বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ৭ জুনের নির্বাচনে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের আধিক্য খুব বেশি। তা যেমন কাউন্সিলর হওয়ার ক্ষেত্রে, তেমনি পরিচালক পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও। যে কারণে নতুন মুখের ভিড় বেশি। এদের অনেকেই আছেন, যাদের ক্রিকেটের সঙ্গে পূর্বের কোনো রকম সম্পৃক্ততা ছিল না। সেখানে ব্যতিক্রম প্রফেসর ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম। বিসিবিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করলেও পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার।
ছাত্রজীবনে খেলেছেন ক্রিকেট। পরে জড়িত হয়েছেন ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে। ক্রিকেটের সঙ্গে এ রকম সম্পৃক্ততার কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের সমালোচনার তীর তার দিকে বেশি বিদ্ধ হয়নি। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কাউন্সিলর হয়ে তিনি বিসিবিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন। জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদী। কাউন্সিলররা তাকে বিবেচনা করবেন বলে তার বিশ্বাস।
চাঁদপুরের মতলব উপজেলার সন্তান প্রফেসর ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম বেড়ে উঠেছেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। স্কুল জীবনে ছিলেন তুখোড় ক্রিকেটার। ছিলেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র হিসেবে খেলেছেন স্কুল টিমে। হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কলেজ টিমেও জায়গা করে নেন। চট্টগ্রাম প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ খেলেছেন আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাব, এলিট পেইন্ট ক্লাব, ডক্টরস ক্লাব। স্টার যুব ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলেছেন মোহামেডান ব্লুজ, জুনিয়র ফ্রেন্ডসের হয়ে। ক্লাব ক্রিকেটে স্বীয় প্রতিভার ছাপ রেখে তিনি জায়গা করে নেন চট্টগ্রাম জেলা যুব দলে।
ঢাকার মিলনার্স প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে খেলেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়ে। এরপর আর তার খেলোয়াড়ি জীবন এগোয়নি মেধাবী ছাত্র হওয়ার কারণে। খেলার পেছনে অনেক সময় ব্যয় হওয়ার কারণে পরিবার থেকে চাপ আসে না খেলার জন্য। ফলে সেখানেই থেমে যায় খেলোয়াজি জীবন। এরপর মেডিকেলে পড়ায় মনোযোগ দেন। এমবিবিএস শেষ করে তিনি পরবর্তীতে গ্লাসগো থেকে ডিপ্লোমা ইন ডার্মাটোলজি (ডিপ ডার্ম), যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিপ্লোমা ইন এসথেটিক মেডিসিন ডিগ্রি নেন।
বাংলাদেশের এসথেটিক ডার্মাটোলজির পথিকৃত হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে নন্দিত। তিনি বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ও প্রখ্যাত চর্মরোগ, এসথেটিক ডার্মাটোলজি ও হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ঢাকা ডার্মাটোলজি ইনস্টিটিউট, লেজার ট্রিট, ডিএইচআই, ক্লিনিক টুয়েন্টি ওয়ানের প্রধান পরামর্শদাতা এবং এম এইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান। ছাত্রজীবনে খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি বিএনপির আদর্শে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সংগঠকমনা ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম খেলাধুলার পাশাপাশি পেশাজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান। মোহামেডান ক্লাবের স্থায়ী সদস্য। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যানও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সংস্কারবিষয়ক কমিটির বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য। ড্যাবের (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি। এসথেটিক ডার্মাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি, সার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব এসথেটিক ডার্মাটোলজির ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলা ডার্মার মহাসচিব। এ ছাড়াও তিনি বিএনপির চাঁদপুর জেলা কমিটির সদস্য আবার মতলব উত্তর উপজেলা বিএনপির উপদেষ্টা। উত্তরা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, বনানী ক্লাব, বারিধারা ক্লাব ও বুট ক্লাবের সদস্য।
বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও খেলাধুলার প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করেন ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম। রাজনৈতিক কারণে বিগত সময়ে তিনি ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে জড়িত হতে পারেননি। এখন আবার সব কিছু অনুকূলে আসায় নিজেকে আবার ক্রীড়াঙ্গনে ফিরিয়ে এনেছেন। কাজ করতে চান দেশের ক্রিকেটের জন্য। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আমার ক্লাব ওয়ান্ডারার্সের সবাই চেয়েছেন আমি বিসিবিতে যাই। আমিও চেয়েছি। আমি জিয়া স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উপদেষ্টা ছিলাম। আমার সব সময় ইচ্ছা ছিল দেশের জন্য বড় পরিসরে কিছু করা।
আমি মনে করি যে ক্রিকেটার, সংগঠক, চিকিৎসক হিসেবে আমার যা অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেটকে আমি কিছু দিতে পারব। একটা ভালো প্ল্যাটফর্ম থাকলে কাজ করার সুবিধা হয়।’ এবারের নির্বাচনে নতুন ও তরুণ প্রার্থীর আধিক্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বসূরি যারা আছেন তারা ক্রিকেট বোর্ডকে একটা অবস্থানে দাঁড় করিয়ে গেছেন। তারা তাদের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী করেছেন। এখন যে বোর্ডটা আসতেছে সবই নতুন। নিউ ব্লাড, স্পিরিটেড। সবার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, অন্যান্য কানেকশন খুবই ভালো। তারা নতুন পার্সপেক্টিভে যদি চিন্তা করে, আর সিনিয়র যারা আছেন সবাই মিলে আলটিমেটলি ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডে শুধু ক্রিকেটার না, আরও অন্য সব ধরনের পেশার লোক লাগে। শুধু ক্রিকেট জ্ঞান থাকলে চলবে না, ম্যানেজমেন্টের জ্ঞানও থাকতে হবে। যারা নির্বাচন করছেন তারা শিক্ষা-দিক্ষা শৌর্য-বীর্য সবদিক দিয়েই আমি মনে করি যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল। কারও বয়সই একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না। অনেকে বাইরে পড়ালেখা করেছে। এরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো যোগ্যতা রাখে। তারা ভালো করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ অভিজ্ঞতার ঘাটতি হবে না বলেও মনে করেন ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম।
তিনি বলেন, ‘নতুন বোর্ড মনে করি না। ফাহিম সিনহা আছে। রফিক বাবু ভাই আছেন। জেলা পর্যায়েও কয়েকজন আছেন যারা আগে বিসিবিতে ছিলেন। এ ছাড়া পাপ্পু ভাই, মাসুদুজ্জামানের মতো অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠকও আছেন। আমার মনে হয় নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে।’ ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে রিলেশন থাকলে তো বোর্ডের কোনো কিছু আদায় করা সহজ হয়। এখানে অনেকেই সরকারের সঙ্গে জড়িত। সরকারের কাছে ইজিলি এক্সেসেবল আছে। এটাকে আমি পজেটিভ হিসেবে নিতে পারি।