ঢাকা ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
জিম্বাবুয়ের কাছে আড়াই দিনেই বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে হার স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি : মির্জা ফখরুল প্রার্থিতা বাতিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ, মহাসড়কে গাছ কেটে ব্যারিকেড ঘটনাস্থলে না থেকেও মামলায় আসামি দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী ঋণের নামে আধুনিক বিলাসিতা কী বলে ইসলাম ২০২৫ সালে বাটার নগদ ২৪৮ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে কঠোর শাস্তির বিধানসহ সংসদে আইন পাস আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা রূপগঞ্জ ইউএনওর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ, প্রতিকার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন সংগীতশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্মরণ সংগীত সন্ধ্যা মায়ের জানাজায় অংশ নিলেন প্যারোলে মুক্তি পাওয়া স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শৈশবের সেই প্রথম মিছিল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সংসদে পাস, ঘাটতি প্রায় আড়াই লাখ কোটি কঙ্গোর বিপক্ষে মাইনোকে একাদশে চান রুনি টেকসই প্যাকেজিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক খাদ্যশিল্প কাইলি জেনারের বিরুদ্ধে মামলা কাজের প্রলোভনে অপহরণ, টেকনাফের পাহাড়ি আস্তানা থেকে চার যুবক উদ্ধার গত ১৫ বছরের তুলনায় দেশে খুন, ডাকাতিসহ সার্বিক অপরাধ কমেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষায় বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ চেয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের বিক্ষোভ বিশ্বের প্রথম ১৬ মেগাওয়াট টিএলপি ভাসমান বায়ু বিদ্যুৎ প্ল্যাটফর্ম দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির ২৭তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি ঘিরে ছাত্রশক্তির কর্মসূচি ধর্ম পরিবর্তন বিষয়ে যা বললেন উর্ফি জাভেদ ইকুয়েডরের বিপক্ষে নিখুঁত ফুটবল খেলতে হবে: আগুইরে বগুড়ায় কুকুরকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি ডিবিএইচের সাধারণ সভায় ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন দুই পা নেই, তবুও স্বপ্নের পথে অদম্য জান্নাতুল বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট বিশ্বকাপের আসল হিরো

সংগীতশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্মরণ সংগীত সন্ধ্যা

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
সংগীতশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্মরণ সংগীত সন্ধ্যা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

গত ৭ জুন রবিবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল উপমহাদেশের বাংলা গানের অমর সংগীতশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উৎসসব পালন। ১৯২৩ সালের এই দিনে বাংলাভাষী এই মরমি শিল্পী উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিম বাংলার হুগলী জেলায়। শিশুকাল থেকেই অত্যন্ত সংগীতমনষ্ক সতীনাথ মাত্র নয় বছর বয়সে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিতে তার সংগীত রেকর্ড করাতে সক্ষম হন। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিতে এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও আকাশবাণীতে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তার প্রকাশ ঘটে ১৯৪৩ সালে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র সতীনাথ হুগলী মহসীন কলেজ থেকে ডিসটিংশনসহ বিএ পাস করেন (প্রথম বিভাগ)। তিনি উস্তাদ রাইচাঁদ বড়াল এবং উস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁর কাছে দীর্ঘদিন সংগীতের বুনিয়াদি শিক্ষা গ্রহণ করেন। মূলত আধুনিক বাংলা গানের শিল্পী হলেও তার কণ্ঠে অমর কিছু নজরুলগীতি, ছায়াছবির গান, ভজন ও গীত রেকর্ডকৃত হয়ে সেগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ধানমন্ডি ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী দেওয়ান সাইদুল হাসান (সরকারের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব) চমৎকারভাবে এই শিল্পীর জীবন ও কর্মের নানা উজ্জ্বল দিক শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় কণ্ঠশিল্পী হলেও তিনি পশ্চিম বাংলার স্বর্ণযুগের অনেক বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পীর গানে সুর সংযোজনা করেছেন। এর মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গীত ‘আর কত রহিব শুধু পথ চেয়ে’ এবং ‘তোমার আমার কারও মুখে কোনো কথা নেই’, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গীত ‘ভুলে গেছি কবে এই পথে যেতে’, ‘তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ বলে’, ‘তোমার পথের প্রান্তে’ এবং ‘আমার হৃদয় নিয়ে আর কত কাল’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি মো. রফির গাওয়া ‘পাখিটার বুকে যেন তীর মেরো না’ এবং চিত্রাশিং-এর ‘আকাশ মেঘে ঢাকা’, শ্যামল মিত্রের গীত ‘তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর’ এবং ‘এতো আলো আর এতো হাসি গান’ দুটিরও সুর রচনা করেন। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী এবং সতীনাথের স্ত্রী উৎপল সেনের বেশ কিছু গানের সুর সংযোজনার কাজও তিনি করেন। দীপক মিত্রের গীত ‘কত কথা হলো বলা’ এবং ‘এ তো নয় শুধু গানে’র সুরও তিনি রচনা করেন। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী লতা মুঙ্গেশকরের গীত প্রথম বাংলা গান ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরে তারার পানে চেয়ে’ এবং ‘কত নিশি গেছে নিদহারা ওগো’ গান দুটির সুর রচনা করে তিনি এই শিল্পীকে বাংলা গানের জগতে প্রবেশ করান। তার সঙ্গে যেসব গীতিকবি কাজ করেছেন তারা হলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দোপাধ্যায়, পবিত্র মিত্র, শ্যামল গুপ্ত, আনন্দ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। অন্যদিকে তার গানের অনেক সুর সতীনাথ নিজে রচনা করলেও বাংলার বিশিষ্ট সুরকাররা সেগুলোর অনেক সুর সংযোজনার কাজ করেন। এর মধ্যে সুধীন দাশগুপ্ত, কমল দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র প্রমুখ সুর স্রষ্টার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘কেদার রাজা’ ছায়াছবিতে ‘কে সজনী দিন রজনী’ গানটি গেয়ে সিনেমা জগতে শ্রোতাদের মনে গভীর সাড়া ফেলন। ‘উত্তর পুরুষ’ ও ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছায়াছবিতে গীত তার গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘জীবন নদীর জোয়ার-ভাটায় কত ঢেউ ওঠে পড়ে’ বাংলা ছবির গানের জগতে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে।

