সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর তালিকায় নজর দিলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় তা হলো, প্রায় প্রত্যেকটি দেশেরই সামরিক শক্তি অভাবনীয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অথবা কথিত সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখতে পাওয়া যায়, বিশ্ব মোড়লরা কীভাবে তাদের সামরিক শক্তির ঝুলি দিন দিন আরও ভারী করছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় অদৃশ্য এক কোণে বসে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে কিছুটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি রাখার প্রচেষ্টাই ‘সামরিক শক্তির আদ্যোপান্ত’ সিরিজ। এই লেখা সামরিক খাতে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনকে নিয়ে।
ব্যাপক বিবর্তনের পর চীনের সামরিক শক্তির বর্তমান অবস্থান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমীহ অর্জন করে নিয়েছে। আধুনিকায়নের প্রতি দায়বদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার কারণে দেশটির সামরিক বাহিনী এখন বেশ শক্তিশালী।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
চীনের সেনাবাহিনীর গোড়াপত্তন হয় ১৯২৭ সালে সংঘটিত চীনা গৃহযুদ্ধের সময় পিপলস্ লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) গঠনের মাধ্যমে। এই দল শুরুতে গেরিলা যুদ্ধ করলেও পরে ১৯৪৯ সালে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে গতানুগতিক সামরিক বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত কোরীয় যুদ্ধে এই সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে সমর্থ হয়। এর পর কয়েক দশক দেশটির পারমাণবিক বোমা তৈরিতে মনোনিবেশ করে। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমা ও ১৯৬৭ সালে হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। ১৯৭৮ সালের পর থেকে প্রযুক্তির অভাবনীয় আধুনিকায়নের কারণে দেশটির সামরিক খাতে ব্যাপক রদবদল ঘটে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে চীনের বর্তমান সামরিক বাহিনী বিশ্বের যেকোনো দেশকে টেক্কা দিতে সক্ষম।
আধুনিক সামরিক সক্ষমতা
চীনের সামরিক খাতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রেই লেগেছে। সেনার সংখ্যা বাড়ানো থেকে শুরু করে, নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো, বিমান খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক খাতে চীনের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়।
দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ সামরিক সদস্য সরাসরি কর্মরত। সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাখা হয়েছে আরও ৫ লাখ সদস্য। এ ছাড়া আধাসামরিক বাহিনীগুলোতে প্রায় ১৫ লাখ সদস্য রয়েছেন।

সেনাবাহিনী
চীনের সেনাবাহিনী অতীতে জনবলনির্ভর হলেও, বর্তমানে তারা সামরিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনের বিষয়ে বেশি নজর দিয়েছে। সেনাবাহিনীর রয়েছে প্রায় সাত হাজার ট্যাঙ্ক। এর মধ্যে আধুনিক টাইপ ৯৯-এ ও টাইপ ৯৬ ট্যাঙ্ক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা নিশ্চিতে জেবিডি-০৪এ’র মতো শক্তশালী সাজোয়াঁ যান রয়েছে তাদের। এমনকি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা কমাতে চালকবিহীন ড্রোন প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করছে চীনের সেনাবাহিনী। এ ছাড়া আক্রমণ মোকাবিলায় অস্ত্রের আধুনিকায়ন ও যুদ্ধে দ্রুত অবতরণের উদ্দশে আরও আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টায় রয়েছে চীনা সেনাবাহিনী।
নৌবাহিনী
জাহাজের সংখ্যা বিবেচনায় চীনের নৌবাহিনী বিশ্বে সর্ববৃহৎ। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও হার মানিয়েছে চীন। লিয়াওনিং, শানডং ও ফুজিয়ানের মতো এয়ারক্রাফটের পাশাপাশি তাদের রয়েছে বেশকিছু শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ।
চীনের টাইপ-০৫৫ জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্রের এইজিস যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে তুলনা করেন অনেকে। এ ছাড়া টাইপ-০৫৪এ জাহাজের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের নাভিশ্বাস উঠাতে প্রস্তুত চীনের নৌবাহিনী।
এদিকে চীনের নৌবহরে ৭০টি শক্তিশালী সাবমেরিনের মধ্যে বেশ কয়েকটি আবার পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন। এই জাহাজগুলো ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ জাহাজকে নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া টাইপ-০৯৪ সংস্করণের জাহাজটিও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে বেশ কার্যকর।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রভাব বাড়াতে নির্দিষ্ট সমুদ্রাঞ্চলের বাইরেও ক্ষমতার প্রতিফলন দেখাতে চায় প্রায় সব দেশ। এই বাস্তবতা হজম করে নিলে চীনের নৌ-খাতকে বেশ সফলই বলতে হয়।

