ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
স্ত্রীকে নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ব্যবসায়ী সোহেল খুনের অভিযোগ সালমান শাহের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের আদেশ বাতিল চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমধর্মী ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ডিবেট ২০২৬’ উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি অধ্যায়ের ৬টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান গোপালগঞ্জে আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নিরাপত্তা জোরদার, গ্রেপ্তার ৬ অনুশীলনে নেইমার, বিশ্রামে অ্যালিসন চাঁদপুরে ৩ লাখ ৬৬ হাজার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইসরায়েল: জাতিসংঘ তদন্ত কমিটি ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যুবদলের মোটরসাইকেল শোডাউন নারী কেলঙ্কারির ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক আরিফ উদ্দিন বরখাস্ত বরগুনায় বালুবাহী জাহাজের নিচ থেকে কিশোরের মরদেহ উদ্ধার ডান প্রান্তে রাফিনহার জায়গায় খেলতে প্রস্তুত মার্টিনেল্লি সিভিল সার্জনকে ‘ভাই’ বলায় ক্ষিপ্ত, বললেন ‘মহোদয়’ বলতে হবে সন্ত্রাসী ইমনের গ্রেপ্তার নিয়ে সিএমপির ব্যাখ্যা আইসক্রিমপ্রেমীদের জন্য সেভয়-এর নতুন চমক মানিকগঞ্জে মারিয়া হত্যা মামলার বিচার দাবিতে মানববন্ধন তারেক রহমানকে নিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে ভিডিওতে হাবিবের গান চাপমুক্ত থাকার ৭টি কার্যকর উপায় ৩০ হাজার মামলার জটে স্থবির শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম: শিক্ষামন্ত্রী লালমোহনে ব্রিজ ভেঙে খাদে ট্রাক, চালক নিহত ঈশ্বরদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ. লীগের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যুবদলের মিছিল ঘুষ কেলেঙ্কারি: দেবীগঞ্জের পিআইও বদলি বান্দরবান ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা নেই: জেলা প্রশাসন নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে তোলার গুণটি কী? মারা গেছেন নৃত্য পরিচালক জাকির হোসেন দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ শেষেই বিদায় নিল ৪ দল ফ্রান্সের কাছে হারলেও গর্বিত ইরাকি সমর্থকেরা টোল আদায়ে অনিয়ম: শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই অভ্যুত্থান: ঢাবির ৩ শিক্ষক বরখাস্ত, একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি ২ জনের রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ গ্রেপ্তার ১৬

পাঁচ ইস্যুতে রাজনীতিতে অস্থিরতা

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৫, ১২:১০ পিএম
আপডেট: ০৪ মে ২০২৫, ১২:১৭ পিএম
পাঁচ ইস্যুতে রাজনীতিতে অস্থিরতা
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ, সংস্কার বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য মানবিক করিডর ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে না পরে- গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচটি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী তৎপরতায় দেশে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এসব ইস্যুতে দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে তৈরি হয়েছে উত্তাপ। এর ফলে আবার জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো, নির্বাচন আসলে কবে বা আদৌ হবে তো! কারণ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই বলেছেন, নির্বাচন দাবি করাটাই যেন এখন বড় অপরাধ। 

অন্যদিকে মায়ানমারের সঙ্গে মানবিক করিডরকে কেন্দ্র করে সরকার কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। কারণ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি এনসিপি; এমনকি সর্বশেষ গতকাল হেফাজতে ইসলামও করিডরের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

শনিবার (৩ মে) হেফাজতের সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে বলা হয়েছে, মানবিক করিডরের নামে বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। একই মঞ্চ থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘ভুলে যাবেন না, আমরা আপনাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) ক্ষমতায় বসিয়েছি।’ 

সরকারের বিরুদ্ধে এই অবস্থান ছাড়াও নির্বাচনের দিনক্ষণ ও সংস্কার বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে দলগুলো এখন প্রায় মুখোমুখি। কারণ বিএনপি আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রশ্নে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা খেয়াল করছি, কিছুদিন ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে দেশে এমন একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে, যেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানোই যেন এক অপরাধ।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আগে সংস্কারের কথা বললেও এখন তারা আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছে। গতকাল জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা দুটি সময়কে উপযুক্ত মনে করি। একটি ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে। তবে যদি এ সময়ের মধ্যে সংস্কারগুলো এবং বিচারের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান বা জনমনে আস্থা সৃষ্টির পর্যায়ে না আসে, তাহলে সর্বোচ্চ এপ্রিল। ফেব্রুয়ারিতে সম্ভব না হলে কোনোভাবেই এপ্রিল মাস পার হওয়া উচিত নয়।’ নির্বাচন প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান সরকার-এনসিপি ও বিএনপির মাঝামাঝি বলা যায়। 

