বর্ষা প্রকৃতিতে এনে দেয় স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু এই ঋতুর সঙ্গে বাড়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা, অপরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কিছু শারীরিক সমস্যা বেশি দেখা দেয়। সামান্য অসচেতনতা বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই বর্ষায় নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি
বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ভেজা কাপড়, দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকা কিংবা শরীরের ভাঁজে ঘাম জমে থাকার কারণে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বিশেষ করে কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচে বা পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, লালচে দাগ বা র্যাশ দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে ফেলা, শরীর শুকনো রাখা এবং পরিষ্কার সুতির পোশাক পরা জরুরি।
ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)
বর্ষাকালে অনেকেই কম পানি পান করেন। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক পরে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি থাকলে নারীদের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, তলপেটে ব্যথা বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
যোনিপথের সংক্রমণ
বর্ষার আর্দ্র পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক নারী যোনিপথে চুলকানি, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা অস্বস্তির মতো সমস্যায় ভোগেন। অনেকেই লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, যা পরবর্তী সময়ে সমস্যা জটিল করে তুলতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ
বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু এবং বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার এবং পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্দি-কাশি ও ভাইরাল সংক্রমণ
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বর্ষায় ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা কিংবা ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। কর্মজীবী নারী বা যারা প্রতিদিন বাইরে যাতায়াত করেন, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বৃষ্টি ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় পরা, গরম পানীয় পান করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ত্বকের নানা সমস্যা
বর্ষায় অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ব্রণ, অ্যালার্জি, র্যাশ, চুলকানি কিংবা একজিমার সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরও বেশি দেখা দেয়। মুখ পরিষ্কার রাখা, ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার এবং ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় না থাকা প্রয়োজন।
এছাড়া বর্ষাকালে কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করতে হয়। দীর্ঘ সময় ভেজা জুতা বা স্যান্ডেল পরে থাকলে পায়ের ত্বকে সংক্রমণ, দুর্গন্ধ কিংবা ফাঙ্গাস হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে পা ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া এবং শুকনো জুতা ব্যবহার করা উচিত।
বর্ষা যেমন প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি এই ঋতু কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও সঙ্গে নিয়ে আসে। তবে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ সমস্যাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিজের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রতিও গুরুত্ব দিন। কারণ একজন সুস্থ নারী মানেই একটি সুস্থ পরিবার এবং সুস্থ সমাজ।