ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রয়াত বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের নামে আমন্ত্রণপত্র আধ্যাত্মিক ধনী হওয়ার সহজ সমীকরণ আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০০ জাতের আম নিয়ে মেলা শুরু পাহাড়, বন আর নীল জলের অপূর্ব মিলন ৪টি চলচ্চিত্র নিয়ে ‘সামার বাংলা হিট ফেস্ট’ তিন নাটকে প্রশংসিত হিমি পুশ-ইন সমস্যা সমাধানের দাবিতে সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের প্রবাসী নিহত তপ্ত গরমে পশুপাখির প্রতি সদয় হোন সিনচিয়াংয়ে সংস্কৃতি ও পর্যটন উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত সংঘাত নয়, হোক সম্প্রীতির উদযাপন কানসাসের দাবদাহে ‘কুলিং ভেস্টে’ অনুশীলন আর্জেন্টিনার চীনের ছাংছুনে অপটিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির বিপ্লব বাংলাদেশের বাজারে এল টেকনো স্পার্ক ৫০ প্রো খোকসায় ২০ বছর ধরে অচল কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, ভোগান্তিতে কৃষক-খামারি কেইনই ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা স্ট্রাইকার: লিনেকার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন, সংলাপের পরামর্শ জাতিসংঘের গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল পরিদর্শন করলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র নতুন অ্যান্ড্রয়েড ১৭ সংস্করণে গুগলের বড় চমক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সনদ পেল মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবি ব্যাংক পিএলসির ৪৪তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সহিংসতার স্বরূপ রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা! একটি জাতির অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র! ঝিনাইদহে ৩ দিনব্যাপী ফল মেলা শুরু ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা এবারের স্বপ্নবিলাসী বাজেট বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে: সংসদে আইনমন্ত্রী কাঁঠালকে কেন্দ্র করে বিরোধ, ছেলের মারধরে বাবার মৃত্যু সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
আবার জ্বলে ওঠো জার্মানি
অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর। ছবি: সংগৃহীত

ছোট্ট দেশ কুরাসাওকে ৭-১ গোলে পর্যুদস্ত করার পর জার্মানি ফুটবল দল নবীন প্রজন্মের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আসবেই তো। নবীনেরা ভালো খেলা আর গোলের বন্যা দেখতেই ভালোবাসে যে!

২০১৪-এ ফুটবল বিশ্বকাপ জয় করে জার্মানি। এর পর দুটো বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে তারা মোটেই ভালো করেনি। ফলে গত বারো বছর বিশ্বব্যাপী তেমন আলোচনাতেই ছিল না দলটি। ২০১৪ থেকে ২০২৬-এ একযুগে যে নবীন প্রজন্ম উঠে এসেছে, তাদের কাছে জার্মানি প্রায় অচেনা। এই অচেনার আর একটি কারণ হলো, জার্মানি কথিত 'স্টার' নির্ভর দল নয়, 'টোটাল টিম' নির্ভর। 'স্টার' খেলোয়াড় দেখে লোকে যে দল চিনবে, এটাও হয়নি। জার্মানি 'স্টার' নির্ভর দল না হওয়ায় কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ছয়জনে সাত গোল দিয়েছে। অর্থাৎ যে-কেউ গোল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এই দলে। তারপরও দল এ পর্যন্ত ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার, গের্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউস, মিরোস্লাভ ক্লোসের মতো বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড় গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাজারমুখী প্রচারের আলোয় তারা পেলে, দিয়াগো ম্যারাডোনা, জিনেদিন পূর্বজার্মানির প্রতি। কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের দল নেই।