তবে এনসিপি নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনীতির ময়দানে উত্তাপ ছড়িয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানীর এক সমাবেশে দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না।’ পর্যবেক্ষকদের মতে, এনসিপির এই বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো। গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বর্তমান সরকার মনে হচ্ছে নির্বাচন দিতে চায় না। 

এদিকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যোগাযোগের জন্য ‘মানবিক করিডর’ দেওয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো একটি রাজনৈতিক দল এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেনি। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং সর্বশেষ হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ থেকে করিডরের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে। 

হেফাজতের সমাবেশ থেকে আলোচিত ইসলামি বক্তা ও জৌনপুরের পীর মুফতি ড. সাইয়্যেদ এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী বলেন, ‘করিডর (মায়ানমারের রাখাইনের জনগণের জন্য মানবিক করিডর) দিয়ে স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আলেমদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।’ 

এর আগে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে জানায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ মনে করে, করিডর দেওয়া না-দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে হবে জনগণের কাছ থেকে, সিদ্ধান্ত আসতে হবে জনগণের প্রত্যেক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে।

ফলে করিডর নিয়েও জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি অস্পষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ-মায়ানমারের সঙ্গে এই মানবিক করিডর নিয়ে আবার নতুন কোনো সংকট তৈরি হয় কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা প্রশ্ন এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। 

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন নাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন- কোনটি আগে হবে এই আলোচনা নিয়েও বিতর্ক ছড়াচ্ছে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। বিএনপি বরাবরই স্থানীয় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। আর জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ- এই চারটি দল ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে বলেছে, তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। 

প্রসঙ্গত, গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচ ইস্যু ছাড়াও সংবিধান, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, নির্বাচন কমিশন সংস্কারের যেসব প্রস্তাব রয়েছে তা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এসব প্রস্তাব নিয়ে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা তেমন জোরালো নেই। 

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সমাবেশে হেফাজতের অনেকে অনেকভাবে বলতে পারেন। তবে দলটির মূল নেতৃত্ব জানে একটা বিচারকাজ শুরু করে শেষ করতে সময় লাগে। আপিল প্রক্রিয়া থাকে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিচারকাজ শুরু করতে পারাটাই। হেফাজত বিচার-প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচনের কথা বলতে পারে।

কিন্তু বিএনপির সঙ্গে বৈঠককালে তাদের বুঝিয়েছিলাম, বিচার একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমরা বিচার শুরু করি, পরবর্তী সময়ে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা বিচার প্রক্রিয়া চলমান রাখবে। কারণ সব অভিযুক্তকে এখনো বিচার-প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘মানবিক করিডর নিয়ে জনগণকে অন্ধকারে রেখে এমন সিদ্ধান্ত অনভিপ্রেত। যদি বিষয়টি একান্তই জরুরি হতো, তাহলে সবার সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত।’

‘বাংলাদেশের সংবিধান বা প্রচলিত আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো এখতিয়ার সরকারের নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিচার করা বা নিষিদ্ধ করার কোনো ধারা বা সিস্টেম আইনে আছে বলে আমার জানা নেই। আওয়ামী লীগের মধ্যে যেসব লোক খারাপ ছিল তাদের বিচার করতে পারে। কিন্তু গোটা দলকে নিষিদ্ধ করার যুক্তিসংগত কারণ নেই। কারণ এই দলকে অনেক লোক ধারণ করে, অনেকে এটার সঙ্গে যুক্ত আছে। সবাই তো আর খারাপ না। এখন জনগণের কাছে যদি এই দলটি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে জনগণই এটার বিচার করবে। দলকে নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার কোনো দল বা সরকারের আছে, এটা আমি মনে করি না।’ 

জি এম কাদের বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। যদি অবাধ নির্বাচন দিতে হয়, তাহলে সব দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে রাখলে স্বাভাবিক নির্বাচন হবে না।’ 

সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘দেশকে সংকটমুক্ত করতে নির্বাচিত সরকারব্যবস্থায় যাওয়া হলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে কোনো শর্ত দেওয়া উচিত নয়। গণহত্যার দায়ে বিচার প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত করার স্বার্থেই নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন।’ 

