আকাশ জয় করার স্বপ্ন অনেকেই দেখেন, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন খুব কম মানুষ। আর নারীদের জন্য যখন সমাজের বিধিনিষেধ ছিল আরও কঠোর, তখন সেই সীমা ভেঙে ইতিহাস গড়েছিলেন এক সাহসী নারী–অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। তিনি শুধু একজন বৈমানিক ছিলেন না, ছিলেন নারীর স্বাধীনতা, সাহস ও সম্ভাবনার প্রতীক। আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর বিশাল মেঘরাশি চিরে একা উড়ে যাওয়া প্রথম নারী হিসেবে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
১৮৯৭ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন অ্যামেলিয়া। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী ও কৌতূহলী। অন্য মেয়েদের মতো পুতুল খেলা নয়, বরং গাছে চড়া, দৌড়ঝাঁপ আর নতুন কিছু আবিষ্কারের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেতেন। শৈশবেই তার মধ্যে গড়ে ওঠে স্বাধীনচেতা মনোভাব।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সেনাদের সেবায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি কাছ থেকে দেখেন বিমানচালকদের জীবন। তখনই তার মনে জন্ম নেয় উড়ার স্বপ্ন। ১৯২০ সালে প্রথমবার বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা তার জীবন বদলে দেয়। মাত্র ১০ মিনিটের সেই উড়ান তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল–আকাশই তার গন্তব্য।
তখনকার সমাজে নারীদের জন্য বিমান চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব এক বিষয়। কিন্তু অ্যামেলিয়া দমে যাননি। নিজের উপার্জনের টাকা জমিয়ে ফ্লাইং প্রশিক্ষণ নেন। নানা বাধা, অর্থসংকট ও সামাজিক সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। ১৯২১ সালে নিজে প্রথম বিমান কিনে নাম দেন ‘ক্যানারি’।
১৯২৮ সালে প্রথম নারী হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া বিমানের যাত্রী হন অ্যামেলিয়া। যদিও সে যাত্রায় তিনি নিজে বিমান চালাননি, তবু এটি তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু তিনি এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন নিজের দক্ষতায় ইতিহাস গড়তে।
অবশেষে ১৯৩২ সালের ২০ মে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে একাই উড়াল দেন অ্যামেলিয়া। তার গন্তব্য ছিল ইউরোপ। ভয়ংকর আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি, বরফ জমে যাওয়া ডানা–সব বাধা মোকাবিলা করে প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর তিনি অবতরণ করেন আয়ারল্যান্ডে। এর মাধ্যমে তিনি হন আটলান্টিক মহাসাগর এককভাবে পাড়ি দেওয়া বিশ্বের প্রথম নারী বৈমানিক।
এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; এটি ছিল নারীর সামর্থ্যের এক জোরালো ঘোষণা। সে সময় সমাজে নারীদের অনেকেই দুর্বল মনে করত। অ্যামেলিয়া দেখিয়ে দিলেন, সাহস আর সংকল্প থাকলে নারীও অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
তিনি ছিলেন নারী অধিকার আন্দোলনেরও সক্রিয় সমর্থক। নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পক্ষে তিনি সব সময় কথা বলেছেন। তার বিশ্বাস ছিল–নারীদের নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য সুযোগ দরকার, করুণা নয়।
১৯৩৭ সালে পৃথিবী প্রদক্ষিণের অভিযানে বের হয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন অ্যামেলিয়া। তার বিমান আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হারিয়ে গেলেও তার সাহসিকতার গল্প হারিয়ে যায়নি।
আজও অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট বিশ্বের কোটি নারীর অনুপ্রেরণা। তিনি শেখান, স্বপ্ন যদি বড় হয় এবং ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় থাকে, তবে কোনো বাধাই পথ আটকে রাখতে পারে না। আটলান্টিকের মেঘ চিরে ছুটে যাওয়া সেই নারী আজও আকাশের ওপারে দাঁড়িয়ে যেন বলে যান– ‘ভয় নয়, উড়তে শেখো’।
/এসএল