ঢাকা ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী সবসময় ‘সুবিধাবাদী’, একাত্তরে তারা স্বাধীনতা চায়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধিবেশনের শেষ সময়ে ওয়াকআউট বিরোধী দলের কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায় ভূমিকম্পের কম্পন ৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল: মির্জা ফখরুল জার্মানি-প্যারাগুয়ে ম্যাচ কে জিতবে, সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর দক্ষিণ কোরিয়ার কোচের পদত্যাগ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুদের টাকা নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৩০ এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ তাপপ্রবাহে ইউরোপে অতিরিক্ত ১৩০০ জনের বেশি মৃত্যুর রেকর্ড : ডব্লিউএইচও আফ্রিকার জয়জয়কার, হতাশ এশিয়া খবরের কাগজের মহিউদ্দিন পলাশ রানারআপ ঘুষ ছাড়া মিলছে না ধান বিক্রির সুযোগ, বিপাকে কৃষকরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের তুলনার সুযোগ নেই: ত্রাণমন্ত্রী নক্ষত্রের পতন হয়নি জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিধ্বস্ত রোনালদোকে নিয়ে বেশি ঝুঁকি নিচ্ছে পর্তুগাল? নাঈম হাসানকে থানায় হেনস্তা: তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: পানিসম্পদ মন্ত্রী হোন্ডার নতুন সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক হ্যাচব্যাক গাড়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্বোধন প্রাণী কি মৃত্যু বুঝতে পারে? যেভাবে তৈরি হয়েছিল গিজার গ্রেট পিরামিড ২৭ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ আঁতুড়ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে তরুণ ফুটবলার গোবিপ্রবির ১৭ শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করল প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে লক্ষ্য পূরণ হলো না জ্যোতিদের অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি ও এসপিসহ ২১ কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব ডেইলি স্টার হামলা মামলায় এনসিপির আনোয়ার রিমান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের পদমর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর

এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১১:১০ পিএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬, ১১:১৭ পিএম
এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড': কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) খ্যাতনামা টার্মিনাল অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড' এর সাথে সরকারের আলোচনা ও দরকষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। হঠাৎ করেই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে। টার্মিনালটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই মূলত এই আন্তর্জাতিক জায়ান্টকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি জিটুজি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ-ইউএই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচিত হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে বিষয়টি ছিল অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ প্ল্যাটফর্ম বৈঠকেও এটি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনার পথ ধরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি ও বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত একটি মাইলফলক। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বাড়াতে এটি নির্মিত হয়েছিল। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০০০ সালের দিকে এনসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেময়কার জেটিগুলো কনটেইনারের চাপ সামলাতে পারছিল না। এই সমস্যার সমাধানে বন্দরের নিউমুরিং এলাকায় একটি সম্পূর্ণ আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৭ সালে টার্মিনালের জেটি ও অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ৫টি জেটি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। জেটি ও ইয়ার্ডের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন কারণে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা সম্ভব হয়নি। ক্রমান্বয়ে যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৭ সালে টার্মিনালটি পুরোদমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং শুরু করে। চালুর পর থেকেই আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নিরবচ্ছিন্নভাবে হ্যান্ডলিং করছে। ফলে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমেছে, কমেছে উৎপাদনশীলতা। টার্মিনালে ইক্যুইপমেন্ট অ্যাভেইলেভিলিটি বা যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতার (কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যন্ত্রপাতি প্রস্তুত বা সচল থাকা) বৈশ্বিক মান যেখানে গড়ে ৯৩ শতাংশ, সেখানে এনসিটিতে এই মান প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থ্যাৎ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও যন্ত্রপাতির পূর্ণ কার্যক্ষমতার অভাবে কাঙ্খিত মাত্রায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে না। এ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। এককভাবে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়া এই টার্মিনালে প্রতিঘন্টায় ২০-২২ টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় নিলে একইসময়ে ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এতে বাড়বে কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং কমবে জাহাজের টার্ণ অ্যারাউন্ড টাইম। বিদ্যমান অবকাঠামোয় উন্নত যন্ত্রপাতি ও দক্ষতার সংযোজন এই টার্মিনালের সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

এনসিটিতে কেন ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (ITO)?
টার্মিনাল অপারেশনে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (International Terminal Operator) যুক্ত করার বিষয়টি কেবল ক্রেন বা জাহাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইন এবং ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কোনো দেশের প্রবেশদ্বার বা বন্দরকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং এর পরিচালন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত কারণগুলো রয়েছে, তা

নিচে আরও বিস্তারিত ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. বিশাল মূলধন ও বিনিয়োগ
একটি আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ইন্টারন্যাশনাল অপারেটররা নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে টার্মিনালে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি স্থাপন করে। এতে একদিকে যেমন বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে তেমনি সরকারের ওপর আর্থিক ব্যয়ের চাপ কমে।

২. সক্ষমতা
ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটরের পরিচালনগত সক্ষমতা অনেক বেশি। তারা বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম। তাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতায় রয়েছে আধুনিক মেগা-ভেসেল হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আধুনিক ক্রেন এবং স্বয়ংক্রিয় ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি, তাদের কৌশলগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্ক আমাদের বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব-এ রূপান্তর করতে শতভাগ সক্ষম।

৩. আধুনিক প্রযুক্তি
আন্তর্জাতিক মানের অপারেটরদের অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রয়েছে। শুধু একটি টার্মিনাল অপারেশনে নয় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকতে অপারেটরগুলো সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

