মাছে-ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকায় রুই, কাতলা কিংবা ইলিশের মতো মাছের পাশাপাশি তেলাপিয়াও বেশ জনপ্রিয়। কম দামে সহজলভ্য এবং দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই মাছের চাহিদা অনেক। তবে তেলাপিয়া এখন শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
ব্রাজিলের গবেষকেরা তেলাপিয়া মাছের চামড়া ব্যবহার করে পোড়া ও গভীর ক্ষত নিরাময়ের নতুন উপায় নিয়ে কাজ করছেন। যে চামড়া এতদিন মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ফেলে দেওয়া হতো, সেটিই এখন চিকিৎসাক্ষেত্রে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সিয়েরার গবেষকদের মতে, যেখানে মানবদেহের ত্বক প্রতিস্থাপনের (স্কিন গ্রাফটিং) সুযোগ সীমিত বা উপযুক্ত দাতার অভাব রয়েছে, সেখানে তেলাপিয়ার চামড়া কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
গভীর পোড়া বা গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে সাধারণত ত্বক প্রতিস্থাপন কিংবা পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে জটিলও হতে পারে। তাই কম খরচে ও সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে তেলাপিয়ার চামড়ার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।
কেন তেলাপিয়ার চামড়া?
গবেষণায় দেখা গেছে, তেলাপিয়ার চামড়ায় উচ্চমাত্রায় টাইপ-১ কোলাজেন থাকে, যা নতুন ত্বক গঠনে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি ক্ষতস্থানের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বাইরের জীবাণুর সংক্রমণ থেকে ক্ষতকে সুরক্ষা দেয়।
এ ছাড়া তেলাপিয়ার চামড়ায় এমন কিছু প্রোটিন ও জৈব উপাদান রয়েছে, যা ক্ষত নিরাময়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে ক্ষত দ্রুত শুকাতে এবং নতুন কোষ গঠনে সহায়তা পাওয়া যায়।
কীভাবে ব্যবহার করা হয়?
ব্যবহারের আগে তেলাপিয়ার চামড়া বিশেষ পদ্ধতিতে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর তা ক্ষতস্থানের ওপর প্রয়োগ করা হয়।
এই চামড়া ক্ষতের ওপর একটি প্রাকৃতিক আবরণ তৈরি করে, যা- ক্ষতকে বাইরের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে,
ক্ষতস্থানের আর্দ্রতা ধরে রাখে, ব্যথা কমাতে সহায়তা করতে পারে, এবং নতুন ত্বক গঠনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে।
ব্রাজিলে পরিচালিত কয়েকটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে তেলাপিয়ার চামড়া ব্যবহারে ক্ষত দ্রুত শুকিয়েছে এবং বারবার ড্রেসিং পরিবর্তনের প্রয়োজন কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ত্বক গঠনের পর মাছের চামড়ার আবরণ নিজে থেকেই আলাদা হয়ে গেছে।
ব্রাজিলের পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি, মিলার স্কুল অব মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া-সহ বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তেলাপিয়ার চামড়া থেকে চিকিৎসা-উপযোগী বায়োমেটেরিয়াল ও বিশেষ ধরনের ব্যান্ডেজ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলাপিয়ার চামড়া থেকে তৈরি জৈব ড্রেসিং বা ব্যান্ডেজ ভবিষ্যতে পোড়া ও জটিল ক্ষতের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে উন্নত ত্বক প্রতিস্থাপন চিকিৎসা সহজলভ্য নয়, সেখানে এটি স্বল্প ব্যয়ের কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, তেলাপিয়ার চামড়া এখনও প্রচলিত স্কিন গ্রাফটিংয়ের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে স্বীকৃত নয়। এটি বর্তমানে গবেষণা ও সীমিত চিকিৎসা ব্যবহারের পর্যায়ে রয়েছে। আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল গবেষণার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই এর ব্যাপক ব্যবহার সম্ভব হবে।