সংস্কার-প্রক্রিয়ার শর্ত জুড়ে যারা নির্বাচন দীর্ঘায়িত করতে চাইছে তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যারা বলছে, নির্বাচন হলে বিচার হবে না; আমি মনে করি অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে তাদের সন্দেহ আছে। নির্বাচিত সরকার আওয়ামী লীগের বিচার করবে না এ কথা বলার মানে হলো, জনগণের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই।’

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কৃতকর্মের বিচার সবাই চায়, আমরা চাই। কিন্তু বিচার করতে কতদিন সময় লাগবে? বিচার তো কেউ নির্দিষ্ট করতে পারবে না। নির্বাচনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিচার বিষয়টি জুড়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা দেখি না। বিচার-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাদের (আওয়ামী লীগ) নিষিদ্ধের বিষয়টি আসতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘মানবিক করিডরের মতো এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি সরকার। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু সরকারের মধ্যে আমরা সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখছি না। এটা চিন্তার ব্যাপার।’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ গণহত্যা পরিচালনাকারী দল হিসেবে জাতিসংঘ চিহ্নিত করে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তাদের বিচার করার এখতিয়ার শুধু আদালতের, কোনো দলের নয়। যারা গত ১৫ বছর দেশে জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন চালিয়েছে তাদের কি জনগণ ক্ষমা করবে? ফ্যাসিস্ট ও ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশকে জনগণ আর দেখতে চায় না। দল ও ব্যক্তির দুটোরই বিচার করতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার করতে হবে। আর বিচার-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের বিষয়ে চূড়ান্ত রায় আসতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে- ফ্যাসিবাদ যেন পুনর্বাসনের সুযোগ না পায়।’ 

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিচারের আগে নির্বাচন না হওয়ার দাবি প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, এই দাবিটা কেন উঠল? বিচার নিয়ে কি তাহলে কোনো সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে? কিংবা বিচার বিলম্বিত হবে বা হচ্ছে এ ধরনের কোনো আশঙ্কা? এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তো সরকারের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ। সরকারেরই উচিত এ বিষয়টা পরিষ্কার করা। বিচার বিলম্বিত হলে যদি নির্বাচন পেছাতে হয় তাহলে মানুষ সরকারকেই সন্দেহ করবে। মনে হবে নির্বাচন না করার জন্য সরকার ইচ্ছা করেই বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ঘটাচ্ছে। আমি মনে করি, বিচার বা নির্বাচন যে কোনোটারই অযৌক্তিক বিলম্ব সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।’

বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বরিশালে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে, পিছিয়ে কর্মসংস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ধারায় গত এক দশকে বরিশাল বিভাগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর জাতীয় প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৪টি। ২০১৩ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬২টি। সে হিসাবে এক দশকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮২টি অর্থনৈতিক ইউনিট।

দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বরিশাল বিভাগের অংশীদারত্ব ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় ছয়টি বরিশাল বিভাগে অবস্থিত।

তবে কর্মসংস্থানের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বর্তমানে ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ জন কর্মরত রয়েছেন। এটি জাতীয় কর্মসংস্থানের মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে রয়েছে জাতীয় কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর। বিভাগে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৯২টি অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এটি মোট ইউনিটের প্রায় ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৫২টি ইউনিট, যা মোট ইউনিটের ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বরিশালের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ। আকারভিত্তিক শ্রেণিকরণে বিভাগে কুটিরশিল্প রয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪১২টি এবং মাইক্রো শিল্প রয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৪টি। এ ছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ২০ হাজার ১৪০টি, মাঝারি শিল্প ১ হাজার ৫৬৯টি এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ২৪৯টি।

বরিশাল বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৮টি। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৬টি। আর অর্থনৈতিক খানা বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬০টি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮ জন। অর্থনৈতিক খানাগুলোতে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন ২৫ হাজার ৩১৯ জন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে বরিশাল জেলা। জেলায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৬টি এবং কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৯২ জন।

এর পর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪টি এবং কর্মসংস্থান ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬ জন। ভোলায় রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮৯টি ইউনিট এবং ২ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ জন কর্মরত।

পিরোজপুরে ৯৫ হাজার ৬০০টি ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ জন। বরগুনায় রয়েছে ৭৪ হাজার ৬৭০টি ইউনিট এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬০ জন কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। সেখানে ইউনিট সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৪৫টি এবং কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৬ জন।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বরিশালে গত এক দশকে এই প্রবৃদ্ধি নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।’

