২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একই দিনে বিদায় নিয়েছে ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তি- চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি এবং তিনবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস। একসময় বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করা এই দুই দল এবারও শেষ পর্যন্ত হতাশার গল্পই লিখল। এক দল ইতিহাসের ভারে নুয়ে পড়েছে, অন্য দল যেন টাইব্রেকারের অভিশাপ থেকে বেরোতেই পারছে না।
জার্মানির বিদায়টা এসেছে আরও একবার অপ্রত্যাশিতভাবে। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-১ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে জার্মানরা। সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই জার্মানির প্রথম টাইব্রেকার পরাজয়। একসময় মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত শৃঙ্খলা আর বড় ম্যাচে স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণের প্রতীক ছিল জার্মানি; সেই দল এখন টানা তিন আসরে ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি।
২০১৪ সালে জার্মানি ব্রাজিলের মাটিতে মারাকানায় আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতেছিল। তখন মনে হয়েছিল, জার্মান ফুটবলের সামনে দীর্ঘ সোনালি যুগ অপেক্ষা করছে। কিন্তু এরপর চিত্র বদলে যায় নাটকীয়ভাবে। ২০১৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়, ২০২২-এও একই পরিণতি। এবার প্রথম রাউন্ড পার হয়ে ভালো করার ইঙ্গিত দিয়েছিল দলটি। কিন্তু নকআউটের প্রথম ধাপেই যে এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। শেষ বত্রিশে থেমে গেছে তাদের যাত্রা। ফলে ২০১৪ সালের সাফল্য এখন যেন অনেক দূরের স্মৃতি।
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কাহিনি আরও বেশি বেদনাময়। বিশ্বফুটবলের অন্যতম প্রতিভাবান অথচ “অমুকুটধারী” শক্তি হিসেবে পরিচিত ডাচরা আবারও বড় মঞ্চে হৃদয়ভাঙার গল্প লিখল। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের।
নেদারল্যান্ডসের জন্য এই পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হারার গল্প নয়; এটি যেন দীর্ঘ এক ট্র্যাজেডির নতুন অধ্যায়। টাইব্রেকারে হার তাদের জন্য নতুন কিছু নয়-বরং বহু বছরের যন্ত্রণা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তারা নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফেরার পর আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায়। তারও আগে ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে একই প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারেই স্বপ্নভঙ্গ হয়। একই আসরে লুই ফন গালের দল দুর্দান্ত খেলেও ফাইনালের দরজা খুলতে পারেনি।
এরও আগে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ডাচদের বেদনা ছিল আরও গভীর। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় তারা। বিশ্বকাপ ট্রফি তখন হাতছোঁয়া দূরত্বে ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা ফসকে যায়।
এমনকি আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বকাপ নেদারল্যান্ডসকে বারবার আশা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরিয়েছে। ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০- তিনবার ফাইনাল খেলেও একবারও শিরোপা জেতা হয়নি। “টোটাল ফুটবল”-এর জনক দেশটি তাই এখনও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার প্রতীক।
দুই দলের বিদায় ফুটবল বিশ্বকে নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। জার্মানি এখন নিজেদের পুনর্গঠনের সন্ধিক্ষণে। প্রশ্ন উঠছে-তাদের ঐতিহ্যবাহী শক্তি কি হারিয়ে যাচ্ছে? অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের জন্য প্রশ্ন মানসিকতার-বড় ম্যাচে কেন বারবার শেষ বাধায় থেমে যায় তারা?
বিশ্বকাপের মঞ্চ নির্মম। এখানে অতীতের গৌরব কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের এবারের বিদায় সেই সত্যই আবার মনে করিয়ে দিল-ইতিহাস যতই সমৃদ্ধ হোক, বর্তমানের লড়াইয়ে ব্যর্থ হলে গৌরব কেবল স্মৃতিতেই বেঁচে থাকে।
এসএন/