আমি যখন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখি, তখন পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার ভালো লেগে যায়। দারুণ খেলেও সেবার পশ্চিম জার্মানি ইতালির কাছে ৩-১ গোলে বিশ্বকাপ ট্রফি হারায়। আসলে ইতালির পাওলো রসি নামের এক স্টাইকারের দক্ষতার কাছে হার মানে জার্মানি। রসি গোল্ডেনবুট পেয়েছিলেন। এই হার আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবু পশ্চিম জার্মানির খেলা আমার মন কাড়ে। আমাদের বাড়ির কেউ ফুটবলের সমর্থক ছিল না। খেলাধুলোর চেয়ে শিক্ষাসংস্কৃতির দিকেই ঝোঁক দেখেছি বাবার। তাই খেলাধুলোয় পরিবারের কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, এটা বলা যাবে না। নিজের কাছে যা ভালো মনে হয়েছে, সেটাই। আমাদের ছেলেবেলায় ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলই ছিল জনপ্রিয়। আমি নিজেও বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলেছি অনেক, ক্রিকেট খেলিনি। তাই ফুটবল ভালোবেসেছি গভীরভাবে। আমি আবাহনীর কী যে ভক্ত, তার প্রমাণ আছে এখনো। সালাউদ্দিন, আশিস, আসলাম, চনুনু, এমিলিদের ভিউকার্ডগুলো দেখালেই বোঝা যাবে! ছেলেবেলায় খেলার সময় আমাকে দলে নেওয়ার আগ্রহ থাকত বন্ধুদের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বন্ধুরা শরীরের গড়ন অনুসারে তিনটি দল করে: মোটা, চিকন, মাঝারি। তাদের মধ্যে ফুটবল খেলা হয়েছিল। সেই খেলায় মাঝারি দলের হয়ে গোল করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে- দলের সমর্থকরা আর আমরা পশ্চিম জার্মানির সমর্থকরা মিনতি স্টুডিও এলাকায় আলাদা করে কিন্তু উৎসবমুখরতায় খেলা উপভোগ করেছি; কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছিল না। মাইক বাঁধা হয়েছিল। মাইকে কথা বলার অভ্যাস অনেক আগে থেকেই। সেবার মাইক আমার হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল। খেলার আগে ও পরে মাইকে আমি কথা বলেছি দল সম্পর্কে। সে খেলাতে পশ্চিম জার্মানি আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যারাডোনা সেবারও খেলেছেন, তবে ঈশ্বরের হাত তার পক্ষে ছিল না। পশ্চিম জার্মানির আন্দ্রেস ব্রেহ্মে গোল করেন। আমরা সমর্থকরা খেলোয়াড়ের চেয়ে দলকেই পছন্দ করি, মনে রাখি।

এর পর পূর্ব ও পশ্চিম এক হওয়ার কারণে দলটি জার্মানি বলে পরিচিত হয়। দুটি ভিন্ন মতের দেশ এক দেশে পরিণত হতে সময় নেয়। খেলাতেও এর প্রভাব পড়ে। তাই ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি যথাক্রমে ৫ম ও ৭ম হয়। কিন্তু এর পরেই ঘুরে দাঁড়ায় দেশটি। ফুটবলের জন্য পরিকল্পনা করে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার রানার্সআপ হয়। ২০০৬ আর ২০১০ সালেও সেমিফাইনালে ওঠে এবং দুবারই ৩য় হয়। ২০১৪ সালে হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এরপর ২০১৮-এর বিশ্বকাপে জার্মানি খুব খারাপ করে। বলা হয়, দল থেকে একঝাঁক খেলোয়াড় অবসরে যাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। ২০১৪-তে তারা সাবেক চারটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। বিষয়টি অবজ্ঞা করার মতো নয়।

জার্মানির ২০২৬ সালের একটি খেলা দেখে মনে হলো, আবার দলটি আলোচনায় আসবে। দলের অধিনায়ক ও অন্যতম অভিজ্ঞ খেলোয়াড় জোওয়া কিমিখের ক্ষিপ্রতা ও মাঠের ডানপ্রান্ত থেকে তিরবেগে এগিয়ে আসার ক্ষমতা অসাধারণ। তাকে দলের 'নিউক্লিয়াস' বলা হচ্ছে। জাদুকরী ড্রিবলিঙের স্রষ্টা জামাল মুসিয়ালা, গোল মেকার ও স্যুটারখ্যাত ফ্লোরিয়ান ভার্টজ, নিখুঁত হেডের কারিগর ও 'ক্লোসা দ্য নিউবার্থ'খ্যাত কাই হাভার্টজ, 'বার্লিন ওয়াল নিউ'খ্যাত ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার যদি ঠিকঠাক জ্বলে ওঠেন, তাহলে খেলা জার্মানির দিকে ঘুরে যাবে। অবশ্য, গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারের দায়িত্ব একটু বেশিই। জার্মানি দল গোল খেতেও ভালোবাসে। যেমন, ব্রাজিল ও কুরাসাও- দুবারই হলো ৭-১। ঐ একটি গোল জার্মানির 'গোলটেস্টে'র উদাহরণ। এর আগে তুরস্ককে ৭-২, অস্ট্রিয়াকে ৬-১ গোলে হারানোর ইতিহাসও আছে। নয়ার বা ব্যাক-আপ গোলরক্ষক ওলিভার বাউম্যানের দায়িত্ব এখানে অনেক বেশি: 'গোল টেস্ট' করা যাবে না। আইভরিকোস্ট ফুটবল দল কম শক্ত নয়।

জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থকেরা জিদান, ক্রিস্টিয়ানো রোনালডো, লিওনেল মেসি প্রমুখের কাছাকাছি আসতে পারেননি। আমি জার্মানি ফুটবল দলের সমর্থক, ছোট থেকেই। বুঝতে যখন শিখেছি, তখনই। এর দুটো কারণ। প্রথমত, দলের 'টিম স্পিরিট', দ্বিতীয়ত, বিশ্বসভ্যতায় জার্মানদের অবদান। আমার পছন্দের দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। ফ্রান্স, গ্রিস, ইংল্যান্ড ইত্যাদির কথাও বলতে পারেন। কিন্তু আমি যখন জার্মানিকে সমর্থন করি, তখন কার্ল মার্কস, আলবার্ট আইনস্টাইন, জোহানেস গুটেনবার্গ, ইমানুয়েল কান্ট, ফন গ্যেটে, ভান বেটোফেন প্রমুখের কথাই মনে এসেছিল। অন্যদের মতো তারাও আমার স্বপ্ন জগতের নায়ক ছিলেন। বিশ্বসভ্যতাকে কতটা এগিয়ে দিয়েছিলেন এই মহাত্মাগণ, অনুসন্ধানী মাত্রেই জানেন। সে যাহোক, প্রথম কারণটিই ফুটবল দলের মূলশক্তি : টোটাল টিম স্পিরিটে পাওয়ার ফুটবল খেলা। এখন আমি এটাই উপভোগ করি।

১৯৮২ সালে আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। বাড়ির পাশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে গিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখেছি। সাদাকালো সেট। বড়রা চেয়ারে বসে, আমরা ছোটোরা দাঁড়িয়ে। জায়গা নেই, তবু খেলা দেখব! আমার পক্ষপাত সমাজতান্ত্রিক; ফুটবল 'সংঘ খেলা'; ক্রিকেট ততটা নয়। ক্রিকেটে একজনই দলকে জিতিয়ে দিতে পারে, ফুটবলে তা খুব কঠিন, অনেক সময় অসম্ভবও। জার্মানি সংঘবদ্ধভাবে ফুটবল খেলে। ১৯৮২-এর পর, ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ। তখন ২০ বা ২৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল আর ফিলিপস সাদাকালো টেলিভিশন মধ্যবিত্তের ঘরে প্রচুর এসে গেছে, আমাদেরও। সে কারণে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ-এর আগের যে কোনো বারের চেয়ে বেশিসংখ্যক বাঙালিরা দেখে। সে বারের খেলাতেও ভালো খেলল পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু তারা ফাইনালে ম্যারাডোনার কৌশলের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়। ম্যারাডোনা ঈশ্বরকে কৃতিত্ব দিলেন, আর আমি পর পর দুবার ফাইনালে ওঠা জার্মানির 'পরম ভক্ত' হয়ে গেলাম। সবাই তখন ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনা বলে চিৎকার করে; আমি জার্মানির জন্য কষ্ট পাই। দেখলাম, বন্ধুরা দলে দলে আর্জেন্টিনা হয়ে গেল। অনেকে ব্রাজিলের খেলারও হলো ভক্ত। আমি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালাম না।

এরপর চলে এল ১৯৯০-এর বিশ্বকাপ। তখন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রিত হবে বলে ঘোষণা এসেছে। বিশ্বরাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তনও। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হবার পালা। মনে আছে, ফাইনালের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, কোনো কারণে বাড়িতে অর্থাৎ শেরপুরে। শেরপুরের নিউ মার্কেট এলাকা তখন বেশ পরিচ্ছন্ন চত্বর। চত্বরের প্রেসক্লাব এলাকায় আর্জেন্টিনা এমনটি হয়। ২০২২ সালেও স্পেনের সঙ্গে গোল-ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় জার্মানি গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারে না। এবার, ২০২৬ সালে শুরুটাই করেছে ৭ গোল দিয়ে, দেখা যাক।

বিশ্বকাপ ফুটবলে কৃতিত্বের ধারাবাহিকতায় জার্মানি দল এগিয়ে। নানা কারণে তারা দুটো বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। বাকি বিশ্বকাপে চারবার চ্যাম্পিয়ন, চারবার রানার্সআপ, চারবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। এই তেরো বার পজিশনে থাকা আর কোনো দল কি বিশ্বে আছে? ব্রাজিলের কথাই ধরি: তারা সবগুলো বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, দুবার ৪র্থ হয়েছে। আর্জেন্টিনার রেকর্ড হলো: তারা তিনবার চ্যাম্পিয়ন, তিনবার রানার্সআপ, একবারও ৩য় বা ৪র্থ হয়নি। ইতালি চারবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, একবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে। ফ্রান্স দুবার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, দুবার ৩য়, একবার ৪র্থ হয়েছে।

আমি সব দিক থেকেই দেখেছি, জার্মানি ভালো খেলে, তারা 'ওয়ান ম্যান শো' দল নয়, 'পাওয়ার ফুটবল' তাদের অন্বিষ্ট, তারা টিমকে গুরুত্ব দেয় ব্যক্তিকে নয়। আর সম্প্রতি তারা 'পাওয়ার ফুটবল'-এর সঙ্গে ল্যাটিনের পাসজাদুকে যুক্ত করেছে; যার ফলও ফলতে শুরুর অপেক্ষায় আছি, আবার জ্বলে উঠবে আমাদের প্রিয় দল। অবশেষে যদি তারা ফাইনাল খেলে তাহলে তো: 'ওয়াও!'

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সহিংসতার স্বরূপ

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও সহিংসতার স্বরূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশে গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তির যে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে, তা আমাদের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। পকেটে থাকা একটি স্মার্টফোন আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা শিক্ষা, অর্থনীতি, বিনোদন এবং আত্মপ্রকাশের এক অবারিত দিগন্ত। এই ডিজিটাল রূপান্তর বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছিল। ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্সের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ নারীদের ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করেছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত অন্ধকার ও কণ্টকাকীর্ণ। যে ইন্টারনেট নারীর মুক্তির পথ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য এক নতুন বন্দিশালা বা আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন হয়রানি মূলত ক্ষমতার এক নতুন ও বিকৃত রূপ। প্রথাগত সমাজে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বিদ্যমান ছিল, ডিজিটাল যুগে তারই আধুনিক সংস্করণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ইন্টারনেটের এই বিশাল প্রান্তরে যখন একজন নারী সরব হন, তখন তা অনেক সময় সমাজের একটি নির্দিষ্ট রক্ষণশীল গোষ্ঠীর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য সাহস’ হিসেবে গণ্য হয়। প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই গোষ্ঠী নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালায়। এই হয়রানির রূপ বিচিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি পোস্ট করলে সেখানে অশ্লীল মন্তব্য করা, ইনবক্সে অশালীন প্রস্তাব পাঠানো কিংবা নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ চর্চা করা এখনকার ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয় বা ফেক আইডি ব্যবহার করে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানো হয়।

আমাদের সমাজে নারীর ‘সম্মান’ ও ‘নৈতিকতা’ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় এবং এই সম্মান প্রায়ই তার ব্যক্তিগত আচরণের চেয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বেশি নির্ভর করে। অনলাইন আক্রমণকারীরা এই সামাজিক দুর্বলতাকেই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, একজন নারীর চরিত্র নিয়ে কোনো গুজব ছড়াতে পারলে বা তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের কোনো বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে পারলে তাকে সহজেই কাবু করা সম্ভব। এই ‘সম্মান নষ্ট’ হওয়ার ভয় নারীর জন্য অফলাইন জীবনের চেয়েও অনেক সময় অনলাইনে বেশি ভীতিপ্রদ হয়ে ওঠে। কারণ ভার্চুয়াল জগতের এই কলঙ্ক নিমেষেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা নারীর পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং কর্মক্ষেত্রে তার অবস্থানকে চরম সংকটে ফেলে দেয়।

অনলাইন সহিংসতার এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সাইবার বুলিং বা হয়রানির শিকার নারীরা তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং হতাশায় নিমজ্জিত হন। অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসা ঘৃণ্য মন্তব্য বা হুমকি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তাদের কাছে অনলাইন জগৎটিই এখনকার সময়ে সামাজিকীকরণের প্রধান মাধ্যম। সেখানে যখন তারা অপমানিত হয়, তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়ে পড়ে যায়। এই মানসিক ক্ষতগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না বলে সমাজ একে গুরুত্ব দিতে চায় না, কিন্তু ভেতরের এই রক্তক্ষরণ একজন নারীকে তিল তিল করে ধ্বংস করে দেয়।

