সপ্তাহ পার হতে চললেও অমর একুশে বইমেলার লিটলম্যাগ চত্বর নিষ্প্রভ হয়ে আছে। মেলা চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে উঁচু-নিচু মাটি। চারপাশের গাছের পাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা বলেছেন, সবসময়ই লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণটি অবহেলিত থাকে। এবার সেই অবহেলা দ্বিগুণ বেড়েছে। এদিকে বাংলা একাডেমি বলছে, এই সংকট দ্রুতই কেটে যাবে।
মেলা শুরুর দিন থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, চত্বরের চারপাশে লাল মাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। মাটিগুলো সমান না করায় লিটলম্যাগ চত্বরে আগতদের হাঁটতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আবার গাছের পাতা চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সৌন্দর্যেও ভাটা পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক নিড়ানি দেওয়া ফসলের খেতের সঙ্গে তুলনা করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘লিটলম্যাগ চত্বর তো চত্বর না, এর চেয়ে চষা খেতও ভালো। অনেকটা নিড়ানি দেওয়া খেত ফেলে রাখলে যেমনটা হয় তেমন।’
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কিশোর ম্যাগাজিন রূপকথার সম্পাদক কাজী আমির হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে খবরের কাগজকে বলেন, ‘লিটলম্যাগ চত্বরের অবস্থা তো ভালো! এখানে কি লোকজন আসে? আসে না তো! লোকজন হাঁটলে না বোঝা যাবে এখানে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না কি।’
এদিকে লিটল ম্যাগাজিন লেখমালার সম্পাদক মামুন মুস্তাফা বলেন, ‘মাটি দিয়েছে ভালো করেছে; তবে যদি ল্যান্ড লেভেলার দিয়ে সমান করে দেওয়া হতো তাহলে চত্বরটি দেখতে ভালো লাগত। পাঠক-দর্শনার্থীরা সহজে চলাফেরা করতে পারতেন।’
ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিন ভ্রমণগদ্যের বিক্রয়কর্মী হোসেন সোহরাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘বরাবরই মেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে লোকসমাগম কম হয়। এবারও নেই বললেও চলে। তারপর চত্বরের অবস্থা তো দেখছেনই। একটু দৃষ্টি নন্দন-পরিপাটি করলে উপস্থিতিও কিছুটা বাড়ত। তখন বিক্রিও কিছুটা হতো।’
এদিকে বাংলা একাডেমি বলছে, লিটলম্যাগ চত্বরের সংকটগুলো শিগগির কেটে যাবে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব সেলিম রেজা বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে ৪০ জন এবং বিকেলে ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মেলাজুড়ে কাজ করছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, পাতা পরিষ্কারের পর আবারও পাতা পড়ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আরেকটি বিষয় হলো মাটি সমান করার কথা আমরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে বলেছি। আশা করি, দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে।’
গতকাল পর্যন্ত মেলায় নতুন বই এসেছে ২৮২টি। গতকাল সপ্তম দিনে এসেছে ৮১টি। এর মধ্যে গল্পের বই ছিল ১৩টি, উপন্যাস ১১টি, প্রবন্ধ ২টি, কবিতা ৩৪টি, গবেষণা ১টি, জীবনী ২টি, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ৩টি, স্বাস্থ্য ১টি, অনুবাদ ১টি, অভিধান ১টি ও অন্যান্য ১০টি।
আজ বৃহস্পতিবার মেলার অষ্টম দিন। বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ: সুকান্ত ভট্টাচার্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
বইমেলার পরিবেশ আশঙ্কাজনক: দাবি প্রকাশক ঐক্যের
স্টল বিন্যাসে স্বজনপ্রীতি, অবকাঠামো নির্মাণে অবহেলা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ঘাটতির কথা জানিয়ে অমর একুশে বইমেলার পরিবেশ ‘আশঙ্কাজনক’ বলে অভিযোগ তুলেছে প্রথম সারির প্রকাশকদের মোর্চা প্রকাশক ঐক্য। গুরুতর এসব অভিযোগের কথা জানিয়ে গতকাল বুধবার তারা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমকে চিঠি দিয়েছে।
প্রকাশক ঐক্যের পক্ষে ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্রুখ মহিউদ্দীন, অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, কাকলীর প্রকাশক এ কে নাসির আহমেদ, অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক, কথাপ্রকাশের জসীম উদ্দিনসহ ১৫ জন প্রকাশক স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলা একাডেমির সঙ্গে ‘প্রকাশক ঐক্য’র সমঝোতা অনুসারে শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৫ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ৬ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশক ঐক্যের অভিযোগ, ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এসব স্টল বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।’ প্রকাশকরা এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি মহাপরিচালকের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
এবারের বইমেলার মাঠের অবকাঠামো ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। প্রকাশকরা বলেন, মেলার মাঠে চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অসমতল ও ঝুঁকিপূর্ণ। মাঠে নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি ছিটানো হচ্ছে না; ফলে প্রচুর ধুলা উড়ছে। সন্ধ্যার পর থেকে মশার উপদ্রবেও স্টলের কর্মীরা নাজেহাল হচ্ছেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। মেলাপ্রাঙ্গণে মাদক বিক্রি ও সেবনের ঘটনা ঘটছে বলেও প্রকাশকরা উল্লেখ করেন।
প্রকাশকরা বলেছেন, রাতে স্টল বন্ধ হওয়ার পর মেলা প্রাঙ্গণে ছিন্নমূল ও বহিরাগত মানুষের অবাধ প্রবেশ ঘটছে। এতে প্রকাশকদের কোটি কোটি টাকার বই ও সম্পদের চরম নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে মেলাপ্রাঙ্গণে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকরা।