রানী হামিদ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার দাবা খেলার ঐতিহ্য। তিনি এমন একজন প্রতিভাবান দাবাড়ু, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দাবা অঙ্গনকে আলোকিত করেছেন। তার অসাধারণ খেলা, প্রতিভা ও সংগ্রামের গল্প তাকে শুধু একজন সফল দাবাড়ু হিসেবে নয় বরং দেশের নারীদের জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ৪৫তম দাবা অলিম্পিয়াডের আটটি ম্যাচের ভেতর সাতটিতেই জিতেছেন ৮১ বছর বয়সী এই দাবাড়ু।
রানী হামিদের জন্ম ১৯৪৪ সালে, সিলেটে। ছোটবেলা থেকেই বই, লেখাপড়া এবং খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন তিনি। তবে দাবার প্রতি তার ভালোবাসা গড়ে ওঠে বিয়ের পর। তার স্বামী খন্দকার হামিদুল হক ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি তাকে দাবা খেলার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। এই আগ্রহ ধীরে ধীরে তার মধ্যে প্রতিভার পরিস্ফুটন ঘটায় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে একজন আন্তর্জাতিক মানের দাবাড়ুতে পরিণত করে। রানী হামিদ যখন প্রথম দাবার দুনিয়ায় প্রবেশ করেন, তখন বাংলাদেশে নারীদের জন্য এই খেলা ছিল অনেকটা অপরিচিত । সেই সময় মেয়েদের খেলার সুযোগ কম ছিল এবং সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের দাবার মতো কঠিন খেলায় অংশগ্রহণকে সমর্থন করত না। কিন্তু রানী হামিদ তার লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াননি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এই জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
১৯৭৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ চেস ফেডারেশনের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন এবং খুব দ্রুতই সবার নজরে আসেন। তিনি মোট ২০ বার জাতীয় নারী চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, যা বাংলাদেশের দাবা ইতিহাসে একটি অদ্বিতীয় রেকর্ড। এ ছাড়া তিনি ১৯৮৩ সালে এশিয়ান চেস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। রানী হামিদ আন্তর্জাতিক মাস্টার (উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার) হিসেবে স্বীকৃত। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। রানী হামিদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে ২০০৩ সালে ভারতবর্ষের এশিয়ান জোনাল চ্যাম্পিয়নশিপে তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। তিনি ইংল্যান্ড, ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং তার খেলার জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করেছেন।
দাবা খেলা রানী হামিদের জীবনে এমন গভীর প্রভাব ফেলেছে যে এটি তার জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। তিনি সবসময় বলেছেন, ‘দাবা শুধু একটি খেলা নয়; এটি একটি চিন্তা, ধৈর্য ও কৌশলের পরীক্ষা।’ বর্তমানে তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে দাবার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছেন এবং বিভিন্ন দাবা প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন। রানী হামিদ শুধু একজন দাবাড়ু নন, তিনি বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মেয়েরা শারীরিক বা মানসিক কোনো দিক থেকেই ছেলেদের থেকে পিছিয়ে নেই এবং কোনো খেলায় অংশ নিতে বা জয়ী হতে তাদের কোনো সামাজিক বাধা থাকা উচিত নয়। তার সফল ক্যারিয়ার এবং সংগ্রামী জীবন নারীদের শিখিয়েছে- সঠিক ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি শুধু বাংলাদেশের নারীদেরই নয় বরং সারা বিশ্বের নারীদের জন্য একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তার অবদান ও সংগ্রাম নারীদের খেলাধুলার ক্ষেত্রে আরও ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আজকের দিনেও রানী হামিদ বাংলাদেশের দাবার অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। নতুন প্রজন্মের জন্য তার প্রতিটি অর্জন এক একটি প্রেরণার উৎস। তিনি নিজেই এক অধ্যায় এবং তার অবদান ও কৃতিত্বের মাধ্যমে তিনি দেশের সুনামকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
জাহ্নবী
.jpg)