চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের প্রত্যেক বেডে দুই থেকে তিনজন রোগী ভর্তি আছে। কর্তৃপক্ষ বলছে রোগী বেশি। তাই একই সিটে দুই থেকে তিনজন রাখা হয়েছে। রোগীর অভিভাবকরা বলছেন, কষ্ট হলেও শিশুর চিকিৎসা নেওয়ার জন্য হাসপাতালে রয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রামে শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঠাণ্ডাজনিত রোগ। চমেক হাসপাতালে শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার তিন গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। একই সিটে দুই থেকে তিনজন শিশু রোগী রাখা হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডের (৯ নং ওয়ার্ড) ধারণক্ষমতা ৬৫ জনের। সেখানে গতকাল বৃহস্পতিবার রোগী ভর্তি আছে ১৫৬ জন। ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২০ জনের ধারণক্ষমতার বেডে ভর্তি আছে ৪৬ শিশু। ১০ জনের ধারণক্ষমতার আইসিইউতে ১০ জন ভর্তি রয়েছে। চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালের নার্স থেকে শুরু করে ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হারও বাড়ছে। এ ছাড়া বৃদ্ধরা কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শিশু রোগী আবিরের বাবা মোহাম্মদ ফেরদৌস খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাচ্চার জন্য আমাকেও হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। এখন চাকরিতেও সমস্যা হচ্ছে। ছুটি পাচ্ছি না।’
আরেক শিশু রোগী রহিমের বাবা ইউচুপ বলেন, ‘সর্দি-কাশির সঙ্গে বাচ্চার পাতলা পায়খানাও শুরু হয়েছে। উপায় না দেখে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এসে দেখি এখানেও রোগীর ভিড়। কষ্ট সহ্য করে বাচ্চাকে সুস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাসপাতালে ঠাণ্ডায় রোগীর চাপ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণ রোগী রয়েছে। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর সেবা দিচ্ছে। রোগীরা যেন সঠিক চিকিৎসা পায়, সে জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
জানা গেছে, চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে বর্তমানে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। এর এক-তৃতীয়াংশ আবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। একই সঙ্গে নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী বাড়ছে চট্টগ্রাম মা, শিশু ও জেনারেল হাসপাতালেও।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডাক্তার জেবীন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সম্প্রতি শীতজনিত নিউমোনিয়া, ব্রোংকিওলাইটিস ও অ্যাজমা আক্রান্ত হয়েও শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। আমাদের দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। সাধারণত যেসব শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়, তাদের নিউমোনিয়া বেশি হয়। এ ছাড়া ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শিশুদের বিশুদ্ধ পানি পানের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ছয় মাস থেকে দুই বছর বয়সী শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার খেতে দিতে হবে। পানিশূন্যতা প্রতিরোধে ডায়রিয়া রোগীকে প্রতিবার পাতলা পায়খানা ও বমির পর চামচ কেটে ওরস্যালাইন খেতে দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রি-ম্যাচিউরড (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া) শিশুদেরও নিউমোনিয়া বেশি হয়। তাদের ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিজনিত নিউমোনিয়া হয়। এখন নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে হলে গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে গর্ভকালীন মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া স্বল্প বিরতিতে সন্তান জন্ম দিলেও সেই সন্তানের ওজন কম হতে পারে। মা-বাবা কেউ ধূমপায়ী হলে সন্তানের নিউমোনিয়া হতে পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ছাড়া স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে থাকে।’
গত এক বছরে চমেক হাসপাতালে শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ৫ হাজার ৩৩৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছিল। এক বছরে মারা গেছে ৬২৭টি শিশু রোগী। গত বছরের জানুয়ারিতে চিকিৎসা নিয়েছিল ৭৪০ জন শিশু রোগী, মারা গিয়েছিল ৬১ জন। চলতি বছর জানুয়ারিতে বেড়েছে শিশু রোগের প্রকোপ।