ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
টোল আদায়ে অনিয়ম: শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ গ্রেপ্তার ১৬ অ্যান্টি-করোসিভ প্রেম কাপ্তাই হ্রদে নাব্যসংকটে লঞ্চ চলাচল সীমিত, ভোগান্তিতে ৫ লাখ মানুষ কবর থেকে তোলা হচ্ছে না সালমান শাহর মরদেহ মেহেরপুরে জেলা বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ফুটবল বিশেষজ্ঞ বউ ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীর পদ বাতিল ঢাবির রোকেয়া হলে কাঁঠাল পাড়তে গিয়ে মালির মৃত্যু আক্রমণের ধারা নষ্ট করতে চান না টুখেল উখিয়ায় ৪০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদককারবারি গ্রেপ্তার ‘সোমেশ্বরী’র পরিচালক নওশাবা মৌলভীবাজারে মধ্যরাতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস জামালপুরে লাগেজে মিলল যুবকের মরদেহ পাঠকের গল্প : একটি খালি বেডের গল্প ‘আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে কি না, সিদ্ধান্ত নেবে আদালত’ মমেকে হামের উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু, নতুন ভর্তি ২৪ জাবিতে নীতিনির্ধারণী তিন পর্ষদে ২৮ শূন্যপদ, সংকটে স্বায়ত্তশাসন জ্বালানি তেলের ভবিষ্যৎ কি চীনের হাতে? দেশে অস্থিতিশীলতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে : রিজভী মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে ৪৩১ পদে বড় নিয়োগ হিলিতে বিএনপির মোটরসাইকেল শোডাউন ন্যাটোর সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই আর্কটিকে রাশিয়ার পারমাণবিক বোমারু বিমানের টহল জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার লোহাগাড়ায় দুই বাসের সংঘর্ষে কলেজছাত্রী নিহত জীব ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অধ্যায় থেকে ৩টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও  উত্তর, ২য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার বেনাপোলে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে শ্রমিক দলের বিক্ষোভ হ্যারি কেইনের ফর্মকে প্রশংসায় ভাসালেন ডেক্লান রাইস নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা চোখে পড়া জাতির জন্য ব্যর্থতা: রেলপথমন্ত্রী

চাকরি না পেয়ে নিজেই গড়লেন কর্মসংস্থান

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
চাকরি না পেয়ে নিজেই গড়লেন কর্মসংস্থান
জুয়েনা ফেরদৌস

চলচ্চিত্রের ঝলমলে আলোর জগৎ থেকে একেবারে ভিন্ন এক বাস্তবতায় পা রাখা–এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না জুয়েনা ফেরদৌসের জন্য। কিন্তু জীবনের বাঁকে দাঁড়িয়ে নেওয়া সেই কঠিন সিদ্ধান্তই আজ তাকে এনে দিয়েছে সাফল্যের স্বীকৃতি। হয়েছেন বর্ষসেরা মাইক্রো নারী উদ্যোক্তা। তার গল্প শুধু পেশা পরিবর্তনের নয়, এটি এক নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর, নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এবং অন্য নারীদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার গল্প।

একসময় ঢাকায় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জুয়েনা। কাজ করেছেন প্রখ্যাত নির্মাতা তারেক মাসুদের সঙ্গে। সৃজনশীল এই জগতেই নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ব্যক্তিগত এক কারণে তাকে ফিরে যেতে হয় নিজের শহর রংপুরে। সেই ফেরা যেন ছিল এক অনিশ্চিত যাত্রার শুরু।

‘ঢাকায় আমি যে কাজগুলো করতাম, রংপুরে এসে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না,”—বলছিলেন জুয়েনা। চাকরির বাজারে হতাশা তাকে ভাবতে বাধ্য করে—নিজের কর্মসংস্থান নিজেকেই তৈরি করতে হবে। সেখান থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার বীজ বপন।

শুরুর দিনগুলো ছিল দিশেহারা। কখনো শতরঞ্জি বোনা শেখার চেষ্টা, কখনো গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স—সবই ছিল নিজের জন্য একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস। কিন্তু কোনো কিছুই স্থায়ীভাবে এগোয়নি। এরই মধ্যে করোনার ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায় তার গ্রাফিক্স সংশ্লিষ্ট কাজটিও।

