প্রবাসীদের আয়ের ওপর নতুনভাবে কর আরোপের প্রস্তাব করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) বিপরীতে প্রণোদনা দেওয়া কমিয়ে আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব তাও জানতে চেয়েছে।
আইএমএফ থেকে ভ্যাট আদায় বাড়াতে করদাতা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনলাইনে যাচাই, রিটার্ন না দিলে বিদেশ ভ্রমণে বাধা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ২৪ হাজার কোটি টাকা আদায় এবং মামলায় আটকা ৪৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে।
গতকাল বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে টানা ৫ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদল থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানয়িছেন, এসব প্রস্তাবের অনেকগুলো এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করতে কাজ চলছে। তবে প্রবাসী আয়ের ওপর নতুন কর আরোপের বিষয়ে খতিয়ে দেখতে হবে, এটা আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না। এনবিআর সূত্রে এসব জানা যায়।
গতকালের বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যান্য বন্দর থেকেও রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মকৌশল গ্রহণের বিষয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদল তাগাদা দিয়েছে। ভ্যাট আদায়ে সম্পূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। উপজেলা পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ে কঠোরতা বাড়াতেও বলেছেন বৈঠকে উপস্থিত আইএমএফের প্রতিনিধিরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আইএমএফ থেকে অনেক প্রস্তাব দেওয়া হয়। তার মানে এই না যে সব মেনে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার ও ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার দেয়। পরের বছর ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার দেয় সংস্থাটি। গত জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ১৩৩ কোটি ডলার দেওয়া হয়।
সাত কিস্তিতে সাড়ে তিন বছরে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যস্ত সংস্থাটি দিয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১০৬ কোটি ডলার।
গত জুনে আইএমএফের পর্ষদ বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়েছে। ঋণের পরিমাণে আরও ৮০ কোটি ডলার যুক্ত করেছে। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫০ কোটি ডলার হয়েছে। কিস্তির সংখ্যা বাড়িয়ে সাত থেকে আটটি করা করেছে।
সংস্থাটির কাছে আরও পাওয়া যাবে ১৮৬ কোটি ডলার। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। ঋণ অনুমোদনের আগে আইএমএফ একগুচ্ছ শর্ত দিয়েছিল বাংলাদেশকে। সেই সময়ে শেখ হাসিনার সরকার সেই শর্তগুলো মেনেই ঋণ গ্রহণ করেছিল।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে যাওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা জানিয়ে দিয়েছেন আপতত ঋণের কিস্তি দেওয়া হবে না। তবে আশা ছাড়েনি বাংলাদেশ। এবারের সফরে সংস্থাটির প্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট করতে পারলে ঋণের কিস্তি পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সরকার-সংশ্লিষ্টরা। গত বুধবার আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসে। দলটি ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত থাকবে। এবারের সফরের প্রথম দিনেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে। দ্বিতীয় দিনে এনবিআরের সঙ্গে দীর্ঘ এ বৈঠক করে।
এবার আইএমএফের গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকসের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে দলটি এসেছে। আগেরবারের মিশনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন এই ক্রিস পাপাজর্জিও।
এনবিআরের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে রাজস্ব ঘাটতির কারণ এবং তা দূরীকরণে এনবিআরের কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব ঘাটতি কেন, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটি এনবিআরের হিসাব তুলে ধরে জানায়, গত তিন মাসে অর্থাৎ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এ সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৯৯ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯১ হাজার ৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পাশাপাশি পৃথকভাবে প্রতি মাসেই রাজস্ব আদায় ছিল গতিহীন। প্রতি মাসেই লক্ষ্যের তুলনায় আদায় হয়েছে কম। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ১১১ কোটি টাকা। এ সময় লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। প্রথম মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা ঘাটতি দিয়ে শুরু। অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ফলে ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আইএমএফের ঋণের কিস্তি সরকারের দরকার। সরকার চেষ্টা করবে এবারের সফরে আইএমএফকে নিশ্চয়তা দিতে যে সংস্থাটির শর্ত পূরণে বাংলাদেশ জোরেশোরে কাজ করছে।