যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। চার বছর অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ ফুটবলের যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, সেখানে এখন বেলা শেষের গানের সুর বাজতে শুরু করেছে। ১০৪ ম্যাচের আসরের অর্ধেকেরও বেশি ৭২টি ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। এ ম্যাচগুলো ছিল গ্রুপ পর্বের। যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮ দল অংশ নিয়েছিল ১২ গ্রুপে। গ্রুপ পর্ব শেষে আছে আনন্দযাত্রা। আবার আছে বিদায়ের রাগিণী। ৩২ দল টিকে আছে। বিদায় ঘণ্টা বেজেছে ১৬ দলের।
১২ গ্রুপ থেকে সেরা দুইটি করে দল সরাসরি শেষ বত্রিশে জায়গা করে নেয়। কিন্তু শেষ বত্রিশের বাকি ৮টি জায়গার জন্য ১২ গ্রুপের সেরা তৃতীয় দলকে বেছে নিতে হয়। গ্রুপ পর্বের ৭২টি ম্যাচ তাই ছিল আনন্দে-বেদনার মিশেল। যেমন ‘এইচ’ গ্রুপে নবাগত কেপ ভার্দে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। আবার ‘ডি’ গ্রুপে তুরস্ক ৩ পয়েন্ট নিয়ে লড়াইয়েই থাকতে পারেনি। গ্রুপে অবস্থান হয় চতুর্থ। আবার ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়েও শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিতে পারেনি ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্কটল্যান্ড।
নকআউট পর্বে টিকে থাকার মন্ত্র একটিই ‘জয়’। এর কোনো বিকল্প নেই! আগের আসরগুলোতে নকআউট পর্বে আসার পথে অনেক অঘটন ঘটে। অনেক শিরোপাপ্রত্যাশী দলই গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। যেমন গতবার সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। তারা গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়েছিল। কিন্তু এবার সে রকম বড় কোনো অঘটন ঘটেনি। প্রত্যাশিত দলগুলোই টিকিট পেয়েছ। দলগুলো হলো মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা (এ গ্রুপ) সুইজারল্যান্ড, কানাডা, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা (বি গ্রুপ), ব্রাজিল, মরক্কো (সি গ্রুপ), যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, প্যারাগুয়ে (ডি গ্রুপ), জামার্নি, আইভরিকোস্ট, ইকুয়েডর, (ই গ্রুপ), নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন (এফ গ্রুপ), বেলজিয়া, মিসর (জি গ্রুপ), স্পেন, কেপ ভার্দে (এইচ গ্রুপ), ফ্রান্স, নরওয়ে, সেনেগাল (আই গ্রুপ), আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া (জে গ্রুপ), কলম্বিয়া, পর্তুগাল, ডি আর কঙ্গো (কে গ্রুপ), ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, (এল গ্রুপ)।
বড় কোনো দল বাদ না পড়লেও নবাগত কেপ ভার্দের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় চমক। ৩টি ম্যাচই ড্র করে তারা ৩ পয়েন্ট নিয়ে ‘এইচ’ গ্রুপে রানার্সআপ হয়ে শেষ বত্রিশে উঠে আসে। কেপ ভার্দের উত্থানে তাদের গ্রুপ থেকে সাবেক দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে বাদ পড়ে। উরুগুয়ের বিদায়কে কিছুটা হলেও অঘটন বলা যায়। তৃতীয় রাউন্ডে ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে নেইমারের মাঠে নামার মধ্য দিয়ে। ৯১৮ দিন পর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামের নেইমার।
তৃতীয় রাউন্ডে চমক ছিল জার্মানির হার। ‘ই’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে তারা ইকুয়েডরের কাছে ১-২ গোলে হেরে যায়। এই হারে জামার্নির গ্রুপসেরা হওয়ার পথে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হলেও ৪ পয়েন্ট গ্রুপের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নেয় ইকুয়েডর। আবার ‘ডি’ গ্রুপে তুরস্কের কাছে ৩-২ গোলে যুক্তরাষ্ট্রের হারও ছিল অঘটনের শামিল। জার্মানির মতো যুক্তরাষ্ট্রেরও এই হারে তাদের গ্রুপসেরা হতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু তুরস্ক ম্যাচ জিতে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে সবার নিচেই অবস্থান করে বিদায় নেয়।
