সকালে ক্লাসে যাওয়ার তাড়া নেই, তবু আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়ার বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখতে সকাল সকাল জেগে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা। কারও গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, কারও হাতে ভুভুজেলা বাঁশি। হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে গড়াচ্ছে বল, আর তার রেশ এসে লেগেছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। যেন বিশ্বকাপের এক টুকরো আবহ তৈরি হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং বিশ্বকাপ ঘিরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করলেও খেলা ঘিরে উন্মাদনা থেমে নেই।
বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ম্যাচ ঘিরে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। প্রিয় দলের জার্সি পরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনের পোস্ট দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক কিংবা ম্যাচ বিশ্লেষণ–সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন তরুণদের জীবনের একটি বড় অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
গত বুধবার সকালে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ সেই উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক গোলে ৩-০ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শুরু হয় উল্লাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, হলপাড়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় বিজয় উদযাপনের দৃশ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় খেলা চলাকালে শিক্ষার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। খেলা শেষে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা আনন্দ মিছিল বের করেন। বিভিন্ন আবাসিক হলে উড়তে থাকে আকাশি নীল-সাদা পতাকা। মুহূর্তের জন্য পুরো ক্যাম্পাস যেন রূপ নেয় এক উৎসবের নগরীতে।
আর্জেন্টিনার জয়ে উল্লাস প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘মেসি বেশ ভালো খেলেছেন, আশা করছি আগামীতে তারা আরও ভালো খেলবেন। বিশেষ করে মেসি আরও গোল করবেন। আজকে মেসির তিন গোলের মধ্য দিয়ে তিনি সেরা, এটি প্রমাণ করলেন। আশা করি, এবারের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা জিতবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘এবার আমরা ফোর স্টার নিয়ে ফিরব। আর মেসি কী জিনিস, আজকের খেলার মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণ হলো। সেরাদের জায়গাটি সব সময়ই বিশ্বকাপ সেরাদের কাতারেই থাকে। এবার আমরা বিশ্বকাপ ট্রফি জিতব এবং মেসি অবশ্যই সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন, যেটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।’
এদিকে ম্যাচ-পরবর্তী অনুভূতি প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা সমর্থক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওবাইদুল্লাহ বলেন, মেসিকে কেন ফুটবলের জাদুকর বলা হয়, তা আজ আবারও প্রমাণ হয়েছে। আর আর্জেন্টিনা যে মানের ফুটবল খেলেছে, তা ধরে রাখতে পারলে দলটি শিরোপার দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। টিএসসি, জগন্নাথ হল মাঠ, সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল, শহীদুল্লাহ হল মাঠ এবং কবি জসীমউদদীন হল মাঠে প্রতিদিন জড়ো হচ্ছেন শত শত শিক্ষার্থী। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশের মানুষের কাছে বরাবরই একটি আবেগের নাম। যদিও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এখনো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নেই, তবু সমর্থন আর ভালোবাসার দিক থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই এ দেশের মানুষ। সেই আবেগের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রকাশ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে, যেখানে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি হয়ে ওঠে উৎসব, আনন্দ এবং মিলনের উপলক্ষ।
বিশ্বকাপের দিনগুলো যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। কে জিতবে শিরোপা, কে হবে সেরা।
খেলোয়াড়– এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরকে ঘিরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ইতোমধ্যে পরিণত হয়েছে উচ্ছ্বাস, আবেগ আর তারুণ্যের এক বর্ণিল মঞ্চে।