১৯৫৮ সাল। তখন আমি প্রাইমারি স্কুলের প্রথম শ্রেণির এক ছোট্ট বালক। বয়স সবে সাত ছুঁই ছুঁই। চারদিকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন থমথমে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তার দলের রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। পরাধীনতার শৃঙ্খলে তখন পিষ্ট হচ্ছিল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
এমনই এক চরম দুঃসময়ে পিরোজপুরের রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্রদের ঢল। আইয়ুব সরকারের এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে স্থানীয় ছাত্রনেতারা এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সেদিনের সেই প্রতিবাদী মিছিলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমাকে রাখা হয়েছিল একেবারে সম্মুখে, প্রথম কাতারে। কেন আমাকে একেবারে সামনে দেওয়া হয়েছিল? কারণ, তখন নাকি আমি দেখতে অসাধারণ সুদর্শন ছিলাম। কচি মুখের সেই নিষ্পাপ সৌন্দর্য আর চোখের দীপ্তি দেখে তৎকালীন ছাত্রনেতাদের মনে হয়েছিল–এই ছোট্ট শিশুই যেন নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় প্রতীক!
আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেদিন পিরোজপুরের রাজপথে শুধু একজন প্রথম শ্রেণির ছাত্র হাঁটেনি, হেঁটেছিল গণতন্ত্রের প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। ছোটবেলার সেই দিনটিই আমার ভেতরে বুনে দিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রথম বীজ। সেই ছোট্ট বয়সে না বুঝেই স্বৈরাচারবিরোধী যে মিছিলে হেঁটেছিলাম, জীবনের প্রতিটি বাঁকে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হয়ে আছে। শৈশবের সেই মিছিল, সেই স্লোগান আর পিরোজপুরের ধুলোমাখা রাজপথ আজও আমার হৃদয়ে এক জ্বলন্ত ইতিহাস হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
লিয়াকত হোসেন খোকন
রূপনগর, ঢাকা
[email protected]