এই শিল্পী ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে সংগীত পরিবেশনের জন্য কণ্ঠশিল্পী প্রতীমা বন্দোপাধ্যায়সহ প্রথম ঢাকায় আসেন। ১৯৮৯ সালে আবার সরকারি আমন্ত্রণে তার স্ত্রী উৎপলা সেনসহ তিনি বাংলাদেশে আসেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী দীদার বখত এই শিল্পী দম্পতিকে তখন সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। সংগীতে জীবনের স্থায়ী আবেদনগুলোর প্রকাশ ঘটলে তা রসোত্তীর্ণ, মানোত্তীর্ণ ও শেষে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গান সেই শিল্পমর্যাদা লাভ করেছে। শুধু এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, প্রায় একই সময় কলকাতায়  শ্রীমতি হৈমন্তী শুক্লা ও শ্রীমতি শ্রীরাধা বন্দপাধ্যায়ের উপস্থিতি ও গান পরিবেশনার মাধ্যমে সতীনাথকে স্মরণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে যেসব শিল্পী সংগীত পরিবেশন করেন তারা মূলত মৃদঙ্গ সংগীত পরিবারের সদস্য। প্রথমে মঞ্চে আসেন– 

শ্রী পিকে সাহা উত্তম
১. ভেবেছ তোমাদেরই একার আছে জলসা ঘর
২. বন্ধু হয় অনেকে
৩. সেদিন বুঝিতে আমি পারিনি
 
এর পর বেগম নীতা খন্দকার
১. যদি তুমি না এ গান
২. এলো বরষা যে

এরপর শিশির শিকদার
১. এ জীবনে আমি যারে চেয়েছি
২. এ জীবনে যেন আজ কিছু ভালো লাগে না 
৩. যে দিন রবো না আমি

এরপর বেগম শ্রাবণী
১. আজ মনে হয় এই নিরালায়
২. আকাশ এতো মেঘলা
৩. বনের পাখি গায়

তার পর জাকির হোসেন তপন
১. মরমিয়া তুমি চলে গেলে
২. সবকিছু ফেলে যদি
৩. সোনার হাতে সোনার কাঁকন

তার পর গান করেন মাসুদ আহমেদ
১. যদি সহেলী আমায়
২. যেদিন জীবনে তুমি প্রথম দিলে গো দেখা
৩. পাষাণের বুকে লিখনা আমার নাম
৪. যতদূরে থাকো আমায় ভুলে

তারপর বেগম মনিরা মণি
১. কতনা হাজার ফুল
২. আমার এই গানে
৩. আকাশ প্রদীপ জ্বলে

 এরপর আহমেদ নেওয়াজ সেরা
১. এখনো আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে
২. ওই আকাশ প্রদ্বীপ তারা জ্বেলো না 
৩. জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে

পরে আসেন বেগম শামীমা রহমান মুন্নী
১. এমন অনেক কথাই বলো তুমি
২. তুমি মেঘলা দিনের
৩. আজো তো এল না সে

এই নয়জন শিল্পী পরিবেশিত সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গানগুলোর গীতিকবি ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, সুধীনদাস গুপ্ত, পুলক বন্দোপাধ্যায়, আনন্দ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এ গানগুলোর অধিকাংশ সুরারোপ করেছিলেন স্বয়ং সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। কয়েকটি গানের সুর সংযোজনা করেন কমল দাশ গুপ্ত, সুধীন দাশ গুপ্ত, অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট সুরস্রষ্টারা। সঞ্চালক আরও উল্লেখ করেন–মরমি শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায় মূলত বাংলা গানের বিরহের ধারাকে তার কণ্ঠ ও সুরের বেদনা দিয়ে এক ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও সুষমা দান করেন। সেই সঙ্গে গানগুলোতে প্রেম, নিস্বর্গ মনস্কতা, আনন্দ ইত্যাদি অনুভূতগুলোও স্থান পেয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সংগীতবোদ্ধা মনিরুল আলম তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শিল্পীর জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা শ্রোতাদের অবহিত করে বলেন, এই শিল্পীর গীত ও সুরারোপিত গানগুলো ইংরেজ কবি পার্সি শেলির উপলব্ধি ‘Our sweetest songs are those that tell of out saddest thoughts’-এর কথা বেশি স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন’ বা  ‘এখনো আকাশে চাঁদ’-এর মতো গান বিস্মরণের ঝাঁপিতে কখনো স্থান পাবে না। অনুষ্ঠানে কি-বোর্ড বাজান মাহবুব সোহেল, তবলায় সংগত করেন ভুলুধর এবং গিটারে ছিলেন স্বপন। এ অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী ও গানের সম্পাদনার দুরূহ দায়িত্ব পালন করেন বিশিষ্ট শিল্পী আহমেদ নেওয়াজ সেরা। ক্লাবের অন্যতম অধিকারিক ফারুক হোসেন ক্লাবের ওই মঞ্চটি এ অনুষ্ঠানে ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। দেশের বিশিষ্ট সংগীতবাণিজ্য সংস্থা ইউনিভার্সাল মিউজিকের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ ড্যানিক প্রদত্ত ব্যানারে অনুষ্ঠানটি সংকলিত ও পরিবেশিত হয়। কথাশিল্পী এবং কণ্ঠশিল্পী মাসুদ আহমেদ অনুষ্ঠানটিতে সহযোগিতা করেন।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]