তবে কর্মসংস্থানের জাতীয় অংশীদারত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠা এখনো বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জ্যোতিময় বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক পর্যায়ের উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটিকে অতিরঞ্জিতভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও আরও বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।’

হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

২৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এই শিল্পটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরে এই শিল্পটি স্থানান্তর করার কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। তবে আজও সেই শিল্পনগরী অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেনা গাড়িগুলো পাঁচ বছর পরও পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাকে পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৫ সালে। কিন্তু ১০ বার সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে তা শেষ করা হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। সময় বেশি লেগেছে সাড়ে ১৫ বছর।

‘চামড়া শিল্পনগরী’ স্থানান্তরে প্রাথামিকভাবে খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। চামড়াশিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি স্থাপনসহ সব কিছু করা হয়েছে সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৬০০ বিঘা জমিতে।

তার পরও পরিবেশগত সনদ পাচ্ছেন না ট্যানারি শিল্পমালিকরা। বিক্রেতারা পাচ্ছেন না চামড়ার দাম। হেমায়েতপুর ট্যানারিশিল্প এলাকা থেকে নির্গত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি শিল্পনগরী প্রকল্পটি প্রণয়ন ‘আগাগোড়া’ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই একবার নয়, দুবার নয়, ১০ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্প খরচও ১৭৬ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে, বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ। সময় বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ৩২ কোটি টাকায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে ৫ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৭৭ কোটি টাকা খরচ করে এসটিপিসহ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে ৫১ বিঘা জমিতে। চারটি মডিউলসংবলিত এই সিইটিপি নির্মাণে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়ানো হয়।

তবে নির্মাণ সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। প্রকল্পটির কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। শিল্পনগরীর অগ্নিনির্বাপন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীরসহ ফায়ার স্টেশন। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা, শিল্পনগরীর বর্জ্যপানি দ্রুত নিষ্কাশনে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ২৭ কোটি টাকা খরচ করে পানি সরবরাহ পাইপলাইন, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ লাইন, ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সড়ক বাতি, ৮ কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং ইয়ার্ড, ২টি গভীর নলকূপ, ৮টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্ক ব্যয়ের পরও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটি।

সাবেক প্রকল্প পরিচালক ব্যবহার করছেন জিপ গাড়ি

প্রতিবেদন সূত্রে (আইএমইডি) জানা গেছে, হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সিইটিপির কার্যক্ষমতা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। স্থাপিত সিইটিপির ধারণক্ষমতা দিনে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমানে উৎপন্ন বর্জ্যপানির পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে সিইটিপি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এদিকে কঠিন বর্জ্য অন্য কোনো শিল্পের উপজাত হিসেবে ব্যবহার না হওয়ায় খোলা জমিতে জমা করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে ঘটছে গুরুতর পরিবেশ দূষণ।

শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর সব কটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পের জন্য ২টি জিপ গাড়ি ও ৩টি মাইক্রোবাস কেনা হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও তা পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক যতীন্দ্র নাথ পাল একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করছেন। একটি মাইক্রোবাস সাভার বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্পটি ৫ বছর আগে শেষ হলেও এখনো ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।

এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ার কারণ

শিল্পনগরীতে নির্মিত সিইটিপি প্রয়োজনের তুলনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যানারির সংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণের তুলনায় এর কার্যকারিকতা ও অপারেশনাল দক্ষতা পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ট্যানারির নিজস্ব ইটিপি নেই। প্রকল্প শেষ হলেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি আজ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত হয়নি বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অপরদিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের জন্য উপযুক্ত হতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, টোটাল ডিজলভড সলিডস (টিডিএস) মান বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু এসব কিছু পূরণ হচ্ছে না। 

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি কমেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস। সাভারে নতুন প্লটে পরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তরের পর কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। শিল্পনগরীতে এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

অবকাঠামো উন্নত হলেও শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত

৪৯ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ২ শতাংশ জানান, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম আছে। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, আগের তুলনায় পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কাজের সময় দুর্ঘটনা অর্ধেক কমেছে। তবে অবকাঠামো উন্নত হওয়ার ৬ বছর পরও ২৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানা থেকে তাদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না।