এই অনিশ্চয়তার মাঝেই আসে এক নতুন ধারণা। বিদেশে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে পরামর্শ পান—পরিবেশবান্ধব ব্যাগ তৈরি করলে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি নিশ্চিত ছিলেন না তিনি। তবে কৌতূহলবশত বাজার খুঁজতে গিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় আগ্রহ।

‘বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে দেখলাম তারা কীভাবে ব্যাগ তৈরি করে। তখন মনে হলো—এই কাজটা আমার সঙ্গে যায়’—বলছিলেন তিনি।

এরপরই শুরু। মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কেনা, সঙ্গে একজন কর্মী—নিজের ঘরেই গড়ে ওঠে ছোট্ট একটি কর্মশালা। কিন্তু উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা কখনোই মসৃণ হয় না, জুয়েনার ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম ছিল না।

প্রথম এক বছর তার তৈরি পণ্য বিক্রি হয়নি বললেই চলে। কোথাও সাড়া পাননি। এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, বাজার বোঝার চেষ্টা করেছেন। যখন মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন, ঠিক তখনই আসে বড় ধাক্কা—৫০০ ব্যাগের একটি অর্ডার তৈরি করার পর ক্রেতা সেটি বাতিল করে দেন।

“ওটা আমার জন্য খুব কঠিন সময় ছিল। অনেক লোকসান হয়েছে। কিন্তু তখনই সিদ্ধান্ত নিই—এখানেই থেমে গেলে চলবে না,”—বললেন তিনি।

ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই আবার শুরু। এবার কৌশল বদলালেন। বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শুরু করলেন। নানা সংগঠন ও উদ্যোক্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হলেন। এতে করে বাড়তে থাকে পরিচিতি, তৈরি হয় নতুন যোগাযোগ।

পাশাপাশি নিজের পণ্যের মান নিয়েও আপস করেননি তিনি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে উন্নত করেছেন ডিজাইন ও মান। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল আসে ২০২১ সালে। জার্মান কালচারাল সেন্টারের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বড় অর্ডার পান তিনি।

‘আমি খুব মন দিয়ে কাজটা করেছিলাম। ওটাই ছিল আমার টার্নিং পয়েন্ট’—বললেন জুয়েনা।

সেই অর্ডার শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই এনে দেয়নি, খুলে দেয় নতুন দরজাও। কাজের মান দেখে জার্মান দূতাবাস থেকেও যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অর্ডার, তৈরি হয় বাজারে তার পরিচিতি।

বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ‘আহ্লাদ ফ্যাশনস’ শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি হয়ে উঠেছে অনেক নারীর জীবিকার উৎস। চারটি গ্রামের প্রায় ৮০ জন নারী তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাটের হস্তশিল্প তৈরি করছেন। এছাড়া তার নিজস্ব কারখানায় কাজ করছেন আরও ১২ জন।

‘আমি চাই নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারা যেন নিজের আয় দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে’—বলছিলেন তিনি।

তার তৈরি ব্যাগগুলো শুধু নান্দনিক নয়, পরিবেশবান্ধবও। পাট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি এসব পণ্য এখন বাজারে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও তৈরি হয়েছে চাহিদা।

এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জুয়েনা ফেরদৌস পেয়েছেন ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০২৫’। বর্ষসেরা মাইক্রো নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এই অর্জন তার দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বর্তমানে জুয়েনা ফেরদৌসের ব্যবসা সম্ভাবনাময় অবস্থানে থাকলেও পুঁজির সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে তিনি এখনো ব্যবসাকে কাঙ্ক্ষিত পরিসরে সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। তবে এই সীমাবদ্ধতাকে বাধা নয়, বরং ধাপে ধাপে এগোনোর একটি বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন তিনি।

নারীদের জন্য তার বার্তা স্পষ্ট—আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না। তিনি মনে করেন, অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক বাধা নারীদের পিছিয়ে দেয়, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। ছোট উদ্যোগ দিয়েই শুরু করা যায়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য, শেখার আগ্রহ এবং লেগে থাকার মানসিকতা। তার মতে, আত্মবিশ্বাসই একজন নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি দেয়।

জুয়েনার গল্প আমাদের এটাই শেখায় যে, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নতুন করে শুরু করা সম্ভব। ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেটাই শেষ নয়। সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় এবং নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে পথ তৈরি হয় নিজে থেকেই।

চলচ্চিত্রের ক্যামেরার পেছন থেকে উঠে এসে আজ তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার গল্প—যেখানে সংগ্রাম আছে, আছে সাহস, আর আছে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।

