‘মামলা, হামলা, হুলিয়া নিতে হবে তুলিয়া’–রাজনৈতিক অঙ্গনের বহুল শ্রুত এই স্লোগান গত দেড় যুগ দিয়ে যেতে হয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা।
বিএনপির কমবেশি সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকেই এমন হামলা, মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তাদের কাউকে ঘর ছেড়ে, কাউকে গ্রাম ছেড়ে, আবার কাউকে দেশ ছেড়েও পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছেন, এ উপলক্ষে দলটির তিন স্তরের তিনজন নেতা গতকাল বুধবার দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে গত ১৭ বছরের স্মৃতিচারণা করেছেন। তারা হলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর আবু নাছের শেখ, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী) ও লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আবু হান্নান লাভলু।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কারামুক্ত জীবনযাপন করছেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোরও নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। সর্বশেষ খালাসের রায় ঘোষণার প্রায় চার মাস পর আজ দেশে ফিরছেন তিনি।
চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তারেক রহমানের খালাসের রায় বহাল রাখেন। এই রায়ে বহুল আলোচিত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানসহ আসামিদের খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এই নিয়ে ৫০টির বেশি মামলা ছিল। তবে সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে বলতে না পারায় উদ্ধৃত হতে চাননি তারা। ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এসব মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে।
মামলাগুলোর মধ্যে ছয়টি মামলার বিচার শেষে সাজা ঘোষণা করা হয়। আর কিছু মামলা স্থগিত অবস্থায় ছিল। তবে কোনো মামলাতেই তিনি সাজা ভোগ করেননি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান সব মামলা থেকে একে একে খালাস পান।
দলীয় আইনজীবীরা জানান, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৭টি মামলা হয়েছে। বাকি মামলাগুলো হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, অর্থ পাচার, বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি ও ইতিহাস বিকৃতি এবং মানহানির মামলা।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো একে একে খারিজ হয়েছে। এরই মধ্যে রয়েছে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি, নাইকো দুর্নীতি, গ্যাটকো দুর্নীতি, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি, মানহানি ও নাশকতার মামলা। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাভোগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খলেদা জিয়া।
এ ছাড়া দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও ছিল কয়েক শ করে মামলা। সব মিলে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ মামলা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার আসার আগে। মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা দলটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খানের (সোহেল) বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল কমবেশি ৪৫০টি। সবচেয়ে বেশি মামলায় হওয়া অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল), বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমানের (শিমুল বিশ্বাস)। তাদের মধ্যে রিজভীর বিরুদ্ধে ১৮০টি, আলালের বিরুদ্ধে আড়াই শ আর শিমুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দেড় শর বেশি মামলার কথা জানা গেছে।
এত এত মামলার ভিড়ে কেউ ঘরছাড়া হয়েছেন। কেউ হয়েছেন গ্রামছাড়া। আবার কেউ দেশ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন বিদেশে। তাদের একজন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর আবু নাছের শেখ। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই ২০০৯ সালে আমার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা অফিসে হামলার অভিযোগে মিথ্যা মামলা দেয়। পরের বছর ২০১০ সালে আমি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমাই।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই। আমার পরিবারের ওপরও ছিল মামলা, ভোগান্তি। ২০১৪-১৫ সালে আমার ছোট ভাইকে পুলিশ ধানমন্ডি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আমার বাবা বয়স্ক মানুষ। ওনার নামেও তিনটি মিথ্যা মামলা ঠুকেছে। ২০১৭ সালে লন্ডন হাইকমিশন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণের পর রাষ্ট্রদোহ মামলা হয় আমার বিরুদ্ধে। সব মিলে মোট ৭-৮টি মিথ্যা মামলা আমার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সহিংস হামলা চালিয়ে আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এ সময় আমার পরিবারের সদস্য ও নেতা-কর্মীরা আহত হন।
২০২৪ সালে লন্ডনে ছাত্রলীগের হামলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হই। তখন আমার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। গত ১৭ বছরে আমার ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী) বলেন, ‘আওয়ামী দুঃশাসনের সময় আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১২টি। এই এক ডজন মামলায় জেল খেটেছি দুবার, রিমান্ডে যেতে হয়েছে অসংখ্যবার। আমাকে সাত দিন গুম করে রাখা হয়েছিল। আওয়ামী দুঃশাসন ও স্বৈরশাসনামলে ইতিহাসের বর্বরোচিত নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা, গুম, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার-কারাবন্দির শিকার হয়েছি আমি। অবর্ণনীয় এসব নির্যাতনের শিকার হয়েও দীর্ঘ এই সময় ধরেই বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থেকে মাঠে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে শরিক থেকেছি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। দলের প্রতি আনুগত্য ও আদর্শের প্রতি ছিলাম অবিচল।’
লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আবু হান্নান লাভলু বলেন, ‘গত ৩৬ বছর ধরে আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এই তিন যুগের মধ্যে চাটখিল সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদে এবং কলেজ ছাত্রদলের সম্পাদক এবং ভাটরা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি এবং পরে যুবদলের সভাপতি ছিলাম। রামগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি ছিলাম, উপজেলা বিএনপির সদস্য ছিলাম। আওয়ামী লীগের সময় ২০১৬ সালে ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করে হামলা মামলার শিকার হই। ১৯৯৬ আমল থেকেই হামলা-মামলার শিকার হয়ে এসেছি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের আমলে ২০০৯ সাল থেকে ১৫টি মামলা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে আছে হত্যা মামলা, মিথ্যা মামলা ও গায়েবি মামলা। ফেরারি হতে হয়েছে আমাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আমি নই। আমার নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলা হয়েছে। আমার পরিবার-পরিজনের ওপর হামলা-মামলা হয়েছে। আমার মা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। তারা আমার গ্রামের বাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগ করেছে শতাধিকবার। আমি পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসতে পারিনি। আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিজের, নেতা-কর্মীর ও পরিবার-পরিজনের এসব মামলা মোকাবিলা করতে আমার আর্থিক ক্ষতিই হয়েছে কোটি টাকা। নিজের জমি, পুকুরের মাছ, গাছ বিক্রি করে এসব সামাল দিতে হয়েছে। এতে আমি অনেকটা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি। এর মধ্যেও কেন্দ্র ঘোষিত সব কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি ছিল আমার এবং আমার নেতা-কর্মীদের।’