সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর তালিকায় নজর দিলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় তা হলো, প্রায় প্রতিটি দেশেরই সামরিক শক্তি অভাবনীয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অথবা কথিত সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, বিশ্ব মোড়লরা কীভাবে তাদের সামরিক শক্তির ঝুলি দিন দিন আরও ভারী করছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় অদৃশ্য এক কোণে বসে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে কিছুটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি রাখার প্রচেষ্টাই ‘সামরিক শক্তির আদ্যোপান্ত’ সিরিজ। এই সিরিজে আজ থাকছে স্পেনের সামরিক শক্তির বিস্তারিত-
ইউরোপের প্রেক্ষাপটে স্পেনের সামরিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদের আমল থেকে অসংখ্য সংস্কার ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সামরিক অবস্থানে পৌঁছেছে দেশটি।
.jpg)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্পেনের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস খুললে ইউরোপীয় মধ্যযুগে ফিরে যেতে হয়। ইউরোপের খ্রিষ্টান রাজাদের জোট ১৪৯২ সালে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম দখলদারত্ব হটাতে ‘দ্য রিকন্সটিকা’ নামের সামরিক বাহিনী গঠন করে। সেই সময় থেকেই স্পেনের সামরিক শক্তির উত্থান।
১৬ শতকের শুরু থেকে প্রায় ২০০ বছর স্প্যানিশ আর্মাডা নৌবাহিনীর মাধ্যমে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রায় পুরোটা এবং এশিয়ার আংশিক অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে স্পেন।
তবে ১৫৮৮ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্মাডার পরাজয়ের পর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার সুযোগ হারায় দেশটি।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং উপনিবেশের দখল হারানোয় স্পেন আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও বেশ কয়েকটি গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এদিকে ১৮৯৮ সালে স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধে কিউবা, পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপিনের দখল হারিয়ে সামরিক পরাশক্তির তালিকায় স্পেনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তবে ১৯৭৫ সালে জেনারেল ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর স্পেনের সামরিক খাতে ব্যাপক সংস্কার ঘটে। ১৯৮২ সালে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শক্তিধর দেশের সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা আধুনিক সামরিক প্রথায় অংশ নেয় স্পেন। এ পরিবর্তনের কারণে দেশটির সামরিক বাহিনীতে ইতিবাচক সংযোজন ও রদবদল ঘটে।
বর্তমান সামরিক সক্ষমতা
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্সের (জিএফপিআই) তথ্যানুযায়ী, স্পেনের বর্তমান সামরিক অবস্থান ১৮৫টি দেশের মধ্যে ২০তম। দেশটির সামরিক গঠন সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিশেষ কার্যকরী। দেশের প্রতিরক্ষা, ন্যাটোর সামরিক দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তি বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করে স্পেনের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী।
দেশটিতে মোট এক লাখ ২০ হাজার সামরিক সদস্য সরাসরি কর্মরত। প্রায় ১৫ হাজার সদস্য রাখা হয়েছে সংকটকালীন সহায়তার জন্যে।
বছরে জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ২৮ শতাংশ বরাদ্দ পায় স্পেনের সামরিক খাত। এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ন্যাটোর নিয়ম অনুযায়ী, সদস্যদের বার্ষিক ২ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হয়। স্পেন এই মাত্রা থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সম্প্রতি বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা চলছে দেশটির পার্লামেন্টে।
সেনাবাহিনী
স্পেন সেনাবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বহরে রয়েছে লেপার্ড-২-এর মতো শক্তিশালী ট্যাংক। গোলাবারুদের ভাণ্ডারে আছে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বেশকিছু বিস্ফোরক। এ ছাড়া দেশে তৈরি পিজ্জারো ইনফ্যান্ট্রি ভেহিকলস (পিঠে বহনকারী হালকা অস্ত্র) সম্মুখযুদ্ধে বেশ কার্যকরী হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
.jpg)
নৌবাহিনী
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে স্পেনের নৌ-সক্ষমতা বেশ প্রশংসিত। এজিস কমব্যাট প্রযুক্তিসম্পন্ন এফ-১০০ ক্ল্যাসিক নৌযানের পাশাপাশি হুয়ান কার্লোস-১-এর মতো যুদ্ধজাহাজ আছে দেশটির নৌবহরে।
দেশের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত ন্যাটোর নৌ মিশন, জলদস্যুবিরোধী অভিযান এবং ভূমধ্যসাগরীয় সুরক্ষা অভিযানে অংশ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক সামরিক প্রেক্ষাপটে স্পেন শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