/এসএল

ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কিছু নাম আজও যথাযথভাবে আলোচিত হয় না, অথচ তাদের অবদান যুগান্তকারী। তেমনই একজন অগ্রদূত ছিলেন ডা. যামিনী সেন। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অংশগ্রহণ ছিল নানা সামাজিক কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন তিনি নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সাহস দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

ডা. যামিনী সেনের জন্ম উনিশ শতকের শেষভাগে এমন এক সময়ে, যখন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, নারীর স্থান ঘরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি সেই ধারণাকে অস্বীকার করে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের পথ বেছে নেন। তার পরিবারের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

কলকাতা মেডিকেল কলেজে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো নানা জটিলতা ছিল। তবু যামিনী সেন চিকিৎসাশিক্ষায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সে সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটিশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। জাতিগত বৈষম্য, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা–সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি।

ইংল্যান্ডে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ অর্জন করেন এবং ব্রিটিশ চিকিৎসাব্যবস্থার কঠোর মানদণ্ডে নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করেন। 

দেশে ফিরে তিনি নারীর স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় অনেক নারী পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচবোধ করতেন। ফলে তাদের চিকিৎসা প্রায়ই অবহেলিত হতো। ডা. যামিনী সেন সেই সংকট দূর করতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। নারী রোগীদের প্রতি তার সহমর্মিতা, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন। চিকিৎসা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার তুলে ধরতেন। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি শুধু রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।

ডা. যামিনী সেনের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তার আত্মবিশ্বাস। ব্রিটিশ শাসকদের আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করা ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ের সামনে বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা ঔপনিবেশিক পরিচয় কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারে না। তার সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাবিদ্যা ও অন্যান্য পেশায় এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।

ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুর্গে নিজের মেধার পতাকা উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন–একজন বাঙালি নারীও বিশ্বমানের চিকিৎসক হতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করতে পারেন।

/এসএল

নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

বর্তমান বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা সৃজনশীল শিল্প–প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলা শুধু মেধার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক শেখা এবং মানসিক দৃঢ়তা। কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বা ‘লেসন’ একজন নারীকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সফল হতে সাহায্য করতে পারে।

নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করুন

ক্যারিয়ার কোথায় নিয়ে যেতে চান, তা আগে নিজেকেই জানতে হবে। পাঁচ বা দশ বছর পর নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। স্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় এবং কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়ে।

শেখার অভ্যাস কখনো বন্ধ করবেন না

ডিগ্রি অর্জনের পরও শেখার প্রয়োজন শেষ হয় না। নতুন প্রযুক্তি, সফট স্কিল, ভাষা কিংবা পেশাগত দক্ষতা নিয়মিত শিখতে হবে। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে যারা দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তারাই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকেন।

আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি

অনেক নারী নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিধা বা সংকোচে পিছিয়ে যান। নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং প্রয়োজন হলে নিজের সাফল্য তুলে ধরতেও সংকোচ করবেন না। আত্মবিশ্বাস আপনাকে নতুন দায়িত্বগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস জোগাবে।

সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হন

কাজ, পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন–সবকিছুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন, অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট কমান এবং প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শিখুন।

যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করুন

ভালোভাবে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিজের মতামত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পারা কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে মিটিংয়ে বক্তব্য দেওয়া–সব ক্ষেত্রেই কার্যকর যোগাযোগ আপনাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেবে।

নেটওয়ার্ক তৈরি করুন

শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতর নয়, পেশাজীবী বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তুলুন। সেমিনার, কর্মশালা, পেশাগত অনুষ্ঠান কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নতুন সুযোগ ও অভিজ্ঞতার দরজা খুলে যেতে পারে।

সফল ক্যারিয়ার মানেই শুধু বড় পদ বা উচ্চ বেতন নয়। বরং এমন একটি পেশাজীবন, যেখানে নিজের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকে, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি থাকে এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। প্রতিটি নারীর পথ আলাদা। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, সফল ক্যারিয়ার একদিনে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট অভ্যাস, সঠিক সিদ্ধান্ত, অবিরাম শেখার মানসিকতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস–এই চারটি ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য। নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন, দক্ষতা বাড়ান এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করুন। তবেই কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

