ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে এসে সাবেক শিক্ষার্থীসহ এক নারীকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে অভিযুক্ত শিবির সমর্থক হল সংসদের নেতা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে বেশ কয়েকটি ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এ ছাড়া এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে দল বেঁধে ছাত্র হলের মাঠে এসে খেলা দেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল নারী শিক্ষার্থী। তারা অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
গতকাল রবিবার সকালে নারী শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে এসে ফুটবল বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ দেখেন। এ সময় সব নারী শিক্ষার্থীকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান ওই হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৯টি আবাসিক হল রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদের জন্য ১৪টি এবং ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৫টি হল। শহীদুল্লাহ্ হলটি ছাত্রদের হল।
জানা গেছে, গত ২৬ জুন নরওয়ে-ফ্রান্স ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে ২০১৭-১৮ সেশনের মার্কেটিং বিভাগের শাওন-নুসরাত দম্পতিসহ ২০১৬-১৭ ও ২০১৮-১৯ সেশনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় সাবেক শিক্ষার্থী হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মো. সাজু মিয়াসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সাবেক ওই শিক্ষার্থীদের জোর করে হল থেকে বের করে দেন।
যদিও নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাজু মিয়া। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া তিনি ছাত্রশিবিরের কোনো পদে না থাকলেও সমর্থক বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মহিউদ্দিন খান।
অভিযুক্ত সাজুর ভাষ্য, তিনি কোনো নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করেননি। যারা হেনস্তার অভিযোগ তুলছেন, তাদের তিনি ভদ্রভাবে যেতে বলেছেন। তারাই ‘উল্টো চোটপাট’ দেখিয়েছেন বলে তার দাবি।
শহীদুল্লাহ্ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এভাবে কাউকে বের করে দেওয়ার ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। বিষয়টি তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব হল প্রশাসনের’।
এ ঘটনায় গত শনিবার হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী। রবিবার নারী হেনস্তা এবং নারীদের উদ্দেশে প্রকাশ্যে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার প্রতিবাদ জানিয়ে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেছে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদ। এ ছাড়া দুপুরে পাঁচ দফা দাবিতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র মৈত্রী। এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীরা খেলা দেখা শেষে তিন দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর স্মারকলিপি দেন।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রি বলেন, ‘আমরা মনে করছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর নারীবান্ধব নেই। নারীদের বিচরণ ও চলাফেরাকে সীমাবদ্ধ করার জন্য এবং তাদের অংশগ্রহণ সংকুচিত করার জন্য একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন পাঁয়তারা চালাচ্ছে। প্রক্টর স্যার আমাদের কাছে কিছু সময় চেয়েছেন এবং বলেছেন তিনি বিষয়টি দেখবেন। আমরাও বলেছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করব।’
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা দাবিগুলো হলো–নারী হেনস্তার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা; ক্যাম্পাসে নারী হয়রানি বন্ধ, অনলাইন হেনস্তা, গোপনে ভিডিও ধারণ এবং মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক ও আবাসিক পরিসরে এমন কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না, যা নারীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে বা তাদের চলাচল ও অংশগ্রহণকে অযৌক্তিকভাবে সীমাবদ্ধ করে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তে একজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’