৪. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটরদের অনেকেরই নিজেদের মালিকানাধীন শিপিং লাইন আছে অথবা শীর্ষ শিপিং জোটগুলোর সাথে কৌশলগত চুক্তি আছে। ফলে যখন কোনো ইন্টারন্যাশনাল অপারেটর একটি টার্মিনালের দায়িত্ব নেয়, তারা তাদের বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের (শিপিং লাইন) সেই বন্দরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে। এর ফলে একটি সাধারণ বা আঞ্চলিক বন্দর আন্তর্জাতিক রুটের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়, যা দেশের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. স্বচ্ছতা
আন্তর্জাতিক অপারেটর সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন 'টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম' ব্যবহার করে। রিয়েল-টাইম ডাটা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি কনটেইনার ও জাহাজের অবস্থান কাস্টমস এবং অংশীজনদের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান থাকে, যা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং অন্যায্য দাবির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সুশাসন, সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ কাঠামো এবং বৈশ্বিক অ্যান্টি-করাপশন পলিসি মেনে চলার কারণে কোনো ধরনের লুকানো খরচ বা সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ থাকে না; যা নিয়মিত থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে সরকারের কাছে সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

৬. দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় বন্দরে কাজ করার কারণে এই অপারেটরদের অভিজ্ঞতা থাকে ব্যাপক। ফলে তারা জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম বা বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল কমিয়ে আনতে পারে। দক্ষ লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৭. রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন)
একটি আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালের পরিচালনগত ও বাণিজ্যিক চেহারায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন 'স্মার্ট পোর্ট' এ রূপান্তরিত হয়। এর ফলে, একটি জাহাজের কনটেইনার ওঠানামার গতি ঘণ্টায় ১০-১২টি থেকে বেড়ে ৩০টিরও বেশিতে উন্নীত হয়, যা জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমিয়ে ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনে। একই সাথে, অপারেটরের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং লাইন ও বিশাল মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি এই বন্দরে ভিড়তে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে, একটি সাধারণ আঞ্চলিক ফিডার পোর্ট রাতারাতি আন্তর্জাতিক রুটের একটি প্রধান সাপ্লাই চেইন হাবে পরিণত হয়, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

কেন ডিপি ওয়ার্ল্ড?

১. ডিপি ওয়ার্ল্ড আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্পূর্ণ মালিকানা সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি। ডিপি ওয়ার্ল্ড 'দুবাই ওয়ার্ল্ড' এর অধীনে পরিচালিত হয়। দুবাই ওয়ার্ল্ড দুবাই সরকারের একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা। দুবাই ওয়ার্ল্ডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান পোর্ট অ্যান্ড ফ্রি জোন ওয়ার্ল্ড সরাসরি ডিপি ওয়ার্ল্ডের শতভাগ শেয়ারের মালিক। যে প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপন ও পরিচালনা করে। বাংলাদেশ সরকারের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের ঐতিহাসিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সংযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। যা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টার্মিনাল অপারেটর
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর, যা প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের রয়েছে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক কোয়ান্টাম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। যা প্রয়োগ করলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বজুড়ে কেবল পোর্ট অপারেটর হিসেবেই নয়, বরং একটি মাল্টি-মডাল লজিস্টিকস জায়ান্ট (সমুদ্র, রেল ও সড়কপথের সমন্বিত নেটওয়ার্ক) হিসেবে কাজ করে। রেড সী কান্ট্রি বা লোহিত সাগরের অববাহিকার দেশ এবং মধ্য এশিয়ার আজারবাইজান পর্যন্ত রেল সংযোগের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক করিডোর উন্নয়নে কাজ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

২. উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা
বর্তমানে এনসিটি দক্ষতার সাথে পরিচালিত হলেও বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বন্দরের দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর। তাদের উন্নত অপারেটিং সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার কারণে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি (হ্যান্ডলিং স্পিড) বৈশ্বিক মানের (ঘন্টায় ৩৫ একক কনটেইনার)। এর ফলে বন্দরে জাহাজের অবস্থান করার সময় বা 'টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম' বর্তমানের চেয়ে অনেক কমে আসবে। জাহাজ যত দ্রুত পণ্য খালাস করে চলে যেতে পারবে, বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা তত বাড়বে।

৩. বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এনসিটিতে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত হলে বাংলাদেশে তাদের বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম হবে, যা বন্দরের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

৪. দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি
প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে, তাতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। উপরন্তু, হ্যান্ডলিং সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বন্দরে জাহাজের সংখ্যা এবং কনটেইনারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কনটেইনার ভলিউম বাড়ার কারণে শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

৫. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সংযোগ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের উপস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরকে বৈশ্বিক শিপিং লাইন এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত করবে। বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কৌশলগত সম্পর্ক থাকায়, তারা চট্টগ্রাম বন্দরকে তাদের প্রধান রুটে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হবে। এতে করে কনটেইনার পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বস্ততা ও রেটিং বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমিরাত সরকার চালু করেছে আমিরাত শিপিং লাইন। যা তাদের লজিস্টিকস ও বন্দর ইকোসিস্টেমকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তুলবে।

৬. আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ কমবে
টার্মিনালের কর্মক্ষমতা বাড়লে ব্যবসায়ীদের বিলম্ব মাশুল দিতে হবে না। পণ্য দ্রুত খালাস হওয়ায় ব্যবসায়ীদের লিড-টাইম (পণ্য উৎপাদন থেকে বাজারে পৌঁছানোর সময়) কমে আসবে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য বিশ্ববাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।

৭. বন্দরের ব্যয় সাশ্রয়
বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নিজেরা বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া এখন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বর্তমান মূল্য পরিশোধ করে অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিনিয়োগ করতে হবে না, একই সাথে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মূল্য কর্তৃপক্ষের তহবিলে যোগ হবে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় না থাকায় কর্তৃপক্ষের বার্ষিক বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে।

৮. বে টার্মিনাল ও অন্যান্য মেগা প্রকল্পে সহায়তার পথ সুগম হওয়া
এনসিটি পরিচালনার মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সফল অংশীদারিত্ব তৈরি হলে, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে।