ট্যানারি কারখানায় কাজ করার সময় রাসায়নিকের গন্ধ ও বর্জ্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আগে ৫৯ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জি সমস্যায় ভুগলেও সাভার ট্যানারিতে এখন ভুগছেন ৩৬ শতাংশ। ৯৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানায় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সুবিধা নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় ক্ষতি হলেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি বছরখানেক হলো। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছর আগে। কাজেই সেই সময়ের ঘটনা বলা সম্ভব না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পর বাস্তবায়িত হলেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের অবনতির কারণে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার মতোই ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে। তাই রপ্তানির বাজার ধরতে এটাকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। কীভাবে করতে হবে, সরকারকে সেটা ভাবতে হবে। আইএমইডির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০২ এএম
ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অধিকাংশের নতুন করে চাকরি পাওয়ার বয়স চলে গেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স থাকলেও তারা কোথাও সহজে চাকরি পাচ্ছেন না। ইসলামী ব্যাংক থেকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যে কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। 

  • অধিকাংশের চাকরির বয়স চলে গেছে
  • যাদের বয়স আছে তাদের জন্য ‘টার্মিনেটেড’ শব্দটি নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, দাম্পত্য কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কয়েক দফায় ব্যাপক জনবল ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে কর্মকর্তাদের জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকের বয়স বেশি হওয়ায় যেমন নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মিলছে না, তেমনই সামাজিক অপবাদ ও ‘ট্যাগিং’য়ের কারণে অন্য কোথাও দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। 

‎একাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে তারাও চরম বিপাকে আছেন। কোথাও আবেদন করে সাড়া পাচ্ছেন না। তাদের আবেদনপত্রের সঙ্গে যখন চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। 

ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক এই ছাঁটাইয়ে শুধু তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়েছে তা নয়, বরং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে তাদের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পেশাগত জীবনে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টার্মিনেট করেছে। কিন্তু টার্মিনেশন লেটারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, যা তাদের পরবর্তী চাকরি পেতে বড় ধরনের জটিলতায় ফেলে দিয়েছে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো কিছুসংখ্যক ব্যক্তির এখনো চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। যখনই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানে আবেদনকারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তখন তারা সন্দেহের চোখে দেখে।

‎ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত সিনিয়র অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ ফখরুল আবেদীন (৩৪) খবরের কাগজকে বলেন, “পরীক্ষা দিয়ে মেধার জোরে চাকরি পেয়েছিলাম, অথচ আজ চোরের অপবাদ নিয়ে সমাজে মুখ লুকাতে হচ্ছে। ‎২০১৭ সালের পর নিয়োগ পেয়েছি বলেই ধরে নেওয়া হলো আমি কোনো এক বিশেষ গ্রুপের লোক। অথচ আমি শতভাগ নিয়ম মেনে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আমার সংসার। বয়স ৩৪ বছর হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন কোনো ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর আমাকে ইন্টারভিউতেই ডাকছে না। অনেকে তো মুখ ফুটে বলেই দেয়–‘আপনারা তো অমুক আমলের লোক, আপনাদের চাকরি দিলে আমাদের রিস্ক।’ ধারদেনা করে দিন চলছে, নিজের সম্মানটুকু হারিয়ে এখন পুরোপুরি সামাজিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।”

আরেক ভুক্তভোগী মো. নওশাদ জামান (৩৯) জানান, পরিবারে যে ব্যক্তি একসময় প্রধান ছিল, সে আজ সবার বোঝা। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ৭ বছর ৯ মাস সততার সঙ্গে পার করার পর এভাবে বিদায় নিতে হবে কখনো ভাবিনি। ৫ আগস্টের পর এক কলমের খোঁচায় আমাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হলো। বয়স ৩৮ হওয়ায় নতুন চাকরির বাজারে আমি সম্পূর্ণ ‘অনুপযুক্ত’। সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এমনভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো অপরাধ করে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হয়েছি। নিজের জমানো টাকা যা ছিল তা-ও শেষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, এর চেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে?”

চাকরিচ্যুত আরেক কর্মকর্তা জোনায়েদ মো. কামরুল হাকিম (৩৮) বলেন, ‘ব্যাংকের টার্গেট পূরণ করতে দিন-রাত এক করেছি, বিনিময়ে পেলাম বিনা নোটিশে ছাঁটাই। ‎বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএর ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। গত বছরও দিন-রাত এক করে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছি। অথচ আমাদের অপরাধ আমরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরি হারিয়ে এখন ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও ‘ব্যাংক থেকে বিতাড়িত’ তকমাটা পিছু ছাড়ছে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েছি। এই বয়সে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কোনো পথ খোলা নেই।’