এই নিরবচ্ছিন্ন হয়রানির একটি নেতিবাচক সামাজিক ফল হলো ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতা। অনেক নারী অনলাইনে আক্রমণের শিকার হওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় নীরব হয়ে যান। তারা নিজেদের ছবি পোস্ট করা বন্ধ করে দেন, কোনো বিতর্কিত বা সামাজিক বিষয়ে মতামত দিতে ভয় পান এবং ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি মনে হতে পারে যে তারা ঝামেলা এড়িয়ে চলছেন, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বর্তমান যুগে অনলাইন উপস্থিতি কেবল অবসরের বিষয় নয়; এটি দক্ষতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার গঠনের প্রধান মাধ্যম। নারীরা যখন ভয়ে এই প্লাটফর্মগুলো ছেড়ে চলে যান, তখন তারা বিশ্বায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনলাইন হয়রানির প্রভাব বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল বাধা। বর্তমানে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাদের এই ব্যবসায়িক সাফল্যের মূলে রয়েছে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, একদল সাইবার অপরাধী বা অসাধু মানুষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব নারী উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পেজে অশালীন মন্তব্য করে বা ভুয়া রিভিউ দিয়ে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু নষ্ট করার চেষ্টা করে। অনেকে আবার ইনবক্সে পণ্যের অর্ডার দেওয়ার নাম করে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করে। এ ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী তাদের কষ্টার্জিত ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

একইভাবে সাংবাদিকতা, সাহিত্য বা শিল্পকলা বিভাগে কাজ করা নারীরাও অনলাইনে ব্যাপক আক্রমণের শিকার হন। তাদের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা না করে আক্রমণ করা হয় তাদের লিঙ্গ পরিচয়কে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণও অনলাইন হয়রানির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব নারী মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার বা রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরব হন, তাদের দমানোর জন্য অনলাইন প্লাটফর্মকে যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে ‘ট্রোলিং’ করা হয়, এমনকি ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। যখন একজন প্রভাবশালী নারীকে অনলাইনে হেনস্তা করা হয়, তখন তা সাধারণ নারীদের মনেও ভীতির সঞ্চার করে।

এত বিশাল পরিসরে সহিংসতা চললেও বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। অধিকাংশ নারীই অভিযোগ জানাতে চান না। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একজন ভুক্তভোগী নারীকে প্রায়ই দ্বিতীয়বার লাঞ্ছিত হতে হয়। পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিজের সঙ্গে ঘটা অশালীন ঘটনার বর্ণনা দেওয়া অনেক নারীর জন্য পাহাড়সম কষ্টের বিষয়। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জেন্ডার সংবেদনশীল নন। তারা উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই দোষারোপ করেন যে তিনি কেন এমন ছবি দিলেন বা কেন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বললেন।

এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কেবল কঠোর আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে অনলাইন সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা আমাদের সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারি। অনলাইন হয়রানিকে একটি ‘লঘু’ বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে যে ইন্টারনেটে কাউকে গালি দেওয়া বা কারো ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ করা কেবল মজা নয়, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে ‘সম্মতি’ বা কনসেন্ট এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল শিক্ষা এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। নারীদের জানতে হবে কীভাবে অনলাইনে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং হয়রানির শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা নিতে হয়। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও আধুনিক ও জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও এ ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীরা নির্ভয়ে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া মানে কেবল নারীকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি সভ্য, মানবিক এবং সমঅধিকারের সমাজ নিশ্চিত করা। এই অদৃশ্য শিকল ভাঙার লড়াইয়ে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি–প্রত্যেককেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক: সমাজবিজ্ঞান ও উন্নয়নবিষয়ক কলাম লেখক ও গবেষক।

রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা! একটি জাতির অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র!

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা!
একটি জাতির অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছে দেশ। নির্বাক জাতি, লুপ্ত মানবতা, স্তব্ধ বিবেক, লজ্জিত জাতি! কী নির্মম, কী নৃশংস, কী বীভৎস!  ক্ষোভ, শোক আর বিক্ষোভে আগুন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ধরণী দ্বিধা হও! কোনো ঘরে আর কন্যাসন্তান জন্ম না নিক। কন্যা-জায়া-জননী কোনো মায়াভরা শব্দের মানুষ আর না থাকুক...!’। আট বছরের শিশুও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়, তারা নরপিশাচ। এসব নৃশংসতার মাত্রা নির্মূল করতে না পারলে জাতি আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। ঘটনার পর থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামিসা হত্যার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও অভিভাবকরা সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এ ধরনের অপরাধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের নিজের সন্তান আছে, তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ আরও বেশি কাজ করে।

গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পান। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। পুলিশ জানায়, মূল ঘাতক স্বামীকে পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দিতেই ভেতর থেকে ফ্ল্যাটের দরজা খোলেননি স্ত্রী স্বপ্না। স্বামী জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা প্রথমে মূল আসামির স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে। পরে স্বপ্নার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছোরা এবং শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট–এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে। ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর। ২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। শিশু–যাদের হাসিতে ভরে ওঠার কথা প্রতিটি ঘর, যাদের হাতে থাকার কথা রঙিন খাতা, খেলনা আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুরাই এখন একের পর এক সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি–এসব কারণেই এমন ভয়াবহ অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়ছে। শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়–এর পেছনে আছে একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন এবং এক মায়ের বুকভরা কান্না। এ ব্যাপারে আমরা প্রতিনিয়তই সংবাদপত্রে লিখছি, কিন্তু পড়ারও মানুষ নেই, প্রতিকারেরও মানুষ নেই। 

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিয়িতই ঘটেই চলেছে দেশে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। দেশে নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন ও ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরেবাইরে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন কন্যাশিশুসহ সব বয়সী নারী। নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বিবেচনায় সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় দেশবাসী আতঙ্কগ্রস্ত। এ পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য। নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন ও ধর্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার অন্তরায়। নারীর প্রতি এ ধরনের আচরণ দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নাটোরে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছে সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস। উদ্বেগজনকভাবে, শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০টি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোনোটিই যথেষ্ট নিরাপদ নয়। পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল–গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘনঘন ঘটছে যে বেশির ভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না। অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকসংকটে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি  সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সেই উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে–গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ। একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের এক একটি ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও–সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 

ধর্ষণ গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুক না কেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ-জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিকসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এ সংকট নিরসনে প্রবলভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সবারই। এ সামাজিক অবক্ষয় ও দুরাবস্থা উত্তরণে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি

বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

শিল্পকলার ইতিহাসতত্ত্বে (historiography) প্রায়শই ‘মিউজ’ বা ‘প্রেরণা-উৎস’ হিসেবে সরলীকৃত নারী মডেলের ভূমিকাকে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছে। এতে ইউরোপীয়-আমেরিকান এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট উত্তর-ঔপনিবেশিক যাত্রার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল চেতনাকে জাগ্রত করার একটি নিষ্ক্রিয় ও নির্বাক মাধ্যম হিসেবে অবদমিত রাখা হলেও, গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের নারী মডেল এক জটিল রূপান্তরের মধ্যদিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে তিনি ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের বস্তু থেকে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গ্রামীণ শ্রম এবং আদিবাসী সহনশীলতার এক জীবন্ত ও শারীরিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একটি বিগঠনবাদী (deconstructive) কাঠামোর মাধ্যমে এ গবেষণাটি খতিয়ে দেখেছে–কীভাবে বাংলাদেশের অগ্রগামী আধুনিকতাবাদী শিল্পী (যেমন: জয়নুল আবেদিন ও এস এম সুলতান) এবং আন্তঃদেশীয় ব্যক্তিত্বরা (যেমন: অমৃতা শেরগিল) শিল্পী-মডেল সম্পর্কের সক্রিয়/নিষ্ক্রিয়তার দ্বান্দ্বিকতাকে ভেঙেছেন কিংবা পুনর্নির্মাণ করেছেন। বেঙ্গল ডেল্টা বা গাঙ্গেয় বদ্বীপের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে মডেলের উপস্থিতিকে প্রাসঙ্গিককরণের মাধ্যমে একটি বিকল্প শিল্প ইতিহাসের পক্ষে যুক্তি দেয়; যা নারী মডেলকে কেবল একটি নামহীন কাঠামোগত উপাদান থেকে দৃশ্যমান আধুনিকতার এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল এজেন্টে পুনরধিষ্ঠিত করে।