৯. মানবসম্পদ উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক এই অপারেটরটি তাদের সাথে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার এবং গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি) নিয়ে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় কর্মকর্তা ও বন্দর শ্রমিকরা আধুনিক বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মানবসম্পদকে দক্ষ করে তুলবে।

টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, নিরাপত্তার চাবিকাঠি দেশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হবে শুধুমাত্র 'টার্মিনাল অপারেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা' সংক্রান্ত, কোনোভাবেই নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। বন্দর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহির্নোঙ্গর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং আইএসপিএস (ISPS) কোড কমপ্লায়েন্ট বন্দর। এই বৈশ্বিক কোডের নিয়ম অনুযায়ী, টার্মিনালের চূড়ান্ত নিরাপত্তার চাবিকাঠি থাকবে বন্দরের হাতে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব বা বিদেশি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আমাদের পূর্বানুমতি এবং কঠোর স্ক্রিনিং ছাড়া বন্দরের স্পর্শকাতর কোনো ডেটা বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থা (যেমন ইউএস কোস্ট গার্ড এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন-IMO) দ্বারা অডিট হয় বন্দরে। চট্টগ্রাম বন্দর সর্বদা 'নিরাপত্তা ঝুঁকিমুক্ত' ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়ে আসছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিজেদের বাণিজ্যিক সুনাম ধরে রাখতেই ISPS কোডের নিরাপত্তা মানদণ্ড শতভাগ মেনে চলতে বাধ্য। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সামান্যতম গাফিলতি বা বিচ্যুতির ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের 'জিরো টলারেন্স' নীতি বলবৎ থাকবে এবং প্রস্তাবিত চুক্তি বাতিলের কঠোর আইনি ধারা রয়েছে। এ ছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরে যে স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করবে, তার প্রতিটি ডেটা এবং সিসিটিভি (CCTV) ফিড রিয়েল-টাইমে বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে। ফলে বন্দরের ভেতরে কোন কনটেইনার আসছে বা যাচ্ছে, তার প্রতিটি তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তথ্য পাচার বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো প্রযুক্তিগত সুযোগ থাকবে না।

ল্যান্ডলর্ড মডেলের উৎকৃষ্ট প্রয়োগ
বিশ্বজুড়ে আধুনিক এবং বড় বড় সমুদ্রবন্দরগুলোর প্রায় ৮০% এরও বেশি বর্তমানে 'ল্যান্ডলর্ড মডেল' নীতিতে পরিচালিত হয়। রটারড্যাম, সিঙ্গাপুর, কিংবা দুবাইয়ের মতো বিশ্বসেরা বন্দরগুলো এই মডেল ব্যবহার করেই সফল হয়েছে। একটি আধুনিক বন্দর চালাতে প্রতিনিয়ত শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের ওপর চলে যায়। ফলে সরকারের বা সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা এই ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক বিনিয়োগে খরচ করতে হয় না। রাষ্ট্র সেই টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যবহার করতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত করতে বা নতুন প্রযুক্তি কিনতে দীর্ঘ আইনি ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বন্দরের গতি কমিয়ে দেয়। বেসরকারি অপারেটররা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক নিয়মে চলে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয় এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। এর ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়ে এবং জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমে যায়। অনেকের মনে ভয় থাকে, বেসরকারি বা বিদেশি কোম্পানিকে দিলে দেশ বন্দর হারাতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করে। এই মডেলে বন্দরের জমি, জেটি, জলসীমা এবং যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তির মূল মালিকানা চিরকাল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। কোম্পানিটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য 'অপারেশন বা পরিচালনার লাইসেন্স' দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে বা শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাদের বের করে দিতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো গ্লোবাল অপারেটরদের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থাকে। তারা যখন কোনো বন্দরে যোগ দেয়, তখন বিশ্বের বড় বড় শিপিং লাইনগুলো সেই বন্দরে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে বন্দরে জাহাজের আগমন বাড়ে। অপারেটর লাভ করুক বা না করুক, ল্যান্ডলর্ড মডেলের চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির রয়‍্যালটি, লিজ রেন্ট এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট ফি সরাসরি পেয়ে যায়। অর্থাৎ, ঝুঁকি ছাড়াই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া একই সংস্থাকে যখন নিয়ম বানাতে হয় এবং নিজেই সেই নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে হয়, তখন সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা দক্ষতার অভাব দেখা দিতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই দুটি কাজকে আলাদা করে দেয়। সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ এখানে কাজ করে 'রেগুলেটর' হিসেবে (নিরাপত্তা, ট্যারিফ ও আইন দেখবে)। আর বিদেশি বা বেসরকারি অপারেটর কাজ করবে, যারা শুধু ব্যবসা ও অপারেশন চালাবে। এতে বন্দরের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, গতিশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদার। মূলত শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে।

১. শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১২ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকেভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রবাসীদের পরেই বাংলাদেশিদের অবস্থান। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব আমিরাত থেকে গড়ে বছরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন (৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশে এসেছে।

মাসিক গড় প্রবাহ
বর্তমানে আরব আমিরাত থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ কোটি থেকে 4৬ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে আসে। চলতি বছরের মে মাসের এক মাসের হিসাবেই দেশটি থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

২. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার। দুই দেশই এই বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

৩. বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন
Currently বাংলাদেশে শীর্ষ ৫টি বিনিয়োগকারী দেশের একটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বাংলাদেশের জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে বড় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে।

৪. সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সাধারণ পর্যায় থেকে 'কৌশলগত অংশীদারিত্বে' রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) বা ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের বাণিজ্য শুল্কমুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে এগিয়ে নিতে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি নয় বরং এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার এক দূরদর্শী কৌশল। গ্লোবাল লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাত ধরে যুক্ত হবে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও আধুনিক প্রযুক্তি। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত 'ল্যান্ডলর্ড মডেল' এবং 'আইএসপিএস কোড'-এর দ্বিমুখী সুরক্ষাকবচের কারণে একদিকে যেমন বন্দরের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব শতভাগ অক্ষুণ্ণ থাকছে। নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক 'আইএসপিএস (ISPS) কোড' নিশ্চিত করবে বন্দরের বাণিজ্যিক গতি বাড়লেও এর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার চাবিকাঠি সবসময় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই সুরক্ষিত থাকবে। বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং জাতীয় স্বার্থের এই সুষম সমন্বয় চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী দিনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

সুফি বিশ্বাস: কলাম লেখক

শিশু একাডেমির নেতৃত্বে কি এখনো শিশুসাহিত্যিক ফিরিয়ে আনার সময় আসেনি!