বিমানবাহিনী
দেশটির বিমানবহরে রয়েছে ইউরোফাইটার টাইফুন ও এফ/এ-১৮ হর্নেট ফাইটারের মতো শক্তিশালী যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া সামরিক রসদ বহনের উদ্দেশ্যে তাদের রয়েছে বিশেষায়িত বিমান এ৪০০এম।
আকাশসীমার কার্যকর নজরদারি ও সুষ্ঠু গঠনগত বিস্তারের উদ্দেশ্যে বিমানবাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সমন্বয় করেছে স্পেন।
ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্পিত দায়িত্ব
ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে স্পেন অন্যতম। দেশে রোটা নৌঘাঁটি এবং মরন বিমানঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়ে ন্যাটোর সংকটাপন্ন অবস্থায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সহজ সমাধান দিয়েছে স্পেন।
পশ্চিম ইউরোপে ন্যাটোর শক্ত অবস্থান নিশ্চিতে বাল্টিক ওয়ার পুলিশিং মিশনেও অংশগ্রহণ করছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা মিশন সমন্বয়ে কাজ করছে তারা।
.jpg)
পরমাণু নীতি
পারমাণবিক প্রত্যাহার নীতির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্পেন ১৯৭০ সালে নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফেরাশন ট্রিটি (এনপিটি) চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশটি নিজের সার্বভৌম অঞ্চলে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
স্পেনের সংবিধানে সহিংসতার শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়টি উল্লিখিত রয়েছে।
এদিকে এনপিটি স্বাক্ষর করলেও আঞ্চলিক ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে ন্যাটোর পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে স্পেন। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও ন্যাটোর সহযোগী দেশগুলোর পারমাণবিক সক্ষমতা ব্যবহারে বাধা নেই সংবিধানে।
.jpg)
সামরিক শক্তির গঠনগত বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সমসাময়িক আক্রমণ ঠেকাতে স্পেনের সামরিক গঠনে কার্যকরী বিবর্তন দেখা গেছে। সাইবার হামলা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো সমস্যা সমাধানে সামরিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে তারা।
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি
ন্যাটোর দেওয়া বার্ষিক জিডিপির ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা বরাদ্দ বাস্তবায়নে কাজ করছে স্পেন। অস্ত্রের বহরের আধুনিকায়ন, নৌ-সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সাইবার সুরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
আঞ্চলিক বাধা
ভূপ্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থরিতা মোকাবিলায় স্পেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ও উত্তর আফ্রিকার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে স্পেনের সামরিক বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি আবশ্যক।
এক্ষেত্রে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলকে ঘিরে মরক্কোর সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করে দেয়।
সাইবার সুরক্ষায় স্পেনের পদক্ষেপ
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের ময়দান সাইবারস্পেস পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাইবারস্পেসে কঠোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছে স্পেনের সামরিক বাহিনী।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সামরিক পদক্ষেপ
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সামরিক সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই দুর্যোগকালীন ত্রাণ সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
আন্তর্জাতিক সহাবস্থান
ভবিষ্যতে দেশের প্রতিরক্ষা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে স্পেন ইতোমধ্যেই ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আটলান্টিক নৌ-অঞ্চলে নিজেদের প্রতিপত্তি নিশ্চিত করতে রোটা নৌঘাঁটি ব্যবহার করার চিন্তা করছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
স্পেনের সামরিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে ঐতিহাসিক সক্ষমতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যের তুলনায় আকারে ছোট হলেও অস্ত্রের আধুনিকায়ন, শক্তিশালী নৌবহর এবং আঞ্চলিক দাপটের মাধ্যমে স্পেন নিজেদের অবস্থান ক্রমেই শক্ত করে তুলছে। সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় স্পেনের সামরিক বাহিনী শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করবে বলেই প্রত্যাশা।
সূত্র: গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স (জিএফপিআই), ন্যাটো ওয়েবসাইট, দ্য ডিফেন্স পোস্ট, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই), মিনিস্টেরিও ডি ডিফেন্সা (স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়), ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিফেন্স পলিসি ডকুমেন্টস।
নাইমুর/পপি/অমিয়/