‘মিউজ’ বা প্রেরণা-উৎসের মিথ বিগঠন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলধারার শিল্পের ইতিহাস সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে একটি কঠোর দ্বিমুখী অবস্থান বজায় রেখেছে। এটি মূলত সেই ‘একাকী প্রতিভাবান’ (solitary genius) শিল্পীর মিথ বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল, যিনি কোনো নিষ্ক্রিয় মাধ্যমের কাছ থেকে রূপ, আবেগ ও নান্দনিক সত্য আহরণ করেন। এই কাঠামোর মধ্যে নারী মডেল এক বিরোধপূর্ণ বা আপাতবৈপরীত্যময় (paradoxical) অবস্থানে থাকেন। তিনি ক্যানভাসজুড়ে সর্বত্র উপস্থিত, অথচ সম্পূর্ণ অদৃশ্য; তার শারীরিক অবয়ব ক্যানভাস শাসন করে, অথচ তার নিজস্ব পরিচয়, কর্তৃত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিক শিল্প ইতিহাস দীর্ঘকাল ধরে এই মুছে ফেলার প্রক্রিয়াকে ‘মিউজডম’ (musedom) নামে অভিহিত করে আসছে–যা নারীকে একটি নীরব প্রতীক বা আদর্শ পাত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যার একমাত্র কাজ পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ ও প্রকাশ করা।
তবে এই গতিশীলতাকে যখন পশ্চিমা রীতিনীতির বাইরে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের ভূ-রাজনীতি এবং বেঙ্গল ডেল্টার সুনির্দিষ্ট ইতিহাসে মূল্যায়ন করা হয়, তখন নারী মডেলের আর্থ-নান্দনিক ভূমিকায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যানভাসে নারীর শরীর কখনোই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রূপবাদী অ্যানাটমিচর্চা বা রোমান্টিক পারিবারিকতার প্রদর্শন ছিল না। বরং তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ট্রমা, উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী পুনর্জাগরণ, কৃষিভিত্তিক শ্রেণিসংগ্রাম এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচয় রাজনীতির মিলনমেলায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ঢাকার সমসাময়িক স্বাধীনতা-উত্তর শিল্প আন্দোলন পর্যন্ত, নারী মডেল একটি পরিবর্তনশীল ক্যানভাস হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে একটি জাতির উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রতিনিয়ত আলোচিত ও প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলার প্রেক্ষাপট: ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিকতা থেকে জাতীয় রূপক
বাংলাদেশে শিল্প মডেলের উত্থান বুঝতে হলে অবিভক্ত বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শিক্ষার ইতিহাস জানা প্রয়োজন। ১৮৫৪ সালে কলকাতায় ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলে জীবন্ত মডেল ব্যবহার করে লাইফ-স্টাডি ক্লাসসহ পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদের (academic realism) সূচনা হয়। প্রথম দিকে ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং স্থানীয় কঠোর বর্ণপ্রথার কারণে শিল্পীদের জন্য স্থানীয় নারী মডেল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে প্রথম দিকের মডেলদের প্রায়শই সামাজিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়কেন্দ্র বা কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লি থেকে আনা হতো। ফলে, নারী মডেল দ্বিমুখী প্রান্তিকতার মধ্যদিয়ে শিল্পজগতে প্রবেশ করেন: তিনি একদিকে শ্রেণি ও বর্ণের কারণে সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, অন্যদিকে পুরুষ-শাসিত এক অভিজাত জায়গায় দৃশ্যমান হওয়ার কারণেও সামাজিকভাবে কোণঠাসা ছিলেন।

সাঁওতাল নারী ও জয়নুল আবেদিন: শ্রমজীবী মিউজ
বাংলার আধুনিকতাবাদের কেন্দ্রবিন্দু যখন পূর্ব দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে–যার চূড়ান্ত রূপ ছিল জয়নুল আবেদিনের মৌলিক কাজ এবং ১৯৪৮ সালে ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’ (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠা–তখন মডেলের সংজ্ঞায় এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দৃশ্যপট দেখে গভীরভাবে উদ্বেলিত আবেদিন অবাস্তব, ইউরোপীয় ধাঁচের নারী অবয়ব প্রত্যাখ্যান করেন।
এর পরিবর্তে জয়নুল আবেদিন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীর দিকে, বিশেষ করে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের ওপর। তার সাঁওতাল নারী সিরিজের মতো কাজগুলোতে মডেলরা কোনো পেশাদার স্টুডিও কর্মী ছিলেন না; তারা ছিলেন দৈনিক বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মগ্ন কৃষিশ্রমিক। এখানেই আমাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার: মডেল এখানে আর পুরুষ দৃষ্টির (male gaze) কামনামূলক বস্তু নন, বরং আর্থ-সামাজিক সহনশীলতার এক স্মারক। এই নারীদের শরীরকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে আবেদিনের সাহসী, এক্সপ্রেশনিস্ট কালির টান ও চারকোল রেখার ব্যবহার তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়নি। বরং জল আনা, জমি চাষ করা কিংবা দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার মতো তাঁদের শারীরিক শ্রমই হয়ে ওঠে একটি উদীয়মান বাঙালি পরিচয়ের মৌলিক নান্দনিক ভাষা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় ইসলামি জাতীয়তাবাদের সরাসরি বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাঁওতাল নারী মডেল উত্তর-বিভাজন সংস্কৃতির এক ধর্মনিরপেক্ষ ও মাটির কাছাকাছি প্রতিরোধের স্তম্ভে রূপান্তরিত হন।

