শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহতের ঘটনায় বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু)।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১২টায় ক্যাম্পাস জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ডাকসু-হল সংসদ নেতারাসহ কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী।
এইদিন রাত সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তন থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে, মুহসীন হল, হল পাড়া, মল চত্বর, রোকেয়া হল হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ ও কর্মসূচিতে ‘তারেক জিয়ার অনেক গুণ, শেরপুরে মানুষ খুন’, ‘তারেক রহমান জানেন না-কি, খুনিদের লিডার আপনি’, ‘শেরপুরে খুন কেন, খুনি তারেক জবাব দে’, ‘নারীর উপর হামলা কেন, খুনি তারেক জবাব দে, ‘প্ল্যান কোন প্ল্যান, মানুষ খুনের মাস্টারপ্ল্যান’, ‘খুনি আর স্বৈরাচার, মিলে মিশে একাকার’, ‘গোলামি না-আজাদি, আজাদি-আজাদি’, ‘ক্ষমতা না জনতা, জনতা-জনতা’, ‘তুমি কে, আমি কে হাদি-হাদি’, ‘তুমি কে, আমি কে- রেজাউল’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর রেজাউল’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ডাকসু সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহা. মহিউদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বিএনপি এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং খুনের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আপনারা যদি বাংলাদেশে রাজনীতি করতে চান তাহলে গণমানুষের যে আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি সেই রাজনীতি করুন। এদেশে খুনের রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই। খুনের রাজনীতি খুনি হাসিনা করে গিয়েছে সেটি যদি আপনারা করতে থাকেন, অবশ্যই এর জবাব বাংলাদেশের মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারি দেবে।’
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘‘৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিএনপিকে ঘিরে ইতিবাচক প্রত্যাশা করেছিলাম যে তারা ভালো আচরণ করবে কিন্তু লম্বা সময়ের জন্য দেখেছি তারা আড়াই শতাধিক নিজেদের দলের মানুষকে তারা খুন করেছে। খুনকে এন্টারটেইনমেন্ট পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে মোটামুটি। তারেক রহমান যখন বাংলাদেশে এসে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ঘোষণা দিলেন, আশা করেছিলাম তার কাছে হয়ত আলাদিনের চেরাগ আছে যেটা দিয়ে বিএনপিকে চেঞ্জ করে ফেলবেন। কিন্তু আমরা দেখেছি তিনি আসার পরে হত্যাকাণ্ড, চাদাবাজি যুক্ত হয়েছে। যেগুলো এখন মিডিয়ায় আসতে পারে না। আর সংবাদপত্রে আসলে সেই সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। তারা প্রত্যেকটা মিডিয়াকে হুমকি দিয়ে পকেটে ফেলেছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি সারাদেশে ক্যাম্পেইন করছে, বড় বড় বক্তৃতা রাখছে কিন্তু এখন পর্যন্ত জুলাই সনদের পক্ষে একটিমাত্র বক্তৃতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আসে নাই। তাদের এই আচরণের জবাব আমরা ১২ ফেব্রুয়ারি দেব। যদি আপনারা সেই হাসিনার পথে হাঁটতে না চান, আপনারা পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। সময় থাকতে আপনার দলকে গোছান, খুনিদেরকে সরান, ১২ তারিখ যাতে জুলাই গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ এর পক্ষে মতামত দেয় সেই ক্যাম্পেইন শুরু করুন এবং নারী আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। যদি ব্যবস্থা না নেন অতি শিগগিরই দলীয়ভাবে অবস্থান আমরা ধরে নেব আপনার সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।’
সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, শহিদ জিয়ার আর বিএনপি নেই। বেগম খালেদা জিয়ার আর বিএনপি নেই। এখন বিএনপি হয়ে গেছে চান্দাবাজ টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসদের আতুরঘর। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী গত দেড় বছরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রাহাজানির সাথে যেই দলটি সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল তার নাম হচ্ছে বিএনপি। আমরা দেখতে পেয়েছি বিএনপি নিজেদের মধ্যাকার দ্বন্দ্বে ২০০ এর অধিক মানুষকে মেরে ফেলেছে। যাদের হাতে নিজেদের দলের লোকরা নিরাপদ না তাদের হাতে কিভাবে দেশ নিরাপদ হবে। আমরা আশা করেছিলাম বিএনপির নেতা তারেক রহমান দেশে আসার পরে এই বিশৃঙ্খল বিএনপিকে তিনি সাবধান করবেন। তাদেরকে ঠিক করবেন। তিনি আসার পরে বলেছেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম সারাদেশে ৫০ এর অধিক জায়গায় আমাদের মা-বোনদের উপর হামলা। প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় মহল্লা মহল্লায় চাদাবাজির সাথে এই দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সর্বপর্যায়ে নেতৃবৃন্দ চাদাবাজির সঙ্গে জড়িত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যাওয়ার আগে তারা আগেই পরাজয় মেনে নিয়েছে। আমরা চাই, পরাজয় বরণ করার দরকার নেই, সুস্থতার রাজনীতি করেন। শহিদ জিয়ার যেই বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার যে বিএনপি সেই বিএনপির আদর্শ বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি করেন। তাহলে আপনাদের যেই হারানো অতীত আছে সেটা ফিরে আসবে। আমি অনুরোধ করব, জনাব তারেক রহমানকে এখনো সময় আছে। আপনার দলকে আপনি সংস্কার করেন। জুলাই বিপ্লবের যে আকাঙ্ক্ষা শহিদদের যে আকাঙ্ক্ষা সেটাকে ধারণ করেন। সন্ত্রাসী যারা আছে নারী হেস্তাকারী যারা আছে তাদেরকে আইডেন্টিফাই তাদেরকে বিচার আওতায় নিয়ে আসেন।’
জামায়াত নেতা নিহতের বিচারের দাবি জানিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ‘শেরপুরের মধ্যে এই বিএনপির সন্ত্রাসীরা হামলা করে জামায়াতের রেজাউল ভাইকে হত্যা করেছে এবং একই সাথে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ এর অধিক জনতা আহত অবস্থায় হাসপাতালে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানাব, অতি দ্রুত রেজাউল ভাইয়ের হত্যার সাথে যে সমস্ত খুনিরা জড়িত আছে তাদেরকে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার আওতায় আনুন।’
এতে অন্যান্যদের মধ্যে ছাত্র পরিবহণ সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ, সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী, সদস্য মিফতাউল হোসাইন আল মারুফ, রায়হান উদ্দীনসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন।
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে আয়োজিত ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে মঞ্চে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে গুরুতর আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম (৪২) মারা গেছেন। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত সোয়া ৯টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এর আগে বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মঞ্চে বসেন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন কর্মী-সমর্থক চেয়ারে বসা নিয়ে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে শতাধিক মানুষ আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
আরিফ জাওয়াদ/অমিয়/