তাত্ত্বিক গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১১:৪১ এএম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
তাত্ত্বিক গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক
খবরের কাগজ

ড. মাহবুবুল হক বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনে এক অনন্য নাম। তার পরিচিতি  বিভিন্ন পরিসরে পরিব্যাপ্ত। লেখালেখি, সম্পদনা, শিক্ষকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার কৃতিত্ব ও প্রয়াস তাকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা বানানের বিশেষজ্ঞ, মননশীল প্রাবন্ধিক ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে সুধীজনের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছেন।

কুমিল্লা সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন নেতৃস্থানীয় সংগঠক।

বহুমাত্রিক মাহবুবুল হক একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, নজরুল পদক, ফিলিপস পুরস্কার, মুক্তিযুদ্ধ পদক, মধুসূদন পদক, চট্টগ্রাম একাডেমি পুরস্কার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সাহিত্য পুরস্কার, রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।

ড. মাহবুবুল হক চট্টগ্রামে অবস্থান করেও জাতীয় মানের কাজই উপহার দিয়েছেন। পরিণত হয়েছেন জাতীয় ব্যক্তিত্বে। সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণায় তার অবদান উল্লেখ করার মতো। চট্টগ্রামের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণায় তার কৃতিত্ব অসামান্য ও অতুলনীয়। চট্টগ্রামবাসী এজন্য তার কাছে ঋণী।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক, গবেষক, চিন্তাশীল লেখক এবং সুবক্তা বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন তাত্ত্বিক গবেষকের নাম অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। ৩ নবেম্বর ১৯৪৮ সালে ফরিদপুরের মধুখালী গ্রামে মাহবুবুল হকের জন্ম। তার বাবার নাম আবদুল মালেক মোল্লা, মায়ের নাম মোসাম্মৎ হাজেরা খাতুন।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ স্কুলে আমারও পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বাংলায় বিএ এবং ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন।

ড. মনিরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে তিনজন আধুনিক কবি ‘সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৯৭ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ড. মাহবুবুল হকের বিষয়ে তার পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সাহিত্য কে না ভালোবাসে? কিন্তু সাহিত্যের পেছনে চাই যত্ন। সবাই যত্নশীল নন। যত্নবান হতে হলে লাগে ধৈর্য্য, শ্রমপ্রিয়তা এবং বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা। ড. মাহবুবুল হকের দৃষ্টি সাহিত্যের এই হয়ে ওঠার নিয়মনীতি এবং প্রয়োজনীয় কর্মোপাদানের প্রতি। মাহবুবু সাহিত্যিক নন, সাহিত্যকর্মী। প্রমথনাথ বিশীর ভাষা বলতে গেলে, তার কর্মের মরু-জিহ্বা। তার অবসরকে এমন করে শুষে নিয়েছে যে সেখানে সাহিত্যের মরূদ্যান দেখা দিতে পারে কি!

সমাজে কর্মিষ্ঠ মানুষের সংখ্যা খুব যে বেশি থাকে বা দেখা যায়, তা নয়। তবু জীবন শতভাগ পূর্ণ হয়েছে এমন দাবি তাদের মধ্যে সফলতম মানুষটিরও নেই। এ যেন হর-গৌরী অবস্থা, অর্ধেক বা একাংশ গৌরী-সৌভাগ্য ধন্য ও ধনময়, বাকি অঙ্গ রুক্ষ।’ ...‘এমফিলে আমি তার পরীক্ষক ছিলাম। আনিস স্যার তাকে সরাসরি পিএইচডিতে না নিয়ে আমার সঙ্গে পিএইসডি করার নির্দেশ দেন। মাহবুবের গবেষণার বিষয় ছিল: ‘তিনজন আধুনিক কবি: সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টচার্য। মাহবুব কাজটি শেষ করতে বহু সময় ব্যয় করে। দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমিতে প্রকাশের অপেক্ষায় পড়ে থাকে। ২০০৫-এ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। মাহবুবের থিসিসের আভ্যন্তরিক পরীক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং বহিঃপরীক্ষক শিলিগুড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-সমালোচক অশ্রুকুমার শিকদার মাহবুবের গবেষণার যে মূল্যায়ন করেছিলেন মাহবুবের জন্য তা শ্লাঘার বিষয়। উভয়েই স্বীকার করেছেন দুই বাংলাতেই এই তিনজন আধুনিক কবি সস্পর্কে এত গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা বিরল। বস্তুত, মাহবুব এই কবিত্রয়কে নতুনভাবে এবং তথ্য ও বিশেষণসহকারে নবমূল্যায়নের সূত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন বলা যায়। (৭৫ বছর পূর্তিতে মাহবুবুল হক সংবর্ধনাগ্রন্থ)

