আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে আনন্দ মিছিল-মিষ্টি বিতরণ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে।
আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশ ঘোষণার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পায়রা চত্বরে উল্লাস করতে থাকেন শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষজন।
এসময় একে অপরের মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। এদিকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। টিএসসি চত্বর থেকে আনন্দ মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এর আগে টিএসসির পায়রা চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, ‘আজকের যে রায় হয়েছে তা দুই হাজার শহিদ ভাইয়ের রক্তের বুদবুদ থেকে এসেছে। আজকে রায় পেয়েছি কিন্তু আমরা শুধু রায়েই সন্তুষ্ট নই। যতদিন পর্যন্ত না খুনি হাসিনাকে বাংলাদেশে এনে ফাঁসি দেওয়া না হবে ততদিন পর্যন্ত সবাইকে রাজপথে থাকতে হবে।’
সূর্য সেন হল সংসদের ভিপি আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এটি তো আদালযতের রায়। জনগণের রায় হচ্ছে খুনি হাসিনাকে বাংলাদেশে এনে শাহবাগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।’
ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গুম-খুন-হত্যা-নির্যাতন করে বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যের অনুসারী করে পরিচালনা করা হয়েছিল। ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচালনা করা হয়েছিল। আজ আমরা এর বিচার পেয়েছি। আজকে যে রায় পেয়েছি তা চূড়ান্ত নয়। অতি দ্রুত খুনি হাসিনাকে দেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। এই ফাঁসি কার্যকর করতে সবাইকে রাজপথে থাকতে হবে।’
দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায় বিচারের প্রতিফলন হয়েছে। ধন্যবাদ জানাই এই ট্রাইবুনালকে। হাসিনাকে ভারত থেকে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। কালবিলম্ব না করে পররাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে এই রায় কার্যকর করুন।’
এ সময় মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ‘এই মুহূর্তে খবর এলো, খুনি হাসিনার ফাঁসির রায় হলো’, ‘খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন, ভোটচোরের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘দিল্লি না ঢাকা-ঢাকা’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘গোলামী না আজাদি, আজাদি-আজাদি’সহ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
টিএসসির বড় পর্দায় দেখানো হয় রায়ের সরাসরি সম্প্রচার
ডাকসুর আয়োজনে রায় ঘোষণার কার্যক্রম বড় পর্দায় সরাসরি দেখানো হয়। সকাল ১১টার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে বড় পর্দায় রায় ঘোষণা দেখতে জমায়েত হতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। পুরো সময় ধরে উৎসুক জনতার মধ্যে একধরনের উত্তেজনা দেখা যায়। পরবর্তীতে মৃত্যু দণ্ডের রায় ঘোষণা করলে সেই উত্তেজনা উল্লাসে রূপ নেয়।
রায়ের পর গণ সিজদাহ্
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড রায় ঘোষণার পর গণসিজদাহ করেছে ‘মঞ্চ ২৪’। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর হাইকোর্টের মাজার গেটের পাশে এ গণসিজদাহ কর্মসূচি পালন করা হয়।
ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে: শিবির
এই রায়ে দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে এবং গণহত্যাকারী হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে উল্লেখ করে স্বাধীন বিচারব্যবস্থায় এ রায়ে ভুক্তভোগীদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
আজ সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এই কথা বলেন। এছাড়া ওই বিবৃতিতে জুলাই গণহত্যাই নয়, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে ২০০৯ সালের পিলখানা গণহত্যা, আল্লামা সাঈদীর রায়-পরবর্তী গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা এবং পল্টন ট্রাজেডিসহ সমস্ত গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার আহ্বান জানানো হয়।
রায়কে ঘিরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিল। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও শাহবাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শাহবাগ থানার দক্ষিণ পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ছবির হাটে দুষ্কৃতকারীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এদিকে শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাজিব চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, তারা এ নিয়ে কাজ করছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে মারাত্মক আহত করার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে এই মামলা হয়। গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আলোচিত এই মামলার রায়ের দিন ধার্য করেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে- উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো ছিল অন্যতম। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চেখ হাসিনাসহ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজস্বাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
আরিফ জাওয়াদ/মাহফুজ