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
শিশু একাডেমির নেতৃত্বে কি এখনো শিশুসাহিত্যিক ফিরিয়ে আনার সময় আসেনি!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও চরিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্ব পেয়েছে–যে প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ যে ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে, তার নেতৃত্ব কি সেই ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে থাকা উচিত নয়?

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রবণতা ছিল। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে প্রশাসনিক দক্ষতা, সরকারি সমন্বয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সব প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমি বা শিশুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা এক নয়।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ কাঠামোয় এ উপলব্ধির আংশিক প্রতিফলনও দেখা গেছে। বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে একজন সাহিত্য-গবেষক ও শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমিতেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র অন্তত কিছু ক্ষেত্রে স্বীকার করেছে যে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে নয়, বরং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল নেতৃত্বের মাধ্যমেও পরিচালিত হতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বর্তমান নেতৃত্বের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন একজন প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন এখানে বিবেচ্য নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি জাতীয় শিশু-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কেমন ধরনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিশুদের সাহিত্যচর্চা, শিল্পবোধ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে কেন্দ্র করে। শিশুর পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, শিশুদের নাটক, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ শিশু একাডেমির কাজ কেবল শিশুদের জন্য কিছু কর্মসূচি পরিচালনা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য জাতীয় পরিবেশ তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

এ কারণেই শিশু একাডেমির নেতৃত্বের প্রশ্নটি প্রশাসনিক নিয়োগের সাধারণ প্রশ্ন নয়। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব প্রায়ই তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। একজন প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মূল্যায়নের সূচক হতে পারে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার, বাজেট ব্যবহারের দক্ষতা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি। অন্যদিকে একজন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ভিন্ন কিছু সূচক–কত শিশু নিয়মিত বই পড়ছে, কত শিশু গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কত নতুন শিশু সাহিত্য প্রকাশিত হয়েছে, কত শিশু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে অথবা দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কতটা পৌঁছেছে।

এখানে কোনো একটি দক্ষতাকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শিশুকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের নীতিগত ও সৃজনশীল দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কোন ধরনের অভিজ্ঞতা অধিকতর প্রাসঙ্গিক। শিশু একাডেমির মূল কাজ যেহেতু শিশুমন, কল্পনা, সাহিত্য, শিল্প ও সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এর নেতৃত্বেও এসব ক্ষেত্রের গভীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই অধিকতর কার্যকর হতে পারে।

এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের পাঠাভ্যাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিজিটাল বিনোদনের দ্রুত বিস্তার, মোবাইলনির্ভর অবসরযাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক মনোযোগের সংস্কৃতি শিশুদের বই পড়ার অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে শিশু একাডেমির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত জাতীয় পর্যায়ে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, মানসম্মত শিশু সাহিত্য প্রকাশ ও অনুবাদে উৎসাহ দেওয়া, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং শিশুদের জন্য বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্পচর্চার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায় যে, শিশুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে প্রায়ই শিক্ষাবিদ, লেখক, শিশুমনোবিজ্ঞানী কিংবা সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ কেবল প্রশাসনিক সেবাদান নয়, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মানবিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ইতিহাসও এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও শিশুসাহিত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিশু একাডেমির নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এখানে আরেকটি বাস্তবতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে যদি একটি সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রধানত প্রশাসনিক যুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তার অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন প্রতিষ্ঠানটি তার মূল সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল ভূমিকার পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক সম্প্রসারণে পরিণত হতে পারে। শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অবকাঠামো বা প্রকল্পের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায় না, বরং তা পরিমাপ করতে হয় শিশুদের পাঠাভ্যাস, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ, সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাই শিশু একাডেমির নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এটা কোনো ব্যক্তি বা পেশাগত গোষ্ঠীর প্রশ্ন নয়, এটা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র এবং রাষ্ট্রের শিশুনীতি সম্পর্কিত প্রশ্ন। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক তদারকির জন্য দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নীতিগত ও সৃজনশীল নেতৃত্বে একজন স্বীকৃত শিশুসাহিত্যিক, শিশু-সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ অথবা শিশু বিকাশ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসা সময়ের দাবি।

জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র পুনর্গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, শিশু একাডেমির ক্ষেত্রেও সেই পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না, তা নির্ভর করে আগামী প্রজন্মের কল্পনাশক্তি, পাঠাভ্যাস, মানবিকতা এবং সৃজনশীল সক্ষমতার ওপরও। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক পদে অতিদ্রুত একজন শিশুসাহিত্যিক বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না, এটা হবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: একজন মননশীল লেখকের প্রতিভূ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: একজন মননশীল লেখকের প্রতিভূ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন জাতির শিক্ষক। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার বিষয়ে শ্রদ্ধার প্রতীক। বাংলাদেশের একজন দলনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী। সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতি সমালোচক, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্বেদ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নির্মোহ ইতিহাসবিদ, প্রভূত জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং সমালোচনামূলক অন্তরদৃষ্টির সমন্বয়ে অন্যায্য, অন্যায় ও প্রতিবাদের একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর; যিনি বিগত ছয় দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী ক্ষমতাবানদের কাছে প্রকৃত সত্যগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে সুদৃঢ়, আপসহীন ও অটল মনোভঙ্গির অধিকারী। সবকিছু ছাপিয়ে তার আরেকটি বড় পরিচয়–তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একজন বড় মাপের মননশীল লেখক।