স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখি শুরু। অষ্টম শ্রেণিতে ‘নবদিগন্ত’ নবম ও দশম শ্রেণিতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলবার্ষিকী সম্পাদনার মাধ্যমে সম্পাদনায় হাতেখড়ি। ১৯৬৪-এর দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্র ‌ ‘কলরোল’ সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকাতেই একুশের প্রথম আলেখ্য-উপন্যাসিকাতা–সেন রচিত ‘লাল রং পলাশ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭-তে ‘মিছিল’, ‘অন্বেষা’, ‘পদাতিক’, ‘রবিকরে কবিকণ্ঠ’; ১৯৭৯-তে ‘সাহসী ঠিকানা’, ১৯৮১-তে চিটাগাং গাইড’, ১৯৯৫-এ দৈনিক আজাদীর উদ্যোগে ঐতিহাসিক সম্পাদনাগ্রন্থ ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’ প্রকাশ করে এবং ১৯৯৭ ও ২০০১-এ ‘আজিকে এ আকাশতলে’ সম্পাদনা করেন। আবুল ফজল, আবদুল হক চৌধুরী, ওহীদুল আলম প্রমুখের প্রয়াণ স্মরণপত্রসহ বহু স্মরণিকা ও সংকলন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি, তার সম্পাদনার মধ্যে অন্যতম নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস সংবর্ধনা স্মারক (২০০৭) এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং লোকমান খান শেরওয়ানি স্মারকগ্রন্থ অন্যতম।

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন চর্চায় সক্রিয় হন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যায়নকালে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক নানা কর্মতৎপরতার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগান। তার পরিচালনায় ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির বটমূলে ছায়ানাট্য ‘লাল রং পলাশ’-এর মঞ্চায়ন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবুল মোমেন বলেন, ‘কৃতিত্বপূর্ণ ফল করে আমার এক বছর আগে কলেজে ঢুকেছেন তিনি। বন্ধুদের নিয়ে প্রকাশ করলেন পত্রিকা ‘কলরোল’। কীভাবে যেন আমি সেটার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। সেই সুবাদে মাহবুবু ভাইয়ের লালখান বাজার বাঘঘোনার বাসায় আমার যাতায়াত শুরু। সে বোধ হয় ১৯৬৫ সালে কথা। তখন আমরাও কলেজে ঢুকেছি। সেটা ছাত্র ইউনিয়নের রমরমা কাল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তখন ছাত্রসংগঠন স্বনামে কাজ করতে পারত না। ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম কলেজে-সংগঠনের নাম ‘ইউএসপিপি-ইউনাইটেড স্টুডেন্টস প্রগ্রেসিভ পার্টি’। ছাত্রলীগের সংগঠনের নাম ছিল ‘যাত্রিক’। ওদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেগ তখন থেকেই কাজ করছিল, কী ছাত্র ইউনিয়ন কী আন্তর্জাতিকতাবাদ।

তখন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লেখালেখি, প্রকাশনা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বক্তৃতার মান নিয়ে। এ সময়ে মাহবুব ভাই শুরু করলেন ছায়ানাট্য প্রদর্শন–লাল রং পলাশ। আমি আর বেনুআপা (সদ্যপ্রয়াত মনোয়ারা কবি বেনু) অথবা আমি আর খুরশিদ ভাইয়ের বোন বেবি (মার্কিন প্রবাসী, তার নামও সম্ভবত মনোয়ারা)। এটা নিয়ে আমরা অনেক জায়গায় গেছি। একবার পুরো ধারাভাষ্য রেকর্ড করা হয়েছিল ওয়ার সিমেট্রিতে গিয়ে নির্জনতার মধ্যে।’
 
১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বিশাল মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘লাল রং পলাশ’-এর মঞ্চায়ন ছিল সে সময়ে ওই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগানো ঘটনা। চট্টগ্রাম কলেজে সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতার পাশাপাশি মাহবুবুল হক ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। তিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি আগরতলায় একক ও যৌথভাবে একাধিক ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহবুবুল হক দেশ গড়ার গঠনমূলক কাজে সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েও তিনি তাতে সাড়া দেননি। বাংলা একাডেমির গবেষক হিসেবে মনোনয়ন পেয়েও যোগ দেননি তাতে। ১৯৭৬-এ বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে তিনি চাকরি নিতে বাধ্য হন এবং পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরু ১৯৭৮ সালে, রাঙ্গুনিয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। ১৯৮১ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগে। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি নোয়াখালী প্রযুক্তি বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

জীবনের আলোকিত ও লোভনীয় অনেক হাতছানি থাকা সত্ত্বেও মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাকতাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অধ্যাপক মাহবুবুল হকের প্রথম গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ম্যাক্সিম গোর্কির মা’ ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিভাধর ও জনপ্রিয় সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটি বিশ্বসাহিত্যে এক অসাধারণ সংযোজন। অধ্যাপক মাহবুবুল হক বহুল আলোচিত এবং জনপ্রিয় উপন্যাসটিকে বাংলাভাষীয় পাঠকদের কাছে অধিকতর হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরেছেন। মাহবুবুল হকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে উপন্যাসটি পাঠকের মনে বিশেষভাবে রেখাপাত করে চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ছাত্রজীবনে এ বইটি আমার একটি প্রিয় বই হিসেবে সংরক্ষণ করেছি। 

