দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানোর অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় সুইডিশরা। অন্যদিকে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রত্যয়ী শিরোপার অন্যতম দাবিদার ফ্রান্স।
বিশ্বকাপের নকআউট মানেই স্নায়ুর লড়াই, সাহসের পরীক্ষা, আর স্বপ্ন টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মঞ্চে এবার মুখোমুখি দুই ভিন্ন বাস্তবতার দল। একদিকে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফ্রান্স, অন্যদিকে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে গ্রুপ পর্বের বৈতরণি পাড়ি দেওয়া সুইডেন। আজ নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে রাউন্ড বত্রিশের ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায়।
কাগজে-কলমে ফরাসিরাই এগিয়ে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের নিয়ে গড়া দলটিকে এবারের আসরের অন্যতম হট ফেভারিট মানা হচ্ছে। প্রতিযোগিতার সবশেষ দুই আসরেই ফাইনাল খেলেছে তারা। তবে ফুটবলের ইতিহাস বলে–বড় মঞ্চে সাহসী আন্ডারডগরাই অনেক সময় গল্প বদলে দেয়। আর এ কারণেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়া সুইডেনকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাতায়নে রোমাঞ্চকর এক ম্যাচের সুবাসই মিলছে।
সুইডেনের এবারকার বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল রীতিমতো নাটকীয়। বাছাইপর্বে নিজেদের গ্রুপে তলানিতে থেকেও হাল ছাড়েনি তারা। প্লে-অফের কঠিন পথ পেরিয়ে জায়গা করে নেয় বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে। উত্তর আমেরিকার মাটিতে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দুর্দান্ত সূচনা করেছিল দলটি। কিন্তু পরের ম্যাচেই নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একই ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় দলটি। সব হিসাব মেলানোর শেষ সুযোগ আসে এশিয়ার দেশ জাপানের বিপক্ষে। স্নায়ুচাপের সেই ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে তৃতীয় সেরা আটটি দলের একটি হিসেবে কোনোমতে নকআউটের টিকিট নিশ্চিত করেছে সুইডিশরা। এবার তো দলটির সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা।
দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় আছে। দ্য ব্লুসরা নিজেদের সবশেষ ম্যাচে নরওয়েকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে। দলটির দুই ভয়ংকর তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলে, যাদের গতির সঙ্গে তাল মেলানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য কঠিন। পাশাপাশি আরেক ফরোয়ার্ড মাইকেল ওলিসেও দারুণ ছন্দ নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছেন। যেকোনো মুহূর্তে এই তরুণও জ্বলে উঠতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই সুইডিশদের বিপক্ষে ম্যাচে ফেভারিট ধরা হচ্ছে ফ্রান্সকে। সুইডেনকে দেখা হচ্ছে আন্ডারডগ হিসেবেই।
তবে এসব তকমায় বিচলিত নন সুইডেনের সহকারী কোচ সেবাস্তিয়ান লারসন। তার চোখে ফ্রান্স শক্তিশালী, কিন্তু অজেয় নয়। লারসন বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ফ্রান্স সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার আছে। তাদের বেশ কয়েকজন অসাধারণ খেলোয়াড় আছে। আমাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তবে আমরা দারুণ মানসিকতা নিয়ে ম্যাচটির অপেক্ষায় আছি।’ লারসনের আত্মবিশ্বাসের পেছনে আছে অতীতের স্মৃতি। ২০১২ ইউরোতে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল সুইডেন। সেই ম্যাচে দলের দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন লারসন নিজেই। সুইডেনের জার্সিতে ১৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা সাবেক এই মিডফিল্ডার খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংকেই বেছে নিয়েছেন। এখন তিনি গ্রাহাম পটারের সহকারী। পটারের অধীনেই ইউক্রেন ও পোল্যান্ডকে প্লে-অফে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে সুইডেন। অতীতের সাফল্য বর্তমান দলকে সাহস জোগাবে বলেই বিশ্বাস লারসনের, ‘অতীতে তাকালে দেখা যাবে, আমরা আগেও বড় বড় দলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছি। এবার সামনে ফ্রান্স হলেও সেই স্মৃতি আমাকে আত্মবিশ্বাস দেয়। আশা করি, খেলোয়াড়দেরও দেবে।’
নকআউটের ম্যাচের আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম বলেছেন, ‘নকআউট পর্বে অতীত বা পরিসংখ্যান কোনো গুরুত্ব রাখে না। সুইডেন খুবই সংগঠিত দল। আমাদের ধৈর্য ধরে খেলতে হবে এবং সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’ অধিনায়ক ও কোচ দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা দেশম জানিয়েছেন, দলের আক্রমণভাগ দুর্দান্ত ছন্দে থাকলেও রক্ষণে ভারসাম্য ধরে রাখাই হবে তার মূল লক্ষ্য। ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ভুল করতে চান না, ‘নকআউট ম্যাচে ভুলের সুযোগ নেই। আমাদের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’
একদিকে তারকাখচিত ফরাসি শক্তি, অন্যদিকে লড়াকু সুইডিশ মানসিকতা। এখন দেখার বিষয়, ছন্দের দাপটে ফ্রান্স এগিয়ে যায়; নাকি সাহস আর বিশ্বাস দিয়ে নতুন বিস্ময়ের জন্ম দেয় সুইডেন।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
মুখোমুখি: ২৩
ফ্রান্স জয়: ১২
সুইডেন জয়: ৬
ড্র: ৫
ফ্রান্স: ৩৭ গোল
সুইডেন: ২৫ গোল