বাংলা সাহিত্যের মননশীল সাহিত্য ধারার দুর্লভ ও সৃষ্টিশীল প্রজ্ঞাসম্পন্ন লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে যে যথার্থ মননশীল সাহিত্যধারার অবতারণা করেছেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সে ধারার উত্তর-সাধক। তিনি নিজে হতে চেয়েছিলেন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। দুটি ছোটগল্প গ্রন্থ এবং তিনটি উপন্যাস রচনাও করেছিলেন; কিন্তু কথাসাহিত্যের প্রবল প্রবণতার বিপরীতে তার মধ্যে ছিল মননশীল সাহিত্য সৃষ্টির এক গভীরতর ভাবানুভূতি ও সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের কাছে দায়বোধের তাড়না। সে কারণে এ নবতিপর বয়সে এ পর্যন্ত প্রকাশিত ১১৪টি গ্রন্থের মধ্যে ১০৯টি মননশীল ধারার সাহিত্য গ্রন্থ। মূলত তার সব গ্রন্থই ব্যক্তির নিবিড় অনুরাগের সংরাগে রঞ্জিত। মননশীল সাহিত্যের মন্ময়তার অতল তন্ময়তায় বিভোর তার প্রতিটি সাহিত্যকর্ম। ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্র ও সমাজে নানা অনুষঙ্গ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, ব্যক্তি ইত্যাদি যে বিষয়ে তিনি লিখুন না কেন, তার প্রতিটি রচনা শেষবিচারে মননশীল সাহিত্যরূপে শিল্পশ্রীমণ্ডিত হয়েছে। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থী এবং ছাত্রছাত্রী-নন্দিত শিক্ষক । প্রায় ৭০ বছর তার শিক্ষকতার বয়স। কিন্তু শিক্ষকতার বৃত্তে তিনি কখনো নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন আদর্শ শিক্ষকের সবটুকু দায়িত্ব ও কর্তব্য তিনি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। জীবনব্যাপী জ্ঞানার্জন, অর্জিত সেই জ্ঞান শিক্ষার্থী ও অনুরাগী শিষ্যদের মধ্যে বিতরণ, তাদের ভেতর সুপ্ত প্রতিভার জাগরণ এবং উৎসাহ ও প্রণোদনাদানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষকের মর্যাদায় আসীন করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কেবল সাহিত্যের মধ্যে তিনি তার মননচর্চা সীমাবদ্ধ রাখেননি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, দর্শন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ইত্যাদি বিষয়ও তার সমান আগ্রহ ছিল এবং সবকিছুকেই তিনি তার মননের মাধুর্যে মোহিত-মুগ্ধতার রেশ সন্নিহিত করেছেন। নিজের অন্তরস্থিত স্নিগ্ধতার জাদুস্পর্শে তার সব সৃষ্টিকর্ম শেষাবধি মননশীল সাহিত্যে পরিগ্রহ লাভ করেছে। 

বিলেতে অধ্যয়নকালে তিনি সাম্যবাদী দর্শনের অনুরক্ত হন। সেই থেকে তিনি পুঁজিবাদের ঘোরতর বিরোধী। তাই রাষ্ট্র এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি আজীবন পুঁজিবাদের অবসান কামনা করেছেন। শ্রেণি-সচেতন লেখক হিসেবে তিনি সে আলোকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ার, হেনরি ইবসেন, লেভ তলস্তয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, চিত্তরঞ্জন দাস, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিকদের নিরপেক্ষতার নিক্তিতে মূল্যায়ন করেছেন। তাদের কৃতিত্ব ও অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরতে তিনি ভুলে যাননি। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনে আস্থাশীল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সব সময় তার সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বের সঙ্গে দার্শনিক মতবাদকে প্রাধান্য দিয়েছেন। 

তিনি সাহিত্যকে সব সময় সমাজ-সম্পৃক্ত বিষয় বলে মনে করতেন। তাই তার সাহিত্যকর্মে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্র, ধর্ম, দর্শন সংস্কৃতি বারবার গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে। প্রচলিত সমাজবিরোধী প্রথার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে সব সময় তার কলম উচ্চকণ্ঠ থেকেছে। লোভলালসা ও পদপদবির মোহ তাকে কোনোদিন আকৃষ্ট করতে পারেনি। এ কারণে ওসমানী উদ্যানের গাছ কাটা বা আড়িয়ল বিলের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছেন। রাষ্ট্র ও শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণে তিনি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তবু দমে যাননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তবুও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। নিপীড়িতের এবং গণমানুষের সঙ্গে থেকেছেন, পাশে থেকেছেন। কখনো দমে যাননি। সমাজপতি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একজন লড়াকু সংগ্রামীর মতো তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে কখনো সংশয় বা দ্বিধাবোধ করেননি। এই নির্মোহতা ও অদম্য সাহস তাকে তার সময়ের দলকানা বুদ্ধিজীবীদের থেকে আলাদা উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনচর্চার অন্যতম একটি বিষয় ছিল সংস্কৃতি। স্বাধিকার, স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতিকে তিনি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখেছেন। তার স্থির বিশ্বাস ছিল যে, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আদর্শ সংস্কৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। তার মতে, ‘কোনো একটা বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয়, গোটা দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন চাই।’

তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে সরাসরি যোগ দেননি। বা কোনো দলের মতাদর্শ প্রচারেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। কিন্তু পুঁজিবাদের প্রতি তার ছিল যেমন গভীরতর অনাস্থা, এমনি সমাজতন্ত্রের প্রতি ভীষণতর আস্থা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছে ঠিকই: কিন্তু এখনো সে পুঁজিবাদের শাসন ছিন্ন করতে পারেনি। তার মতে, ‘পুঁজিবাদ শিক্ষিতদের বাংলা ভুলিয়ে ছাড়ছে, অশিক্ষিতদের বাংলা শিখতে দিচ্ছে না’। আপামর সব জনগণের সম্মিলিত প্রয়াস ও প্রতিরোধের মাধ্যমে তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন। তিনি জনগণের মুক্তির জন্য বারবার রাজনীতি ও সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বলেছেন। নিজে বেশ কয়েকটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অনবদ্য ও সৃষ্টিশীল পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। এসব কাজের মধ্যদিয়ে তিনি সবার মধ্যে ঐকতান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। সমাজ থেকে অনাচার, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষণ বিদূরিত করতে চেয়েছেন। বলেছেন নানা জীর্ণতায় বিদীর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের কথা, জাতীয়তাবাদের সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতার কথা।

যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবন ও সাহিত্যচর্চার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে এবং নানা প্রমাণক উপস্থাপন করে তিনি মানুষের মুক্তি, বিশেষ করে নিপীড়িত জনগণের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। সমাজ এবং রাষ্ট্রের শৃঙ্খল থেকে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি সামাজিক বিপ্লবের কথা গুরুত্বসহকারে বারবার তুলে ধরেছেন। এভাবে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে মননশীলতার জাদুস্পর্শে তিনি নিগৃহীত ও নিপীড়িত গণমানুষের জনপ্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছেন। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মননশীল সাহিত্যচর্চার প্রধান অনুষঙ্গ হলো তার নিজস্ব ভাষাশৈলী। বলনে বা লেখনে বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দরাজি ব্যবহারে তিনি সদা অভ্যস্ত রয়েছেন। তাই সব সময় তিনি প্রমিত বাংলা বানান ও ভাষারীতি অনুসরণ করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তার লেখার মধ্যে ইংরেজি বা বিদেশি শব্দের আধিক্য নেই। সংস্কৃতি শব্দ ব্যবহারেরও বাহুল্যতা নেই। সরল, সহজ এবং নিরালম্ব তার লেখনিশৈলী। বিষয় অনুযায়ী তিনি যথাশব্দ ব্যবহার করেন। পরিমিতি বোধ তার ভাষাশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সব সময় তিনি দীর্ঘ বাক্য ব্যবহারে বিরত থেকেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি অলংকার ব্যবহারে মিতব্যয়ী ছিলেন। শব্দ নির্বাচন, ব্যবহার এবং বাক্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব বোধ ও বিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। উত্তম পুরুষ রীতিতে তিনি যে গদ্য রচনা করেছেন, তা পাঠ করতে করতে কৌতূহলী পাঠকের মন মন্ময় ভাবনার তন্ময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ছোটগল্পের মতো শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার ব্যঞ্জনা ব্যাপিত হতে থাকায় পাঠককে এক অভূতপূর্ব মোহময়তার মূর্ছনায় আবিষ্ট করে রাখে। তাই জটিল, সরল কিংবা গুরুগম্ভীর, যে বিষয়েরই তিনি অবতারণা করেন না কেন, তার গভীরে গল্প বলার মতো একটি নিজস্ব ভঙ্গি নিহিত থাকায় তার লেখায় বা বলার কথায় পাঠকেরও একান্ত নিজস্ব বিষয় বলে মনে হয়। পাঠক ও লেখকের মধ্যে একান্ত নিবিড়তা সৃষ্টি, একান্ত সংযোগ সাধন, পাঠক ও লেখকের মধ্যে এই যে যোগাযোগ, নিবিড়তা তৈরি করা সিরাজুল ইসলামের কুশলী রচনার রীতি অন্যতম ব্যতিক্রমী ও নিজস্ব অনুষঙ্গ। এভাবে একজন স্রষ্টা ও শিল্পীর মতো স্বতন্ত্র ভাষাশৈলী তৈরি করে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব ভাষারীতি উপহার দিয়েছেন। 

বস্তুত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজস্ব মনন, মেধা, গবেষণা, প্রজ্ঞা ও অধিত জ্ঞানের গৌরব গাঁথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ‘সিক স্যার’ থেকে জাতির শিক্ষক, নিরপেক্ষ শীর্ষ বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয় বিবেকে নিজেকে উন্নীত করেছেন। সেই সঙ্গে মননশীল চিন্তাচেতনায়-খরাগ্রস্ত বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে মননশীলতার ঋজু-নৈপুণ্যে ও এক অভাবিত মহিমামাধুর্যে ভরিয়ে দিয়েছেন।

লেখক: শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক

ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে বাংলাদেশের রং

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে বাংলাদেশের রং
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাড়ি জমানো মানুষের গল্পগুলো সাধারণত সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নপূরণের। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জীবনও তেমনই এক অনুপ্রেরণার কাহিনি, যেখানে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে মিশে আছে মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখার এক অবিচল প্রত্যয়।

বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও ব্যয়বহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় জীবন সহজ নয়। প্রতিদিনের প্রতিযোগিতা, কর্মব্যস্ততা এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যেও বাংলাদেশিরা তাদের মেধা, দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য আজ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও গর্বের বিষয়।
তবে সাফল্যের এই গল্পের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নির্ঘুম রাত, পরিবারের জন্য ত্যাগ এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন সংগ্রাম। অনেকেই শূন্য থেকে শুরু করেছেন, কিন্তু হার মানেননি। নিজেদের পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন যে স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে দূর দেশের মাটিতেও সাফল্যের বীজ বপন করা যায়।

সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, প্রবাসের হাজারও ব্যস্ততার মাঝেও বাংলাদেশিরা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভুলে যাননি। পহেলা বৈশাখের রঙিন আয়োজন, একুশের চেতনায় ভাষাশহিদদের স্মরণ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উদযাপন—সবকিছুতেই যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশ খুঁজে পাওয়া যায়। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
ক্যালিফোর্নিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো মানবিকতা। কেউ অসুস্থ হলে, কোনো পরিবার বিপদে পড়লে কিংবা দেশে কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে তারা একসঙ্গে এগিয়ে আসেন। সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এই চর্চা প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, হৃদয়ের টান কখনো কমে না।

প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম আজ দুই সংস্কৃতির এক অনন্য সেতুবন্ধ। তারা যেমন আমেরিকার আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তেমনি পরিবার থেকে শিখছে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। এই প্রজন্মই ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আরও দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তৃত আকাশের নিচে হাজারও বাংলাদেশি পরিবার আজ স্বপ্ন বুনছে, সাফল্যের গল্প লিখছে এবং একই সঙ্গে বুকে ধারণ করে আছে লাল-সবুজের পতাকা। তাদের অর্জন, তাদের সংগ্রাম এবং তাদের মানবিক মূল্যবোধ শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের নয়, সমগ্র জাতির জন্য গর্বের বিষয়।
দূর দেশে থেকেও যারা বাংলাদেশকে হৃদয়ে লালন করেন, ক্যালিফোর্নিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটি তাদেরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবনগাথা আমাদের শেখায়—শিকড়কে ভুলে না গিয়ে বিশ্বনাগরিক হওয়াই প্রকৃত সাফল্য।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের বাজেট ২০২৬-২০২৭: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ প্রেক্ষাপটে বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহ। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে কর কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই শুধু ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা নয়, উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

বেসরকারি খাত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়া বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

একটি বাজেটের সাফল্য কেবল বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটকে হতে হবে বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
প্রযুক্তির অপচ্ছায়া সড়কে ‘এআই ক্যামেরা’ ও অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাষ্ট্র যখন আধুনিকতার মহাসড়কে পা বাড়ায়, তখন তার নাগরিকরা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তিতে ভোগেন। আমরা ধরে নিই, প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের জীবনকে আরও শৃঙ্খলিত, স্বচ্ছ এবং নিরাপদ করবে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’ সংযোজনের খবরটি যখন চাউর হলো, সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, মানবীয় দুর্নীতির অবসান এবং ঘুষ-বাণিজ্যের অবসান ঘটানোর জন্য এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু এই স্বস্তির আয়ুষ্কাল যে এতটা সংক্ষিপ্ত হবে, তা হয়তো রাষ্ট্র বা নাগরিক–কেউই ভাবেনি। বিজ্ঞানের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী, প্রযুক্তির যেমন আলো আছে, তেমনি রয়েছে এক অন্ধকার চোরাগলির অপচ্ছায়া। এআই ক্যামেরা চালু হওয়ার সংবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের এক বিশাল অংশের নাগরিকের মুঠোফোনে হানা দিতে শুরু করেছে এক অভিনব আপদ। ‘এআই ক্যামেরায় আপনার গাড়ির ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, এত টাকা জরিমানা নিম্নোক্ত লিংকে ক্লিক করে পরিশোধ করুন’ এমন বার্তা বা এসএমএস দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অত্যন্ত চতুর, সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন সাইবার অপরাধী চক্র। এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল রূপান্তর, ডেটা নিরাপত্তা এবং নাগরিক মনস্তত্ত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত। স্মিশিং: যখন আতঙ্কই অপরাধীদের প্রধান অস্ত্র সাইবার নিরাপত্তার পরিভাষায় এই অপরাধটিকে বলা হয় ‘স্মিশিং’ (Smishing), যা মূলত এসএমএস এবং ফিশিংয়ের একটি মারাত্মক মেলবন্ধন। অপরাধীরা এখানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করছে না, তারা মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করছে।

আমাদের সমাজে ‘মামলা’ বা ‘আইনি জটিলতা’ শব্দ দুটি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের তীব্র ভীতি ও অস্বস্তি তৈরি করে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী যখন হঠাৎ মেসেজ পান যে তার অজান্তে তার গাড়ির নামে মামলা হয়েছে এবং দ্রুত টাকা না দিলে লাইসেন্স বাতিল বা বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা সাময়িকভাবে লোপ পায়। অপরাধীরা ঠিক এই ‘আতঙ্কের মুহূর্তটি’ ব্যবহার করে। তারা মেসেজের নিচে যে শর্ট লিংক বা ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়ের লিংক যুক্ত করে দেয়, আতঙ্কিত নাগরিক নিজের অজান্তেই সেখানে ক্লিক করেন। সেখানে গিয়ে বিকাশ, রকেট, নগদ বা কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে যখনই তিনি টাকা স্থানান্তর করেন, তখনই তিনি পাতানো ফাঁদে পা দেন। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জরিমানার টাকা কেটেই ক্ষান্ত হয় না এই চক্রটি; ওটিপি বা পিন হাতিয়ে নিয়ে পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দেওয়ার নজিরও মিলছে। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিখুঁত ‘ডিজিটাল ডাকাতি’।