বাংলা সাহিত্যের মৌলিক গবেষক বলে খ্যাত এবং সুবক্তা ড. মাহবুবুল হক শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও একজন সুবক্তা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণায় তার সুচিন্তিত বক্তব্য একাগ্রচিত্তে শোনার সুযোগ আমার হয়েছে। তার বক্তব্য থেকে আমি অনেক কিছু ধারণ করে নিজেকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। 

অধ্যাপক মাহবুবুল হকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ গ্রন্থতি দেশে-বিদেশে বিদগ্ধ পণ্ডিতদের প্রশংসা অর্জন করেছে। এ গ্রন্থে বাংলা গবেষণার ক্ষেত্রে তার মৌলিক চিন্তাচেতনার পরিচয় মেলে। বাংলা ভাষায় অধ্যাপক মাহবুবুল হকের মতো এত বেশি প্রবন্ধ এবং গবেষণামূলক গ্রন্থ আর কেউ লিখেছেন কি না আমার জানা নেই। আমার মতে এ ক্ষেত্রে তিনি একক ও অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক ড. মাহবুবুল হকের ১৩টি বই স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে মনোনীত এবং পাঁচটি স্কুলপাঠ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। যা দেশে শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে তার অন্যতম অসাধারণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। এ পর্যন্ত তার ১৪টি মৌলিক পবেষণাবিষয়ক প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা বাংলা সাহিত্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান গ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়েছে। তার প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ এবং প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে তুলে ধরছি– ১. ম্যাক্সিম গোর্কির মা (১৯৭৯), ২. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ পরিচিতি (১৯৮১), ৩. আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৮২), ৪. বাংলা বানানের নিয়ম (১৯৯১),  ৫. আশুতোষ চৌধুরী (১৯৯৪), ৬. পাঠ্যবইয়ে বাংলা বানানের নিয়ম (১৯৮২ সাল), ৭. বিশ্ব তারিখ অভিধান (২০০০ সাল), ৮. বাংলা ভাষা: কয়েকটি প্রসঙ্গ (২০০৪), ৯. তিনজন আধুনিক কবি: সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টচার্য (২০০৫), ১০. সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি (২০০৮), ১১. বাংলা ভাষা: কয়েকটি প্রসঙ্গ (২০০৯), ১২. বাংলা সাহিত্য: নানা নিবন্ধ (২০০৯), ১২. বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ: নানা নিবন্ধ (২০১০), ১৩. নজরুল তারিখ অভিধান (২০১০), ১৪. ‘বাংলার লোকসাহিত্য: সমাজ ও সংস্কৃতি (২০১০), ১৫. বাংলা সাহিত্যের দিগ্বিদিক (২০১১), ১৬. রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (২০১১), ১৭. প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১২), ১৮. অন্বেষার আলোয় চট্টগ্রাম (২০১২), ১৯. রবীন্দ্রসাহিত্য রবীন্দ্রভাবনা (২০১৪), ২০. বাংলা কবিতা: রঙে ও রেখায় (২০১৫), ২১. বইয়ের জগৎ: দৃষ্টিপাত ও আলোকপাত (২০১৬), ২২. মুক্তিযুদ্ধ ফোকলোর ও অন্যান্য (২০১৫), ২৩. লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য (২০১৬), ২৪. খটকা বানান অভিধান (২০১৬), ২৫. লোকসংস্কৃতি চর্চা (২০২২), ২৬. নজরুলকে নিয়ে (২০২২), ২৭. বাংলা কথাসাহিত্য: রঙে ও রেখায় (২০২২), ২৮. চট্টগ্রামে শেখ মুজিব (২০২২), ২৯. শেখ মুজিব তারিখ অভিধান (২০২৩), ৩০. চট্টগ্রামী সহজ পাঠ (২০২৩)। চট্টগ্রামে শেখ মুজিব এবং শেখ মুজিব তারিখ অভিধান গ্রন্থ দুটো গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ।

সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ: ১. নির্বাচিত প্রবন্ধ: আবুল ফজল (২০০২), ২. শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত (২০০৪), ৩. সমকালের কবিয়াল (শিশির দত্ত সহযোগে (২০০৭), ৫. শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত (২০০৪), ৬. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক (২০০৮), ৭. চাটগাঁভাষার রূপ পরিচয় (২০১২), ৮. অক্টোবর বিপ্লবের  বিজয়গাথা (১৯৮২), ৯. মৌমাছি ও মানুষ (মস্কো ১৯৮৮), ১০. টাইম মেশিন (১৯৮৯) অনুবাদ করেছেন। তিনি কয়েকটি শিশুকিশোর গ্রন্থ লিখেছেন। সেগুলো হলো– ১. গল্পে গল্পে ভাষা আন্দোলনা (২০১৮), ২. মরণজয়ী অভিযানের কাহিনি (২০১৭), ৩. ভাষার লড়াই থেকে মুক্তিযুদ্ধ (২০১৬), ৪. গল্পে গল্পে নজরুল (২০০৯), ৫. বীরশ্রেষ্ঠদের কথা (২০০২), ৬. ছড়ায় ছড়ায় বাংলা বানান (২০০১), ৭. কুমির, বিড়াল ও খরগোশের গপপো (২০০১), ৮. বাতাসের কথা (২০০১), ৯. সবই হলো কিসমত (২০০১), ১০. জল পড়ে পাতা নড়ে (সম্পাদিত রবীন্দ্র কিশোর রচনা সংকলন (২০০১)।

