ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জোয়ার। সেই জোয়ারে নতুন করে ঢেউ তুলেছে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। প্রায় প্রতিটি টেস্ট খেলুড়ে দেশেই শুরু হয়েছে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ২০১২ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। কিন্তু বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট আসরের প্রথম পরিচয় কিন্তু বিপিএল দিয়ে নয়। পিসিএল (পোর্ট সিটি ক্রিকেট লিগ) দিয়ে।
সময়টা ২০০৯ সাল। বন্দরনগরি চট্টগ্রামে পিসিএল আয়োজনের মহাযজ্ঞ চলছে। ক্রিকেটারদের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। যা এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের প্রথম পরিচয়। নিলামেও বেশ সাড়া ফেলে। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসানদের নিয়ে কাড়াকাড়ি। তারপর হাবিব গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় একসময় সেই পিসিএল চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে মাঠে গড়ায়। সফল আয়োজন হয়। আয়োজনের এই সফলতায় পরের বছর আসরে নিয়ে যাওয়া হয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে। মরুর বুকে শারজাহতে। সেখানেও আয়োজন সফল হয়। আর পেছনে কাজ করেছিলেন কিংবা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর। অন্তপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক। ক্রিকেট দিয়েই পরিচিতি বেশি। যদিও খেলাধুলার অন্য মাধ্যমেও তার সমান বিচরণ। সেই সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর ১৪ বছর পর আবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদে ফিরেছেন। বিসিবির ৭ জুনের নির্বাচনে তিনি ক্যাটাগরি ‘সি’ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
বিসিবির এবারের নির্বাচন এখন পর্যন্ত ৬ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সেখানে সবার আগে নাম ছিল সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীরের। কারণ তার ক্যাটাগরিতে শুধু তিনিই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। যদিও এই ক্যাটাগরিতে জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ মনোয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল নির্বাচন কমিশনের ভুল। কারণ বিসিবির গঠনতন্ত্রে কোয়াব থেকে মনোনীত কাউন্সিলর নির্বাচন করার এখতিয়ার রাখেন না। বিদ্যুৎ ছিলেন কোয়াবের কাউন্সিলর। পরে নির্বাচন কমিশন বিদ্যুৎকে ডেকে নিয়ে তার মনোনয়পত্র সংগ্রহের টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। এরপর বাকি থাকে যায় সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ্য হয় কিনা, তা দেখার। নির্বাচন কমিশন ২৩ মে তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলে সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীরের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এখন বাকি শুধু নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।
সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর এর আগে ২০০৫-০৭ মেয়াদে বিসিবির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছিলেন। এরপর আসে নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ড। সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীরের মতো নিবেদিত প্রাণ সংগঠকদের জায়গা হয়নি বোর্ডে। কিন্তু বিসিবিতে না থাকলেও চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। একই সময় তিনি সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে চট্টগ্রাম ক্রিকেট প্লেয়ার অ্যাসোসিয়েশনেরও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আবার ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় আম্পায়ার্স অ্যান্ড স্কোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ সালে সহযোগী আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় প্রথমবারের মতো আইসিসির ওয়ানডে বিশ্বকাপ। সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর চট্টগ্রাম ভেন্যুর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি প্রতি মেয়াদেই বিসিবির নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটিতেও একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এবার তিনি পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর হিসেবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর হয়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ন্যক্কারজনক হস্তক্ষেপে ‘নির্বাচন করার মতো পরিবেশ নেই’ অভিযোগ এনে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পর আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছেন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি দীর্ঘদিন পর আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। এই সুযোগ যাতে আমি সততার সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে কাজে লাগাতে পারি সেই দোয়া আমি সবার কাছে চাই।’
বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন ‘ক্রাইসিস’ সময় পার করছে উল্লেখ করে সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, ‘আসলে দেশের ক্রিকেট এখন ক্রাইসিস সময় পার করছে। আমরা সব সময় ক্রিকেটে কঠিন সময় ফেস করেছি। ২০০৫ সালে যখন ক্রিকেট বোর্ডে ছিলাম, তখন কিন্তু ক্রিকেটের এ রকম রমরমা অবস্থা ছিল না। আবার একটা ক্রাইসিস মোমেন্টে পরিচালক হয়েছি। এ রকম কঠিন সময় আমি সবার, বিশেষ করে মিডিয়ার সহযোগিতা দরকার। ক্রিকেট-সংশ্লিস্ট সবার সহযোগিতা দরকার। সবাইকে নিয়েই কিন্তু ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধু পরিচালক যারা আছেন, তারা কাজ করলে কিন্তু ক্রিকেটের উন্নয়ন হবে না। সবাইকে নিয়ে ক্রিকেটের জন্য কাজ করতে হবে।’
পলাশ/অনিক/