‎সাদিব সাব্বির (৩৬) নামে আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা বলেন, “যে হাত একসময় মানুষকে সাহায্য করত, সেই হাত এখন ধার নেওয়ার জন্য পাততে হয়। ‎বয়স ৩৬ বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে আর রি-এন্ট্রি নেওয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আমার নেই। হোম লোন ও পার্সোনাল লোনের কিস্তি শোধ করার জন্য এখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ আসছে। যে সমাজ আমাকে একজন সফল ব্যাংকার হিসেবে সম্মান করত, সেই সমাজ এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ চালাতে পারছি না। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে পরিবারে আমার অবস্থান এখন একজন ‘ব্যর্থ’ মানুষের মতো। এই তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবমাননা সহ্য করে বেঁচে থাকা প্রতিদিনের এক জীবন্ত যুদ্ধ।”

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট
সাইফুল ইসলাম। ছবি: খবরের কাগজ

একসময় যিনি মাঠ প্রশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের বিরোধ মীমাংসা করতেন, আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনিই বন্দি চার দেয়ালের অন্ধকারে। একটি স্বাক্ষর কীভাবে একজন মানুষের সাজানো জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নরসিংদীর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে করা একটি স্বাক্ষরই আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে আসামির কাঠগড়ায়। গত প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি কারাগারে। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি দুর্ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কারাগারে যখন তিনি ন্যায়বিচারের প্রহর গুনছেন, তখন বাইরে তার চার বছরের অবুঝ সন্তান আর স্ত্রী পার করছেন চরম অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের এক বুকফাটা আর্তনাদ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নরসিংদী। ১৭ জুলাই জেলখানা মোড়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর পরিস্থিতির অবনতি হলে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সাইফুল ইসলামের দাবি, আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করায় পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর জেলখানা মোড়ে যাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি এবং কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পর একটি স্বাক্ষরই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা জানান, ২২ জুলাই রাতে তাকে পুলিশের এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি প্রথমে আপত্তি জানান। কারণ তার দাবি অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট সময় পুলিশের সঙ্গে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও চাপের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়। এই এমসিসি ফরম নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এমসিসি বা বিপি ফরম নং-১০ মূলত পুলিশের দায়িত্ব পালনের একটি রেকর্ড। কোন ফোর্স কোথায় মোতায়েন ছিল, কখন দায়িত্ব শুরু ও শেষ করেছে, এসব তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ থাকে। এটি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ফরম নয়। আইন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্দেশ দিতে হয়।

সাইফুল ইসলামের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও তার ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সেদিনের তথ্য যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন তার তদন্ত প্রতিবেদনে নরসিংদীর ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮ জুলাই নরসিংদী জেলখানা মোড়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম যে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ নেই।                     

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দাখিল করা ওই অভিযোগে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রাথমিক অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলভী সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্পটে ছিলাম। তাহমিদ (১৪) ছিল আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের কিছু আগে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বেশ সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। পুলিশ গুলি শুরু করলে সরাসরি তার বুকে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে তাহমিদ।’ পুলিশ দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি করেছে? বা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ছিল কি না? খবরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই মুখ্য সংগঠক বলেন, ‘না, সেখানে এই নামের কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখিনি। সেখানে আন্দোলন দমন করার জন্য ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ ছিল। তারাই গুলি করেছে এবং সেখানেই তাহমিদ নিহত হয়েছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ হাকিম বলেন, সারা দেশের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১৭ জুলাই রাতে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই বেলা ৩টা থেকে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন কর্মসূচি পালন স্থলের আশপাশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র মুনিয়া রহমান মনিকা বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সে সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে তাহমিদ নিহত হয়েছে। সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সঙ্গে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিল বলে আমরা দেখিনি।’ 

নরসিংদী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে চট্টগ্রামের উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনের কমিশনার (উপসচিব) পদে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) আমি দেশে ছিলাম না। ১৯ তারিখ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসি। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ সাইফুল ইসলামকে ২২ জুলাই এমসিসিতে স্বাক্ষরের জন্য ডিসি হিসেবে চাপ প্রয়োগ করেছেন–এমন অভিযোগের বিষয়ে ডিসি বলেন, ‘আমি যেহেতু ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তাই কোনো কর্মকর্তাকে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিল্পকলা শাখা) ও নরসিংদী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (১৮ জুলাই) মৌসুমী সরকার রাখী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৎকালীন সদর উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড ও ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন বলে শুনেছি। কারণ ঘটনার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি এতটাই তীব্র ছিল, নিরাপত্তার কারণে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট সে সময় ডিসি কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ডিসি কার্যালয়ে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই আরেকটি বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাইফুল ইসলামের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।