বাংলা সাহিত্যে তিনি মৌলিক গবেষণা বা কঠিন কঠিন সাহিত্য রচনা করেই ক্ষান্ত হননি। ছোটদের জন্য তার দায়িত্ববোধ এবং তাদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা, বোদ্ধামহলের দৃষ্টি কাড়ে। শিশুদের জন্য ৭টি শিশু-কিশোর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা শিশুদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং তাদের মানসিক মননশীলতা গঠনে তার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। প্রবন্ধ ও সমালোচনা বিষয়ে বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৩১টির অধিক প্রবন্ধ রচনা করেন, যা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি লোকমান খান শেরওয়ানিকে নিয়ে শামসুল হোসাইনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি দুর্লভ বইও সম্পাদনা করেছেন, যা বাংলার ইতিহাসে জন্য একটি আকরগ্রন্থ। অধ্যাপনা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

ড. মাহবুবুল হক বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতীয়ভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ বেতার, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ গবেষক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপাস্থাপনার মধ্যদিয়ে তিনি বিদেশেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। কলকাতা থেকে শুরু করে বিশ্বভারতী, দিল্লি সবখানে তার সরব পদাচারণা বোদ্ধামহলে চরমভাবে প্রশংসিত।

মাহবুব হক বহু গুণে গুণান্বিত একজন বহুমাত্রিক মানুষ। তার হস্তলিপি, তার হাতের আঁকা বর্ণগুলো মুদ্রিত টাইপে ছাপার বইকেও হার মানায়।

ড. মাহবুবুল হক একাধারে অধ্যাপক, ভাষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সমালোচক এবং শিক্ষাবিদ। আমার কাছে সবসময় আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তার পরিপাট্য গুণ। এ কারণেই তার বক্তব্য, লেখায় ও চিন্তায় বিষয়মুখিতা যেমন প্রাধান্য পেয়েছে তেমনি স্পষ্টতা রয়েছে তার পরিবেশনায়। যে কোনো বিষয়কে তার সামগ্রিক চারিত্র্যবিচারের মাধ্যমে যথাযথ ও সংহত রূপে তুলে ধরা মাহবুবুল হকের প্রধান গুণ। মাহবুব নির্দিষ্টভাবে বলতে বা লিখতে ভালোবাসেন, অধিকাংশ মানুষের মতো এলোমেলোভাবে নয়। তার লেখনীজীবন ও কর্মজীবনের সাফল্যও আমার মনে হয় এই গুণটির কারণেই অধিক। 

আমাদের প্রিয় এই মানুষটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো ব্যয় করেছেন এ দেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামে। এ দেশের ছাত্রদের জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক বৈজ্ঞানিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েমের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলন-সংগ্রামে। আজও যা অর্জিত হয়নি। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিককর্মী হিসেবে মাহবুব ভাই তার জীবনের তারুণ্য মেহনতি মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। ব্যক্তিগত লাভের জন্য, প্রতিষ্ঠার জন্য কিছুই করেননি। এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের পচনশীল সমাজে খুবই বিরল। তাকে আমরা ২০২৪-এর ২৪ জুলাই হারিয়েছি। তার মৃত্যুতে বাংলাসাহিত্যের গবেষণার যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা অপূরণীয়। 

ডা. মাহবুবুল হকদের মতো একজন ধীশক্তিসম্পন্ন মানুষ যুগে যুগে জন্মান না। বহু পুণ্যের ফলে জাতির ভাগ্যাকাশে অবির্ভূত হন এসব ধুমকেতুসম্পন্ন গবেষক। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন নিরলস যোদ্ধা ছিলেন। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা এবং গবেষণায় অনবদ্য ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। বাংলা ভাষার গবেষণা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছে। এ দেশের শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা এবং প্রগতিশীল সংস্কৃতির সংগ্রামের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]

দিনাজপুরে কবি আযাদ কালাম রচিত ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১০ পিএম
‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় কবি আযাদ কালামের কবিতাগ্রন্থ ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’-এর পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

গত ২২ মে স্থানীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান কবির।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য আলোচক ছিলেন কবি অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদ মুস্তাফিজ, কবি ও গবেষক চাষা হাবিব, কবি নিরঞ্জন হীরা এবং কবি কমল কুজুর। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কবি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, কবি ফরিদুল আজাদ মিলন, রেজাউর রহমান রেজু, গল্পকার মাহবুব আলী, কবি আজাহারুল আজাদ জুয়েল, প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বক্সী বাচ্চু এবং উত্তরতরঙ্গের নির্বাহী সম্পাদক রাজ্জাক কাঞ্চন প্রমুখ।

কবি আযাদ কালামের কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মোকাররম হোসেন, মীর শিরিন, সুবর্ণা মুখার্জী এবং ছড়াকার বিধান দত্ত।

প্রধান আলোচক এমরান কবির বলেন, ‘সাম্প্রতিক কবিতার বড় একটি ব্যর্থতা হলো এর কেন্দ্রহীনতা, পারম্পর্যহীন শব্দসমাবেশ এবং পঙ্ক্তির বিধ্বস্ত বিন্যাস। বিমূর্তায়ন ও বিচ্ছুরণের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা প্রায়ই কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কবিতা পড়া যাচ্ছে না। শব্দ থেকে শব্দের যোগাযোগহীনতা, পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তির পারম্পর্যহীনতা পাঠককেও যোগাযোগহীন করে তুলছে। এই যোগাযোগহীনতা বা সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতার কারণে কবিতা এখন সবচেয়ে কম পঠিত সাহিত্যধারাগুলোর একটি। আযাদ কালামের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব নেতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি নেই। ফলে তার কবিতাগুলো পাঠযোগ্য। আর যদি কোনো কবিতা পড়া যায়, তাহলে বলা যেতে পারে সেই কবিতায় ‘কিছু একটা’ আছে। এই ‘কিছু একটা’ হলো কবিতার অধরা আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশা। আযাদ কালামের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে মফস্বলে অবস্থান করেও বৈশ্বিক কবিতার সমান্তরালে যে কবিতাচর্চা করা সম্ভব, আযাদ কালাম তা প্রমাণ করেছেন।’