/এসএল

সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

একজন নারী যখন নিজের স্বপ্নকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বানান, তখন তার গল্প অনুপ্রেরণার হয়ে ওঠে হাজারও মানুষের জন্য। যুক্তরাজ্যের লন্ডন বরোর লিটল ইলফোর্ড ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা নাসরিন তন্বীর পথচলা ঠিক তেমনই এক অনন্য উদাহরণ।

সংবাদ উপস্থাপক, মেডিকেল সেক্রেটারি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব–এসব পরিচয়ের পাশাপাশি এখন তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। আর এই অর্জন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি নারীদের সম্ভাবনারও প্রতীক।

টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া শামীমা নাসরিন তন্বী ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না। তার ভাষায়, মানুষের সেবা করার ইচ্ছাই ধীরে ধীরে তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন কমিউনিটির নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকলে আরও কার্যকরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। সেই উপলব্ধিই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ‘নিউহ্যাম ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়েও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারা তার কাছে বড় প্রাপ্তি। তন্বীর মতে, এই বিজয় কেবল একজন প্রার্থীর নয়, বরং স্থানীয় মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। মানুষ নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত সমাধানে বিশ্বাস রেখেই তাকে নির্বাচিত করেছে।

তার এই যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বহুমাত্রিক পরিচয়ের সফল সমন্বয়। একদিকে তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (NHS) মেডিকেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মানুষের সেবা করছেন। তিনি মনে করেন, দুটি ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য একই–মানুষের কল্যাণ। হাসপাতালের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, যা কাউন্সিলর হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর করে তোলে।

সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তন্বী বলেন–সংবাদ উপস্থাপনা তাকে মানুষের গল্প বলার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু রাজনীতি তাকে সেই গল্পের বাস্তব সমাধানে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি শুধু সমস্যার বর্ণনাকারী হতে চাননি; পরিবর্তনের অংশীদার হতে চেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, নারী হিসেবে পথচলায় চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। নেতৃত্বের জায়গায় এখনো নারীদের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক সময় নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও সততা থাকলে কোনো বাধাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তার এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তন্বীর বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, রাজনীতি কোনোভাবেই শুধু পুরুষদের ক্ষেত্র নয়। সমাজের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব সমানভাবে প্রয়োজন। তাই নারীদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তন্বী। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও পরিবারের সমর্থন তাকে মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, পরিবারের আস্থা ছাড়া এমন বহুমাত্রিক দায়িত্ব সামলানো সম্ভব হতো না।

লন্ডনের নির্বাচনে তার বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ, বিশেষ করে টাঙ্গাইল এলাকায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করায় অনেকেই এটিকে নিজেদের গর্ব হিসেবে দেখছেন। তন্বী নিজেও এই ভালোবাসায় অভিভূত।

বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশকে তিনি নিজের শিকড় বলে মনে করেন। ভবিষ্যতে শিক্ষা, নারী নেতৃত্ব, যুব উন্নয়ন ও কমিউনিটি উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যে কাজের অভিজ্ঞতাকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, প্রবাসে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তন্বী বলেন, প্রথম দায়িত্ব মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। তিনি চান, তার কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসুক। দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃহত্তর পরিসরে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, এমন একটি দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া যাতে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা বিশ্বাস করতে পারে—পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শামীমা নাসরিন তন্বী; যিনি নিজের পেশাগত পরিচয়, ব্যক্তিগত স্বপ্ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এক সুতোয় গেঁথে প্রমাণ করেছেন–নেতৃত্বের জন্য লিঙ্গ নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

/এসএল

নারী থাকুক নিরাপদে...

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
নারী থাকুক নিরাপদে...

একটি কন্যাশিশুর জন্মকে ইসলামে শুধু পারিবারিক আনন্দ নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে দেখা হয়েছে। হাদিসে কন্যাসন্তানকে স্নেহ, লালন-পালন ও উত্তমভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মায়ের মর্যাদাকে এতটাই উচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে যে, জান্নাতকে মায়ের পদতলে বলা হয়েছে। বোন পরিবারের স্নেহ ও বন্ধনের প্রতীক, আর স্ত্রীকে বলা হয়েছে একে অপরের পোশাক–যিনি জীবনের নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও প্রশান্তির সঙ্গী। 

