নড়াইল-২ (লোহাগড়া ও সদর উপজেলার একাংশ) আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য (এমপি) আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান মঞ্জুরের তালিকাযুক্ত সংসদ সচিবালয়ের একটি পত্র ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। গত ২৭ জুন ভাইরাল হওয়া ওই তালিকার ২১ জনের মধ্যে ৮ জনই এমপির নিজ ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন। ওই ৮ জনের মধ্যে আবার এমপির এক মেয়ের নাম দুটি ক্রমিক নম্বরে দুই বার লেখা রয়েছে। এ নিয়ে নড়াইল জেলার পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও সমালোচনা হয়েছে।
আতাউর রহমান বাচ্চু জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে তালিকা ভাইরাল হওয়ার পর এমপি আতাউর রহমান বাচ্চু তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে বরখাস্ত করেন। গত ২৮ জুন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে সংসদ সদস্য নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পোস্ট করেছেন। সেই চিঠিতে এমপির সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে।
সেই চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আমার ব্যক্তিগত সহকারী আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে বরখাস্ত করা হলো। আদেশটি ২৮/০৬/২০২৬ ইং তারিখ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।’
তবে কোন দায়িত্ব পালনে অবহেলা, তা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।
তালিকায় ২১ জনের ৮ জনই এমপি পরিবারের
ভাইরাল হওয়া সংসদ সচিবালয়ের অর্থ শাখা-২ থেকে ইস্যু করা ওই পত্রে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নড়াইল-২ আসনের এমপির ঐচ্ছিক তহবিল থেকে মোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা মোট ২১ জনের নামে অনুদান মঞ্জুরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নড়াইল সদরের ১০ জন এবং লোহাগড়া উপজেলার ১১ জন রয়েছেন। সদরের ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই এমপির নিজ ইউনিয়ন হবখালীর বাসিন্দা। আর লোহাগড়া উপজেলার ১১ জনের মধ্যে ৭ জনই এমপির শ্বশুরবাড়ির ইউনিয়ন লাহুড়িয়ার বাসিন্দা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনুদানপ্রাপ্তির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া ২১ জনের মধ্যে ৮ জনই এমপির নিজ ও শ্বশুরের পরিবারের সদস্য।
তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ ও ৮ নম্বরে এমপির মেয়ে ফাইজার নাম রয়েছে। তালিকায় ১ নম্বরে হবখালী ইউনিয়নের ফাইজা, পিতা মো. বাচ্চুর নামে ১০ হাজার টাকা এবং ৮ নম্বরে ফাইজা, পিতা মো. আতাউরের নামে ১০ হাজার টাকা অনুদানের উল্লেখ রয়েছে। পিতার নাম দুই ভাগে বিভক্ত করে একই মেয়ের নামে দুই বার আবেদন করে তালিকাভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ২ নম্বরে থাকা মো. আশিকুজ্জামান এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর চাচাতো ভাই এবং নড়াইল জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। ৬ নম্বরে থাকা মো. ফরহাদ হোসেন এমপির ব্যক্তিগত ক্যামেরাম্যান, তালিকার ১১ নম্বরে থাকা লাবিবা এমপির শ্যালক মৃত আলী আহম্মেদের মেয়ে ও ১৪ নম্বরে থাকা মেজবা এমপি বাচ্চুর ছেলে (যদিও তালিকায় তার পিতার নাম সুলতান আহম্মেদ লেখা হয়েছে), ১৭ নম্বরে থাকা নুসাইবা এমপি বাচ্চুর আরেক মেয়ে এবং সদর উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্বাস আলীর স্ত্রী, আর তালিকার ৫ নম্বরে থাকা মো. আল আমিন খালাসীও আব্বাস আলীর ভাই, ১২ নম্বরে থাকা আলী আহসান এমপির আরেক শ্যালক। এ ছাড়া তালিকার ১৩ নম্বরে থাকা খালিদ আহম্মদ, ১৫ নম্বরে থাকা মিশকাত ও ২১ নম্বরে থাকা বুলবুল জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, এরা এমপির ঘনিষ্ঠ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
কঠোর সমালোচনা
এ ঘটনার পর এলাকার লোকজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনকি সংসদেও সমালোচনা ও নানা বিতর্ক চলছে। সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানের দায় পুরাটাই কি– এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে এমপির শ্বশুরবাড়ি লাহুড়িয়া ইউনিয়নের অসহায় বাসিন্দা রবিউল মোল্লা জানান, এমপি প্রকৃত অসহায়দের সহায়তা না দিয়ে মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনদের দিয়েছেন। জামায়াতের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এটা ইনসাফ হয়নি। ওরা মুখে বলে ইনসাফ কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে এর মিল নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লাহুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা বলেন, পিএস সর্বোচ্চ এমপির মেয়ের নামটা দিতে পারে। কিন্তু এমপির একাধিক শ্যালকের মেয়ে, ছেলে ও শ্বশুরকুলের আত্মীয়দের নাম-ঠিকানা পিএস কীভাবে পেল? এমপি বা এমপি পরিবারের কেউ যদি নাম ও তথ্য দিয়ে সহায়তা না করে, পিএসের একার পক্ষে তাদের তালিকা করা সম্ভব না।
এ বিষয়ে নড়াইল-২ আসনে সংসদ সির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় নড়াইলের মান-ইজ্জত গেছে। পিএসের দায় কখনোই তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। তা ছাড়া পিএস কীভাবে অনুমতি ছাড়া তার আত্মীয়-স্বজন, এমনকি শ্বশুরবাড়ির লোকদের নাম তালিকায় দেয়? আমি দেখতে চাই, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেন।
এমপি ও ইউএনওর বক্তব্য
তালিকার বিষয়ে এমপি আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘আমি তখন নড়াইলে ছিলাম না, আমার পিএস একদিন বলল যে, এ বিষয়ে তালিকা দিতে হবে। আমি তাকে জানাই, সংসদীয় আসনের সব ইউনিয়ন থেকে নামের তালিকা দিতে। তখন আমার স্বাক্ষরিত প্যাড পিএস এর কাছে ছিল। কিন্তু পিএস আমার পরিবার বা এলাকার লোক বেশি দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এটা আমি চাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনুদানের টাকা যে আসছে, তাও আমি জানতাম না। অনুদানপত্র শুক্রবার ফেসবুকে প্রচারের পর আমি ইউএনওকে বললাম, টাকা আসছে কি না। ইউএনও আমাকে জানিয়েছেন, স্যার টাকা তো আসছে। আমি বললাম, আমাকে তো জানাননি। তালিকায় যেটা দেওয়া আছে, আমি তো সেটা দিতে পারব না। আমি তো এমন না যে, আমার সন্তানের নাম দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিতে হবে।’
নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির বলেন, ‘এমপি স্যারের ডিও লেটার অনুযায়ী তালিকায় থাকা নামে এই অনুদান সচিবালয় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, সচিবালয় থেকে যাদের নামে বরাদ্দ এসেছে, তাদেরই দিতে হবে। এর বাইরে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর মধ্যে যদি কেউ না আসেন, তার টাকা ফেরত যাবে। কিন্তু এখান থেকে নতুন তালিকা দেওয়ার সুযোগ নেই। তালিকা সংশোধন করতে হলে সচিবালয় থেকেই করতে হবে।’