প্রথম রাউন্ডে সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছিল কোরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানি ৭-১ গোলে, দ্বিতীয় রাউন্ডে কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ গোলে ছিল সবচেয়ে বড়। তৃতীয় রাউন্ডে বড় জয় ছিল সেনেগাল ও বেলজিয়ামের। সেনেগাল ৫-০ গোলে ইরাককে এবং বেলজিয়াম ৫-১ গোলে নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে। এই রাউন্ডে জয়-পরাজয় নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮ ম্যাচে। ড্র হয়েছে ৬টি ম্যাচ। প্রথম রাউন্ডে ১৬টি ও দ্বিতীয় রাউন্ডে ১৯টি ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছিল। ইউরোপ আমেরিকার দাপুটের কাছে আফ্রিকা ও এশিয়ার দলগুলো খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। আফ্রিকার ৯টি দেশ নকআউট পর্বে গেলেও এশিয়া থেকে শুধুমাত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়া টিকিট পেয়েছে।
এই রাউন্ডে এবারের আসরে দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক দেখেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে হ্যাটট্রিক করেন দলের প্রথম তিন গোল করে। ম্যাচে ফ্রান্স জয়ী হয় ৪-১ গোলে। প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার মেসি। প্রথম রাউন্ডই হ্যাটট্রিক করে গোলদাতার শীর্ষে চলে যাওয়া মেসি নিজের এই অবস্থান ধরে রেখেছেন ৬ গোল করে। শেষ রাউন্ডে তিনি জর্ডানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমে ফ্রি কিক থেকে বাম পায়ের জাদুতে একটি গোল করেন। তৃতীয় রাউন্ডে গোল হয়েছে ৭৪টি। সব মিলিয়ে গ্রুপ পর্বে গোলের সংখ্যা ২১৫টি। প্রথম রাউন্ডে ৭৫টি, দ্বিতীয় রাউন্ডে ৬৬টি গোল হয়েছিল। আত্মঘাতী গোল হয়েছে ১২টি। গ্রুপ পর্বে ৫৯তম ম্যাচেই বিশ্বকাপের এক আসরের সর্বোচ্চ গোল রেকর্ড ভেঙে যায়। এক আসরে সবচেয়ে বেশি গোল হয়েছিল ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে ১৭২টি। এবারের আসরের গোল সংখ্যা আরও বাড়বে। কারণ এখনো খেলা অবশিষ্ট আছে ৩২টি।
সরাসরি লাল কার্ড দেখেছেন ১০ জন খেলোয়াড়। এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকারই তিনজন। ইরাকের আছে দুইজন। এ ছাড়া ইরাক, উরুগুয়ে, মেক্সিকো, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, প্যারাগুয়ে, বেলজিয়ামের একজন করে। সবেচেয়ে বেশি দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন মেক্সিকো ও চেক রিপাবলিকের ম্যাচে। মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতি ছিল ৮০,৮২৪ জন।
১২ গ্রুপের সেরা তৃতীয়
পজিশন গ্রুপ দেশ ম্যাচ জয় ড্র হার গোল ব্যবধান পয়েন্ট অবস্থান
১. কে ডিআর কঙ্গো ৩ ১ ১ ১ +১ ৪ নকআউট পর্ব
২. এফ সুইডেন ৩ ১ ১ ১ ০ ৪ নকআউট পর্ব
৩. এল ঘানা ৩ ১ ১ ১ ০ ৪ নকআউট পর্ব
৪. ই ইকুয়েডর ৩ ১ ১ ১ ০ ৪ নকআউট পর্ব
৫. বি বসনিয়া অ্যান্ড ৩ ১ ১ ১ -১ ৪ নকআউট পর্ব
হার্জেগোভিনা
৬. জে আলজেরিয়া ৩ ১ ১ ১ -২ ৪ নকআউট পর্ব
৭. ডি প্যারাগুয়ে ৩ ১ ১ ১ -২ ৪ নকআউট পর্ব
৮. আই সেনেগাল ৩ ১ ০ ২ +২ ৩ নকআউট পর্ব
৯. জি ইরান ৩ ০ ৩ ০ ০ ৩ যেতে পারেনি
১০. এ দ. কোরিয়া ৩ ১ ০ ২ -১ ৩ যেতে পারেনি
১১. সি স্কটল্যান্ড ৩ ১ ০ ২ -৩ ৩ যেতে পারেনি
১২. এইচ উরুগুয়ে ৩ ০ ২ ১ -১ ২ যেতে পারেনি