মূল্যস্ফীতির চাপে যখন দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের হিমশিম দশা, তখনো দেশজুড়ে বেড়েছে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা। একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষের জমার খাতায় যোগ হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। এই অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে আমানত হিসেবে গচ্ছিত আছে। দিনদিন এই আমানতের পরিমাণও বাড়ছে। যার মাধ্যমে দেশে কোটিপতি আমানতকারীদের সংখ্যা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সাল শেষে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ১৭৩টি। গত তিন মাসে বেড়েছে ১৫ হাজার ৫১৭টি। আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এসব হিসাবের বিপরীতে রাখা আমানতের পরিমাণও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এক শ্রেণির মানুষের অর্থবৃদ্ধি দেশে আয়বৈষম্য বাড়ার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আশঙ্কাজনকহারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী মানুষের আয় বাড়েনি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন অবস্থায় অর্থ জমানো দূরের কথা, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। এ সময় দেশের একটি শ্রেণির মানুষের আয় বেড়েছে। তারা হচ্ছেন পুঁজিপতি, বিত্তবান ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তাদের আয় আগেও বেশি ছিল, এখন আরও বেড়েছে। মূলত আয়বৈষম্যের কারণেই দেশের কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে।
এ ছাড়া, দুর্নীতির মাধ্যমে কালোটাকা অর্জন, হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচারে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা, করনীতিতে অসামঞ্জস্য, ধনীদের কাছ থেকে কম হারে কর আদায়ও দেশের আয়বৈষম্য বাড়ার অন্যতম কারণ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোটিপতি আমানতধারীর সংখ্যা বৃদ্ধি সমাজের আয়বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করার একটা অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারণেই এই আয়বৈষম্য বাড়ছে। তাই বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে সামনে এটি বাড়তেই থাকবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সম্পর্কিত হালনাগাদ প্রতিবেদন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪ সাল শেষে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি, যা ২০২৩ সাল শেষে ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ১৫ হাজার ৫১৭টি। আগের প্রান্তিক সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে ৪ হাজার ৯৫৪টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ১ কোটির ওপরে আমানতকারীর হিসাবে থাকা আমানতের পরিমাণ ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে এসব হিসাবে থাকা আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৩৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩২টি। এসব হিসাবে মোট আমানত রয়েছে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ডিসেম্বর শেষে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের প্রায় ৫৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে ১ কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক হিসাবও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি ১ থেকে ৫ কোটির মধ্যে রয়েছে ৯৬ হাজার ৪০২টি হিসাব। এসব হিসাবে টাকার পরিমাণ ২ লাখ ৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।
এ সময় ৫ কোটি ১ থেকে ১০ কোটির মধ্যে রয়েছে ১৩ হাজার ১৮০টি হিসাব। এসব হিসাবে টাকার পরিমাণ ৯৩ হাজার ১৩১ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ১০ কোটি ১ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব রয়েছে ৪ হাজার ৪৯১টি। এসব হিসাবে আমানত রয়েছে ৫৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। ১৫ কোটি ১ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার ৫৫টি হিসাব। এসব হিসাবে আমানত রয়েছে ৩৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা।
২০ কোটি থেকে ২৫ কোটির মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৩৫১টি হিসাব। এসব হিসাবে আমানত রয়েছে ৩০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ২৫ কোটি ১ থেকে ৩০ কোটির মধ্যে হিসাব রয়েছে ৯৯২টি। এসব হিসাবে আমানত রয়েছে ২৭ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।
৩০ কোটি ১ থেকে ৩৫ কোটি টাকার হিসাব রয়েছে ৫৪৮টি। এখানে আমানত রয়েছে ১৭ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। ৩৫ কোটি থেকে ৪০ কোটির মধ্যে ৩৯৭টি হিসাব। আর আমানত রয়েছে ১৪ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। ৪০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার হিসাব সংখ্যা ৭৫৮টি। আর আমানত রয়েছে ৩৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। এ সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাব সংখ্যা ১ হাজার ৯০৭টি। এসব হিসাবে আমানত রয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।