তিন বছর আগে গুরুতর এক চোটে ক্যারিয়ারটাই থমকে যেতে বসেছিল জুলিয়ানো সিমেওনের। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল তো দূরের স্বপ্ন, ক্লাব ফুটবলেও তখনো মাটি খুঁজে পাননি এই উইঙ্গার। কিন্তু অনিশ্চয়তায় ভরা ওই সময়েও স্বপ্ন দেখা থামাননি তিনি। বন্ধুদের বলেছিলেন, ‘আমি আগামী বিশ্বকাপে খেলব’। নন্দিত কোচ দিয়েগো সিমেওনের ছেলে নিজের সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিয়ে ছেড়েছেন। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে লিখেছেন ফিরে আসার অবিশ্বাস্য গল্প।
সময়টা ২০২৩। জুলিয়ানো তখন আতলেতিকো মাদ্রিদ থেকে ধারে আলাভেসে খেলছেন। একটি প্রীতি ম্যাচে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের বাজে ট্যাকলে তার পা ও গোড়ালি ভেঙে যায়। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা, অস্ত্রোপচারের ধাক্কা, আর সামনে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা–সব মিলিয়ে সময়টা খুবই কঠিন ছিল জুলিয়ানোর। সেই সময়েরই কিছু ছবি, আর বন্ধুদের সঙ্গে করা হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিনশট সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন ২৩ বছর বয়সী ফুটবলার। জুলিয়ানোর নিজের ভাষায় এগুলো ‘অন্ধকার সময়ের সাক্ষী।’
২০২৩ সালের ৬ আগস্ট একটি বার্তায় জুলিয়ানো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন–‘আমি তোমাদের একটা কথা বলছি, আমি পরের বিশ্বকাপে খেলব।’ যদিও চোটের ধাক্কায় জর্জর সময়ে বলা এক স্বপ্ন ছিল সেটি। তবে এরপর প্রায় ৩৫ মাস টানা পরিশ্রম, পুনর্বাসন আর আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন জুলিয়ানো। সেই সময় জুলিয়ানোর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল আলাভেসের হয়ে মাঠে ফেরা। সেটা তিনি পেরেছিলেনও। এর মধ্যে আবার আসে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এক বছরের ধারের চুক্তি শেষে আতলেতিকোয় ফিরতে হয়। শুধু ফিরলে তো আর হবে না। মূল দলে নিয়মিত হতে হবে। যে দলের কোচ আবার নিজের বাবা। ফলে চাপ ছিল দ্বিগুণ, কিন্তু জুলিয়ানো সেই চাপকেই শক্তিতে পরিণত করেন। হয়ে উঠেন কোচের আস্থাভাজন।
আর এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ–লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ডাক পাওয়া। যা ছিল তার স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় দরজা খুলে দেওয়া মুহূর্ত। সবশেষে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ২৬ জনের তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগই হয়ে ওঠে তার জীবনের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার। তবে জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় জুলিয়ানোর। স্কালোনি এ ম্যাচে তাকে প্রথম একাদশেই রেখেছিলেন।
মাঠে নামার মুহূর্তে যখন জাতীয় সংগীত গাইছিলেন, তখন জুলিয়ানোর চোখে ছিল আবেগ আর গর্বের ঝিলিক। তিন বছর আগেও যাকে ভাঙা পায়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে, সেই তিনিই তিনবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে। জুলিয়ানোর কথায়, ‘আলাভেসে গুরুতর চোট পাওয়ার পর প্রথম যেটা ভেবেছিলাম, সেটা ছিল বিশ্বকাপে পৌঁছানো। তখন পর্যন্ত আমি আর্জেন্টিনার কোনো যুব দলে পর্যন্ত খেলিনি। কিন্তু সেটাই লক্ষ্য বানিয়েছিলাম। প্রতিদিন অনুশীলনে আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করেছি এবং শেষ পর্যন্ত পরিশ্রম ফল দিয়েছে।’
জুলিয়ানো সিমেওনের এই গল্প যেন শুধুই একটি স্বপ্ন পূরণের গল্প নয়। একই সঙ্গে বিশ্বাস, প্রতিজ্ঞা আর কঠোর পরিশ্রমের গল্পও।