ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের কাউন্সিলর এবং ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামানের নির্বাচনি ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়! তিনি নির্বাচন করতে চান। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত আর নির্বাচন করতে পারেননি? তা যেমন বিসিবির ক্ষেত্রে, তেমনি জাতীয় নির্বাচনেও। বিসিবির নির্বাচনে দুই-দুইবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। একই ভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার পরও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেক প্রতিকুলতার পর অবশেষে তার নির্বাচনি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে। বিসিবির ৭ জুনের নির্বাচনে তিনি মোহামেডানের কাউন্সিলর হয়ে পরিচালক পদে নির্বাচন করছেন।
২০২১ সালে মোহামেডান ক্লাবের কাউন্সিলর হিসেবে মাসুদুজ্জামান ক্লাব কোটায় ‘বি’ ক্যাটাগরিতে প্রথমবারের মতো বিসিবির নির্বাচনে পরিচালক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ময়দানে আর টিকতে পারেননি। প্রবল চাপের মুখে মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের কাউন্সিলর হওয়ার পরও নির্বাচনের আগের দিন তিনি সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এই সরে দাঁড়ানোর কারণ তিনি সে সময় বলতে পারেননি। এমন কি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও তুলেননি। সরে দাঁড়ানোর পেছনে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছিলেন। তবে তিনি সে সময় জানিয়েছিলেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও ক্রিকেট এবং বিসিবির কল্যাণে কাজ করে যাবেন। সেটি তিনি অব্যাহত রাখেন। মোহামেডানের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি সিসিডিএমের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন। প্রিমিয়ার লিগে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কো-স্পন্সর হিসেবেও নিয়ে আসেন।
সময়ের পরিক্রমায় দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দেশে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের আমলে বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর বিসিবির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারও মাসুদুজ্জামান নির্বাচন করতে পারেননি। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সরাসরি হস্তক্ষেপে বিএনপি ঘরনার ক্রীড়া সংগঠকরা নির্বাচন বর্জন করেন। ফলে মাসুদুজ্জামানকেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এ নিয়ে মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের কারণে (২০২১ সালের নির্বাচন) এমনটি হয়েছিল। জোরপূর্বক সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কাউন্সিলরদের কাছ থেকে আমি ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলাম। নির্বাচন করতে পারলে আমার জয় সুনিশ্চিত ছিল। গত বছরের নির্বাচন তো সবাই দেখেছেন। নির্বাচন করার কোনো পরিবেশই ছিল না।’
পরপর দুইবার বিসিবির নির্বাচন করতে না পারার পর মাসুদুজ্জামান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। মনোনয়ন পাওয়ার অনেক আগে থেকেই তিনি নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি জয়ী হওয়ার জন্য আরও জোরেশোরে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ এক দিন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিরাপত্তাশঙ্কা ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। টানা তিনটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর অনেকেই বলাবলি করতে থাকেন তার নির্বাচনি ভাগ্য ভালো না। তার কপালে হয়তো নির্বাচনই নেই। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘লাকি, আনলাকি আসলে কোনো বিষয় না। পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
ক্রীড়ানুরাগী মাসুদুজ্জামানের ক্রিকেটাঙ্গনে আবির্ভাব হয় ২০১৫ সালে মোহামেডান ক্লাবের ক্রিকেট কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব নিয়ে। তিনি যে সময় দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সে সময় মোহমেডান খুবই দুঃসময় পার করছিল। লিগ শিরোপা থেকে বঞ্চিত অনেক বছর। সে সময় মোহামেডান শিরোপা জিতবে কী? কোনো রকম টিকে থাকার জন্য দল গড়ত? মোহামেডান ক্লাবের স্থায়ী সদস্য মাসুদুজ্জামান ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্রিকেট কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালেই চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ক্রিকেট দলের চেহারাই বদলে দেন। জাতীয় দলের নামিদামি ক্রিকেটারদের দলে নিয়ে বিগ বাজেটের দল গড়তে থাকেন।
সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ-তাসকিন থেকে শুরু করে অনেককেই দলে ভেড়ান। কিন্তু শিরোপা জেতা আর হয়নি। তবে শিরোপার রেসে ছিল। গতবার তারা রানার্সআপ হয়েছিল। মোহামেডানের নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক মাসুদুজ্জামান বর্তমানেও ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবার তো বলা যায় একপ্রকার জাতীয় দলই গড়েছেন। পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে আছে মোহামেডান। সবাই আশা করছেন ২০০৮-০৯ সালের পর মোহামেডান হয়তো এবার শিরোপার খরা কাটাবে। এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে তা হবে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা পাওয়ার পর মোহামেডানের প্রথম শিরোপা। মোহামেডানের ক্রিকেট কমিটির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি মোহামেডানের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তরুণ বয়সে নারায়ণগঞ্জ শুকতারা যুব সংঘের হয়ে ফুটবল খেলা মাসুদুজ্জামান শুধু মোহামেডানের ক্রিকেট দলের পেছনেই অঢেল টাকা খরচ করছেন না, প্রিমিয়ার লিগে তার আরেকটি ক্লাব আছে ঢাকা লেওপার্ডস। সেই ক্লাবের চেয়ারম্যান তিনি। এ ছাড়া তার নিজ এলাকা শাপলা ক্রীড়া চক্রের উপদেষ্টাও। মডেল গ্রুপের এমডি মাসুদুজ্জামান ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, আর্মি ক্লাবেরও সদস্য। এবার তার নির্বাচনি ভাগ্য পক্ষে আসার পর জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। একই ভাবে একটি ভালো নির্বাচনেরও আশা করছেন।
তিনি বলেন, ‘আশা করি এবার ভালো একটা নির্বাচন হবে। ভালো একটা নির্বাচনের আশায়ই তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। সবাই একটা ভালো নির্বাচন দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। আশা করি আমি জয়ী হব।’