কবি আযাদ কালাম তার কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি ও শিল্পী কমল কুজুর।

সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে বক্তব্য রাখেন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব যখন অমীমাংসিত যুদ্ধ, সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ—
যখন বিশ্বমানবতা অশান্তি ও উদ্বেগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—
ঠিক সেই সময়ই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠাকে দূরে সরিয়ে দেশের এক কোণে, সীমিত পরিসরে, এক অপার আনন্দময় আবহে ধানমন্ডির ছায়ানটে অনুষ্ঠিত হলো সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ২০২৬।

 ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আয়োজন কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি এক চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণস্পন্দন। “সমধারা”-নামটির মধ্যেই যেন প্রবাহমান সৃজনশীলতার ইঙ্গিত, আর সেই স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা ও নবীন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতিতে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য নান্দনিক মেলবন্ধন। সত্যিই, অনুভূতিটা ছিল অপার্থিব।

সমধারা এমন এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নবীন ও প্রবীণ-সব প্রজন্মের সাহিত্যসাধকরা মিলিত হন এক অভিন্ন সৃজনস্পন্দনে। উপস্থিত ছিলেন শিল্প সাহিত্যের দিকপাল বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কবি-প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল, কবি মজিদ মাহমুদ এবং লেখক-গবেষক ড. এমদাদ হাসনাইনসহ আরও অনেক গুণীজন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-সাহিত্য কেবল আত্মপরিচয়ের বাহন নয়, এটি চর্চার মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। অন্যদিকে, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মাঝেও কবিতা চর্চার এমন আয়োজনকে এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল সাহিত্যচর্চাকে তুলনা করেন প্রার্থনার সঙ্গে—যেখানে প্রতিদিনের সাধনাই লেখককে পরিপূর্ণ করে।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরাও তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্টি ও প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এ উৎসব যেন নববর্ষের রেশ বহন করছিল। পহেলা বৈশাখের আবহ তখনও বাতাসে ভাসমান-চারদিকে বৈশাখি মেলার আমেজ, প্রকৃতিতে মধুমাসের আগমনী বার্তা, গাছে গাছে ফলের সমারোহ। সেই আবহকে ধারণ করেই লাল রঙে সজ্জিত কবিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

ফরিদ আহমেদ দুলালের সভাপতিত্বে এবং কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীবের উদ্বোধনে, সালেক নাছির উদ্দিনের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে আগত কবিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়ানটের প্রাঙ্গণ।

এবারের সমধারা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। শিশু সাহিত্যিক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কবিতা সাহিত্যে আদ্যোনাথ ঘোষও সম্মানিত হয়েছেন। তাদের প্রতি রইল অকুণ্ঠ অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সমধারার কর্ণধার সালেক নাছির উদ্দিন তার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সমধারার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আরেকটি কারণে-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপস্থিতি। তিনি নিয়মিতভাবে সব অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও, সমধারায় এসে তিনি যেন লেখক-কবি সত্তাকে নতুন করে জাগ্রত করে তুললেন। তার উপস্থিতি সকলের মধ্যে দ্বিগুণ উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস “দেবো খোঁপায় তাড়ার ফুল” অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য “প্রেমার্ঘ নৈবেদ্য”-যা ছিল এক অনবদ্য শিল্পসম্ভার।

সব মিলিয়ে, সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ছিল এক সফল, অর্থবহ এবং শিক্ষণীয় আয়োজন। একটি অনুষ্ঠান শুধু উপভোগের বিষয় নয়-এর ভেতরে থাকে শেখার অসংখ্য উপাদান। গুণীজনদের কথা শোনা যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তাদের সান্নিধ্য পাওয়া এক বিরল প্রাপ্তি।

সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রাপ্তির অংশীদার হতে পেরেছি-প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, আশীর্বাদ চেয়েছি আগামী পথচলার জন্য।

পরিশেষে, এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ ধন্যবাদ সালেক নাছির উদ্দিনকে। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে-সমধারার এই সৃজনযাত্রা আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।

এসএন/

বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখকসহ অতিথিরা ছবি: খবরের কাগজ

একটি বইয়ের পরিচিতি ও পাঠককে আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদই প্রধান ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, প্রচ্ছদ ছাড়া বই হয় না। প্রচ্ছদ ডাক দেয়, প্রচ্ছদ চিনিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ বলে এসো- তারপরে না বই।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী ও অভিনেতা আফজাল হোসেন।