বিমানবাহিনী
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবহরের অধিকারী চীনের বিমানবাহিনী। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখে দেশটি তাদের বিমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার আক্রমণের সক্ষমতা সংস্থাপনের বেশি নজর দিচ্ছে। বর্তমানে চীনের বিমানবহরে রয়েছে জে-২০ মাইটি ড্রাগনের মতো শক্তিশালী যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় এফ-২২ ও এফ-৩৫ বিমানের সঙ্গে টেক্কা দিতে সক্ষম চীনা প্রযুক্তির এই আকাশযান। এ ছাড়া জে-১৬ ও যে-৩৫ সংস্করণের বিমানগুলোও যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
বোমা নিক্ষেপের জন্য চীনের রয়েছে বিশেষায়িত বিমান। এর মধ্যে বহুল প্রচলিত এইচ-৬কে সংস্করণের বিমানটি রুশ টু-১৬ বিমানের মডেল থেকে অনুপ্রাণিত।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে সামরিক সদস্যদের উদ্ধারের জন্য বেশকিছু বিমানের পাশাপাশি আধিনিক এআই যুদ্ধেও এগিয়ে আছে চীন। এর মধ্যে উইং লুং ও সিএইচ সিরিজের বিমানগুলো উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, নজরদারির মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে থাকতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সোয়ার্ম ড্রোন ব্যবহার করছে চীনা বিমানবাহিনী। এমনকি বিমান মাটিতে অবতরণ না করিয়েই জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশটি।

চীনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা
চীনের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী। ডিএফ-৪১’র মতো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল থাকায় ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রেও আঘাত হানতে সক্ষম চীন। এ ছাড়া ডিএফ-৩১এ’র মতো মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করতে পারে চীন।
এ ছাড়া ডিএফ-১৭ সংস্করণের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অতর্কিত আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সক্ষম চীন।
দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের বহরে সংঘটিত সাম্প্রতিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নজরে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের স্থাপন করেছে চীন।
পারমাণবিক সক্ষমতা
চীনের পারমাণবিক খাত খুব দ্রুত এগোচ্ছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৬০০ পারমাণবিক বোমা রয়েছে বলে জানা গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে বোমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘কঠোর ধৈর্যের’ বিষয়টি মেনে চলে চীন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ব্যতীত স্বপ্রণোদিত হয়ে বোমা নিক্ষেপের বিপক্ষে বেইজিংয়ের পারমাণবিক নীতি। তবে পারমাণবিক খাতে চীনের অত্যধিক নির্ভরতা বিশ্বের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত ভূরাজনোইতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে প্রতিপন্ন করতে মরিয়া চীন। যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে বিশ্বজুড়ে বেইজিংয়ের আধিপত্য আদৌ কখনো বাস্তবায়ন হবে কি না, হলেও তা নব্য সাম্রাজ্যবাদের পথ এড়িয়ে শান্তির দিকে আগাতে পারবে কি না, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মনে।
সূত্র: গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্স, চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সিএনএন, হাডসন অর্গানাইজেশন, রয়টার্স, আর্মি ইউ প্রেস
অমিয়/