অথচ বাস্তবতার নির্মম প্রশ্ন হলো–যে সমাজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার ভাষায় নারীকে এত সম্মান দেয়, সেই সমাজেই মা, বোন ও কন্যার জীবনের নিরাপত্তা আজ কোথায়?
প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, অ্যাসিড হামলা, অনলাইন হয়রানি কিংবা হত্যার খবর। রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে মাত্র চার বছরের এক শিশুর জীবন শেষ হয়েছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ে আরেক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে জঙ্গলে। এ ছাড়াও ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে সিলেটের এমসি কলেজে সংঘটিত গণধর্ষণের মামলার বিচার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে সবার সামনে।

অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতার চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে ভুক্তভোগীর পরবর্তী অভিজ্ঞতা। একজন নির্যাতিত নারী বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হন। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। পরিবারের অনেকেই ‘সম্মান’ রক্ষার নামে ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন। ফলে অপরাধী বুঝে যায় যে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল এবং শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সমস্যা কোথায়? 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি না পাওয়ার নজির তৈরি হয়, তখন অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায় এবং তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোপন ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, সাইবার বুলিং, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা কিংবা ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা এখন নারীর নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ।

পারিবারিক শিক্ষার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। অনেক পরিবারে ছেলেদের শেখানো হয় না যে নারীর সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদা কী। বরং ছোটবেলা থেকেই পুরুষতান্ত্রিক কিছু ধারণা অজান্তে তাদের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়, যেখানে নারীর প্রতি কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক মনে করা হয়।

গণমাধ্যম, বিনোদন এবং সামাজিক পরিবেশও মানুষের আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে। যখন নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে দেখানো হয়, তখন তা সমাজে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।

সমাধান কী?

তবে এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হলে সমাজে শক্ত বার্তা যাবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন নারী অভিযোগ করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শিকার না হন। পুলিশ, হাসপাতাল ও আদালতে সংবেদনশীল সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই পারস্পরিক সম্মান, মানবিকতা এবং সম্মতির গুরুত্ব শেখাতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিক চর্চা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়ানো এবং সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীর নিরাপত্তাকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং একটি রাষ্ট্রের সম্মানের প্রশ্ন। যে সমাজ নিজের মা, বোন ও কন্যাকে নিরাপদ রাখতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না।

/এসএল

অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক সময় ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের জায়গা। এখন এটি মতপ্রকাশ, পেশাগত পরিচিতি তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা এবং সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই একই জায়গা নারীদের জন্য প্রায়ই অপমান, কটূক্তি ও হয়রানির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। 

প্রশ্ন হলো, অনলাইনে নারীরা কেন এত সহজ টার্গেট? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু প্রযুক্তির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে সমাজ, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামোকেও।

অনেকেই মনে করেন, অনলাইন হয়রানি একটি নতুন সমস্যা। বাস্তবে এটি পুরোনো বৈষম্যেরই নতুন রূপ। সমাজে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, পেশা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করার যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

ক্ষমতার রাজনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন কটূক্তি অনেক সময় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। সমাজে যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখন কিছু মানুষ সেটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

ফলে নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়া, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা কিংবা জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায় অনলাইন আক্রমণ। এ কারণেই নারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতারা তুলনামূলক বেশি ঘৃণামূলক মন্তব্যের শিকার হন।

অজ্ঞাত পরিচয়ের সাহস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অজ্ঞাত পরিচয়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ। অনেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কটূক্তি করেন। বাস্তব জীবনে যেটি বলার সাহস পান না, সেটিই অনলাইনে নির্দ্বিধায় লিখে ফেলেন।

মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকার কারণে মানুষ নিজের আচরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা কম অনুভব করে। ফলে সহানুভূতি কমে যায় এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যায়।

অ্যালগরিদম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দুঃখজনকভাবে বিতর্ক, বিদ্বেষ ও উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি করে।

ফলে একটি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য বা অপমানজনক পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যে হাজারও মানুষের সামনে পৌঁছে যায়। এতে শুধু একজন নারী নন, পুরো অনলাইন পরিবেশই নারীদের জন্য কম নিরাপদ হয়ে ওঠে।

অনেকের ধারণা, অনলাইনের মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিলেই হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিয়মিত কটূক্তি, অপমান বা হুমকির শিকার হলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে যান। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন হয়রানি অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রূপ নিতে পারে।

পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?

অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঘৃণামূলক বক্তব্য শনাক্ত ও অপসারণে আরও কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি অপমানজনক মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণের অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

/এসএল