বই প্রকাশের আগেই ঘটা করে প্রচ্ছদ উন্মোচনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে লুইস ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর রূপকের সঙ্গে তুলনা করেন অধ্যাপক সায়ীদ। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এ কেমন বই, যার বই নেই; কিন্তু প্রচ্ছদ আছে! এটি অনেকটা সেই অদৃশ্য বিড়ালের হাসির মতো।’ লেখক ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ লেখক হওয়ার পরে লেখে, আর কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়। সাগরের ভেতরে আগে থেকেই লেখার রসদ তৈরি ছিল, যা এখন বই হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর জানান, ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটিতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদ নিয়ে লেখক বলেন, শিল্পী আফজাল হোসেন আমার প্রায় ৩০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। তার একটি স্বভাব হলো কাজ দেরিতে করা। কিন্তু এবার তিনি বই লেখা শেষ হওয়ার আগেই একাধিক প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই আনন্দ থেকেই এই প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘বই প্রকাশের আগে প্রচ্ছদ উন্মোচন আমাদের দেশে নতুন ঘটনা। একটি সময়কে ধরে রাখার জন্য সাগর ভাই যেসব গুণী মানুষকে নিয়ে লিখেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, শাইখ সিরাজ, জিল্লুর রহমান, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

ফারজানা ব্রাউনিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

সম্প্রতি শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন সৃজনের মিরপুর কার্যালয়ে একক বক্তৃতা, একক কবিতাপাঠ এবং পাঠপর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি লুব্ধক মাহবুবের ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও গল্পকার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ।

আনোয়ারুল হক বলেন, কবি লুব্ধক মাহবুব প্রেমের কবি। প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন তার কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থে এই কবি পরিণত এবং শব্দ চয়নে দক্ষতা তার কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তার কবিতার বিষয়ে গভীরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিও বিশেষভাবে তার কবিতায় উঠে এসেছে। এই কবি যে দেশে না থেকেও দেশের সঙ্গে তার কবিতার মাধ্যমে গভীর সংযোগ রেখেছেন– এই বই তার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবি লুব্ধক মাহবুব একজন জাত কবি। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে এ গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি পরিণত কবি। সুনির্বাচিত শব্দ চয়ন, অনুপ্রাসের কাব্যময় প্রয়োগ, বক্রোক্তি ও ব্যজস্তুতির বর্ণময় ব্যবহার, প্রাসঙ্গিক যথাযথ উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প এবং গদ্য ছন্দের অনবদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে নিজের জন্য একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতে দারুণভাবে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। আর বাংলায় লেখা এ গ্রন্থের ৮০টি কবিতায়ই বিষয় বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময় ধারক হিসেবে কবিকে অনন্য বিশিষ্টতায় বিভূষিত করেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থান করেও নিজের মা-মাটি-মানুষকে তিনি যে ভুলে যাননি বরং গভীর ও প্রগাঢ় মমতায় তাদের বেঁধে রেখেছেন, এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা তার বড় প্রমাণ। বলা চলে স্রষ্টা প্রদত্ত কবি প্রতিভা আর গভীর অনুশীলন, অধ্যয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে তিনি একজন উত্তর আধুনিক কবি হিসেবে এ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে শিল্পশ্রীমণ্ডিতভাবে মেলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

অনুষ্ঠানের ‘স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি’ বিষয়ের মূল বক্তব্যে লেখক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা বলেন, সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা যখন তৈরি হয় তখন পূর্ববাংলার মুসলমান কমিউনিটি সাগ্রহে তাতে শামিল হয়েছে। এর কারণ যতটা বা ধর্ম তারচেয়ে বেশি অর্থনীতিকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ষাটের দশকে গিয়ে কবিদের এ বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরিফ মঈনুদ্দীনের একক কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার, কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা এবং কবি ওয়াহিদ জামান। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে নুসরাত সুলতানা বলেন, কবিতা ব্যাখ্যার অতীত এক শিল্পকর্ম। শিশুর প্রথম কান্না যখন মা শুনতে পান সেই আনন্দ যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না তেমনি কবিতাও ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল উপলব্ধি করা যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন কাব্যজগতে বহু পথ পেরিয়ে এসেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি কাব্যগ্রন্থ। এই কবির কবিতার শব্দ চয়ন যেমন নান্দনিকতার দাবি রাখে তেমনি তার গভীর উপলব্ধি ও পাঠকের মননকে নাড়া দেয়। কবির কবিতায় দর্শন ভাবনা, মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের ভাঁজকে পরতে পরতে খুলে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে।

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার বলেন, এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মিস্টিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাগুলো হৃদয় নয় বরং মেধাশাসিত।

আলোচক কবি ওয়াহিদ জামান বলেন, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সহজ-সরল, কিন্তু গভীর। জীবনের প্রতিটি অনুভবকে ধারণ করার প্রতিশ্রুতি আছে তার কবিতায়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কবি লুব্ধক মাহবুব, কবি আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি রমজান সরকার, কবি সাদমান সজীব, কবি শামস আরেফিন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকেল হায়দার, অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার, কবি জুননু রাইন, পরিবেশবিদ কবি শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান, প্রফেসর ড. ডি. এম, ফিরোজ শাহ, নাট্য নির্মাতা মিতুল খান, গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কবি আহমেদ বাবু, কবি হাসিবুর রহমান জয়, মো. আরিফুল ইসলাম, কবি মুনযির সাদ, কবি ও ছড়াকার হুসাইন আলমগীর, কবি অঞ্জলী রাণী পূজা, কবি ও সাংবাদিক মাসুদ হাসান, কবি ও সম্পাদক বহ্নি কুসুম, কবি ও কথাসাহিত্যিক সাহিনা মিতা, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ড. সর্দার এ হায়দার, কবি রহিজ আলী সরদার, কবি বোরহান মাসুদ, কবি তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন, কবি আহমেদ বাবুল, কবি ফরহাদুর রহমান, সোহাগ হাওলাদার, রাসেল প্রমুখ...।