতো করে কাজ করছে। তাদের কার্যক্রম নিয়েও নেতাদের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ‘বিএনপি মিডিয়া সেল’ নামে আরেকটি সেল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু উপকমিটি না থাকায় নানা ইস্যুতে গবেষণাসহ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে বিএনপি অনেকটাই পিছিয়ে আছে বলে মনে করছেন একাধিক নেতা।
অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দেখভালের জন্য উপদেষ্টা পরিষদ এবং পৃথক মনিটরিং সেল গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপির সাবেক ছাত্রনেতারা। তারা বলেন, কমিটির আকার হতে হবে ১০ থেকে ১৫ জনের মধ্যে। তাদের মাধ্যমেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সংগঠনের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও একক কতৃত্ব অনেকটাই কমে আসবে। নিজ বলয়ের অনুসারীদের প্রবেশ কমে আসবে।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে শ্রমিক দলের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার পর সংগঠনটি প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এখন শ্রমিক দলের বিষয়ে বেশি খোঁজ-খবর রাখেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিটি সংগঠনে কমপক্ষে ১০ জনের উপদেষ্টা পরিষদ প্যানেল থাকলে কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘‘ভিন্ন নামে অনেক সেল গঠন করা হয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর সারা দেশের নেতা-কর্মীরা চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করছেন কি না দেখার জন্য ‘সেন্ট্রাল মনিটরিং’ সেল গঠন হয়েছে। সেলে সাবেক ছাত্রনেতারা দায়িত্বে রয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ হাইকমান্ডকে তারা নিয়মিত তথ্য দিচ্ছেন।’’
তিনি বলেন, ‘সংগঠনগুলোর উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হলে তাদের মতামত, কাজের পদ্ধতি ও সংগঠনে তাদের কর্মপরিকল্পনা কী হবে- সেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ফুল না রেখে শুধু টব সাজিয়ে রাখলে কোনো লাভ হবে না।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বৈরাচারের আমলে দেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলেনি। হামলা-মামলায় নেতা-কর্মীরা স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেননি। এ জন্য হয়তো কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। সবাই তো আর নেতৃত্ব দিতে পারেন না। সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।’
২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়। তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত সাড়ে আট বছরেও তা হয়নি। সেই কাউন্সিলে বিএনপির গঠনতন্ত্র ৬-এর ১৩ উপধারায়ও বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠনের কথা যুক্ত করা হয়। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দলের চেয়ারম্যান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনবোধে জাতীয় কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্য থেকে কয়েকজনের সমন্বয়ে বিষয়ভিত্তিক কমিটি করতে পারবেন। যেসব বিষয়ে কমিটি গঠন হতে পারে তা হচ্ছে ‘অর্থ ও পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নারী ও শিশু, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, যুব উন্নয়ন, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ, যোগাযোগ ও গণপরিবহন, এনার্জি ও খনিজ সম্পদ, মানবাধিকার, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মুক্তিযুদ্ধ, ক্ষুদ্রঋণ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, সুশাসন ও জনপ্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গণমাধ্যম, জাতীয় সংহতি ও এথনিক মাইনরিটি।’ গঠনতন্ত্রে আরও বলা আছে, এসব কমিটিতে দলের সদস্য নন অথচ বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী, যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। গত আট বছরে শুধু নারী শিশু ফোরাম ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির দুটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপকমিটি না হওয়ার কারণ হিসেবে একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের উপকমিটি আছে, তাই বিএনপিও উপকমিটি গঠন করলে সমালোচনা সৃষ্টি হবে- এমন চিন্তা থেকেই হাইকমান্ড হয়তো কমিটি গঠনে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি স্বতন্ত্র থাকতে চাইছে। কিন্তু উপকমিটির বিকল্পও চিন্তা করছে না হাইকমান্ড।
যুবদলের সাবেক সহসভাপতি আব্দুল বাতেন খান শামীম খবরের কাগজকে বলেন, ‘উপকমিটি গঠন করা হলে বিএনপি লাভবান হবে। সাবেক অনেক নেতা দলীয় পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পাবেন। আদর্শ ও যোগ্য নেতাদের সমন্বয়ে উপকমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করতে হবে। আগামীতে এদের মধ্য থেকেই ১০-১৫ জন ভালো সংগঠক ও নেতৃত্ব বেরিয়ে আসতে পারেন।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মো. আ স ফ কবীর চৌধুরী (শত) খবরের কাগজকে বলেন, ‘৬-৭ বছর আগে উপকমিটি গঠনের প্রস্তাব উঠেছিল। অনেকের নামও জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো অজ্ঞাত কারণে আলোর মুখ দেখেনি। তিনি জানান, সংগঠনের সাবেক সভাপতি শফিউল আলম বারীর নেতৃত্বের সময়ে স্বেচ্ছাসেবক দল ২০ জনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল। উপকমিটি ও সংগঠনের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করলে হয়তো সাবেক নেতারা দলীয় পরিচয় পাবেন।’
ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগ খবরের কাগজে বলেন, ‘বিএনপিতে উপকমিটি গঠনের কথা থাকলেও এখনো কোনো অগ্রগতি দেখছি না। উপকমিটি গঠন করা হলে সেখানে সাবেক নেতারা নতুন পরিচয় পাবেন।’