ডেটাবেজের শুভঙ্করের ফাঁক: তথ্য পাচার হচ্ছে কোথায়? এই পুরো অপরাধ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার এবং রহস্যময় দিকটি হলো–তথ্যপ্রাপ্তি। একটি অপরাধী চক্র কীভাবে জানল যে নির্দিষ্ট একটি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে অমুক ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিবন্ধিত রয়েছে? এখানে দুটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণ সামনে আসে, যা রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের নিরাপত্তাহীনতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নাগরিকদের যে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্যের (মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির চেসিস নম্বর) ডেটাবেজ রয়েছে, তা কি আসলেই নিরাপদ? অতীতেও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের ডেটা ফাঁসের খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। এই ক্ষেত্রেও কি কোনো অসাধু চক্র বা হ্যাকার গোষ্ঠী সেই তথ্য অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। নির্বিচার আক্রমণ (Brute Force/Random Attack): যদি ডেটা ফাঁস না-ও হয়ে থাকে, তবে অপরাধীরা হয়তো লটারির মতো নির্বিচারে হাজার হাজার নম্বরে এই বার্তা পাঠাচ্ছে। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ মোটরসাইকেল ও গাড়ি রয়েছে। ফলে প্রতি হাজার মেসেজের মধ্যে যদি ৫০ জন গাড়ির মালিকও এই ফাঁদে পা দেন, তবেই অপরাধীদের উদ্দেশ্য সফল। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের এই উন্মুক্ততা প্রমাণ করে যে, আমরা ‘স্মার্ট’ হওয়ার স্লোগান দিলেও আমাদের ডিজিটাল দেয়ালগুলো কতটা নড়বড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা এবং সামাজিক সচেতনতার খরা ডিজিটাল অপরাধের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতাও কম দায়ী নয়। যখন একটি নতুন প্রযুক্তি (যেমন এআই ক্যামেরা) সড়ক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন তার অনুষঙ্গ হিসেবে নাগরিকদের সচেতন করার যে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন ছিল, তা উধাও। বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ থেকে কেন শুরুতেই জোর গলায় বলা হলো না যে–‘সরকারি কোনো মামলার মেসেজ কোনো সাধারণ ১১ ডিজিটের মোবাইল নম্বর থেকে যাবে না এবং কোনো মেসেজে সরাসরি পেমেন্ট লিংক দেওয়া থাকবে না?’ এই স্পষ্ট বার্তার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতারক আর সরকারের পার্থক্য করতে পারছে না। এর পাশাপাশি আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রযুক্তিগত শিক্ষার হার অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখেছি, ইন্টারনেট ডেটা কিনতে শিখেছি, কিন্তু ‘সাইবার হাইজিন’ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা সচেতনতা শিখিনি।

একটি অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে যে ডোমেইন নেম চেক করতে হয় (যেমন .com -এর জায়গায় .xyy বা .top থাকা মানেই সেটি ভুয়া), এই সাধারণ জ্ঞানটুকু দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই। অপরাধীরা নাগরিকদের এই সরলতা বা অজ্ঞতারই চূড়ান্ত ফায়দা তুলছে। রাষ্ট্রের স্মার্টনেস বনাম অপরাধীদের চাতুর্য আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন এই ধরনের সাইবার ক্রাইম পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর জনগণের আস্থা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকরা প্রযুক্তির যেকোনো নতুন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবেন। আজ যদি এআই ক্যামেরার নাম করে টাকা ডাকাতি হয়, তবে কাল হয়তো ই-পাসপোর্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা স্মার্ট এনআইডি কার্ডের নাম করেও একই কাজ হবে। অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের চাতুর্য এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটাচ্ছে, অথচ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাইবার ইউনিটগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এই চক্রগুলোকে শুধু একটি নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর বা বিকাশ অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করে ধরা সম্ভব নয়, কারণ তারা ভুয়া বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এদের ধরতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আন্তর্জাতিক মানের সাইবার ফরেনসিক ল্যাব। উত্তরণের পথ: তিন স্তরের প্রতিরোধ এই সর্বগ্রাসী ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক–এই তিন পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। প্রথমত, কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনকে অনতিবিলম্বে এই চক্রের আইপি অ্যাড্রেস এবং ভুয়া পেমেন্ট গেটওয়েগুলো চিহ্নিত করে ডোমেইনগুলো ব্লক করতে হবে।

এই চক্রের মূলহোতাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই সাহস না পায়। দ্বিতীয়ত, ডেটা অডিট ও তথ্য অধিকারের সুরক্ষা: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের ডেটাবেজ অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন আইটি টিম দ্বারা ‘সিকিউরিটি অডিট’ করা উচিত। নাগরিকদের তথ্য চুরির সঙ্গে যদি ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকেন, তবে তাকে কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, গণসচেতনতার মহাবিপ্লব: টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের প্রতিটি পেট্রল পাম্প ও ট্রাফিক সিগন্যালে বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, ট্রাফিক মামলার বৈধ মেসেজ কেবল নির্দিষ্ট ‘Masking’ (যেমন–ডিএমপি বা বিআরটিএ) নামেই আসবে এবং মামলার সত্যতা যাচাইয়ের একমাত্র স্থান হলো সরকারের নিজস্ব অফিশিয়াল পোর্টাল। শেষ কথা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরার ব্যবহার যুগের দাবি এবং একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর সুফল দেশের মানুষ পাক–সেটিই কাম্য। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে যদি একদল সাইবার অপরাধী সাধারণ মানুষের পকেট কাটার মহোৎসবে মেতে ওঠে এবং রাষ্ট্র যদি তা নির্বিকার চিত্তে চেয়ে চেয়ে দেখে, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য, শোষণের জন্য নয়। ডিজিটাল অপরাধীদের চেয়ে রাষ্ট্রকে সব সময় দুই কদম এগিয়ে থাকতে হবে। সরকার যদি দ্রুত এই ‘এআই ক্যামেরা’র ভুয়া মামলার প্রতারক চক্রকে দমনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ সাধারণ মানুষের কাছে এক মূর্তিমান অভিশাপ ও আতঙ্কের কারণ হয়েই থাকবে। আমরা একটি নিরাপদ সড়ক যেমন চাই, তেমনি একটি নিরাপদ এবং সাইবার-শত্রুমুক্ত ডিজিটাল পরিবেশও আমাদের নাগরিক অধিকার।

লেখক: শিক্ষার্থী ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
[email protected]