এস এম সুলতানের অ্যাভান্ট-গার্ড উপরিপাতন: পেশিবহুল মাতৃতন্ত্র
একটি ভিন্ন অথচ সমান গভীর রূপান্তর লক্ষ্য করা যায় শিল্পী এস এম সুলতানের কাজে। সুলতানের সঙ্গে তার মডেলদের সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী, শহুরে শিল্পী-মডেলের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছিল। নড়াইলের গ্রামীণ কৃষকদের মাঝে বসবাস করা সুলতানের মডেল ছিলেন সেই সব সাধারণ মানুষ, যাদের সঙ্গে তিনি জীবন ভাগ করে নিয়েছিলেন।
সমালোচনামূলকভাবে দেখলে, সুলতান তার নারী মডেলদের ঔপনিবেশিক বা পুঁজিবাদী শোষণের শিকার কোনো ভঙ্গুর, অপুষ্টিতে ভোগা চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেননি; বরং তিনি তাদের উপস্থাপন করেছেন পেশিবহুল, লাবণ্যময়ী এবং বিশালকার অবয়বে। প্রথম রোপণ বা চর দখল-এর মতো কালজয়ী শিল্পকর্মে নারীর শরীরকে এমন এক অতিরঞ্জিত পেশিশক্তিতে আঁকা হয়েছে, যা তাদের পুরুষ সহযোদ্ধাদের শক্তির সমকক্ষ। এই নান্দনিক অতিরঞ্জনের মাধ্যমে সুলতান একটি লুকানো আর্থ-সামাজিক সত্য উন্মোচন করেছেন: গ্রামীণ বাংলাদেশি নারী হলেন কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। শৈল্পিক মডেল হিসেবে যখন তার শরীর ব্যবহৃত হয়, তখন তা কোমল নারীত্বের পশ্চিমা আদর্শকে সম্পূর্ণ ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন এক ক্ষমতায়নকারী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক রূপক হিসেবে–যিনি এ বদ্বীপের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সমকক্ষ চালক।

বাঙালি শিল্পে নারী মডেলের বিবর্তন
ঔপনিবেশিক যুগ (১৯ শতকের শেষভাগ) > প্রান্তিক/প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদ।
জাতীয়তাবাদী বিপ্লব (১৯৪৩+) > সাঁওতাল/শ্রমজীবী শ্রেণি (সহনশীলতা)।
উত্তর-ঔপনিবেশিক অ্যাভান্ট-গার্ড > বিশালকার কৃষক সমাজ (নিজস্ব
কর্তৃত্ব)। তবে, বাংলাদেশি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শিল্প আন্দোলনের তুলনা করলে একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু থেকে সক্রিয় চরিত্রে নারী মডেলের এ রূপান্তর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অমৃতা শেরগিল: শিল্পী ও মডেলের মধ্যকার দূরত্ব দূরীকরণ
বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে স্টুডিওর ঐতিহ্যবাহী শ্রেণিবিন্যাসকে যিনি স্থায়ীভাবে ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন অমৃতা শেরগিল। প্যারিসের একাডেমি এবং ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতার সেতু বন্ধনকারী শেরগিল অত্যন্ত অনন্য উপায়ে জেন্ডার ও পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। হিল উইমেন বা সাউথ ইন্ডিয়ান ভিলেজার্স গোয়িং টু মার্কেট-এর মতো কাজগুলোতে তার মডেলরা ছিলেন সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষ, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের গভীর বিষাদ ও ভারী নীরবতাকে প্রতিফলিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেরগিল ক্যানভাসের উভয় পাশে নিজে দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহাসিক দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছিলেন, যা একজন অভিজাত চিত্রশিল্পীকে প্রান্তিক সাবাল্টান বা শোষিত বিষয় থেকে আলাদা করে রাখত। নিজের আত্মপ্রতিকৃতির এক বিশাল ভাণ্ডারের মাধ্যমে, যেমন– সেলফ-পোর্টেট এজ আ তাহিতিয়ান–শেরগিল সচেতনভাবে শিল্পী এবং মডেলের দ্বৈত ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। নিজের শরীরকে রংতুলিতে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পশ্চিমা কামুক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীর রূপকে মুক্ত করেন এবং নিজের শারীরিক সত্তাকে একটি বিদ্রোহী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ঐতিহাসিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, একজন নারী যখন নিজেই নিজের মডেলের ভূমিকা নেন, তখন ‘মিউজডম’-এর প্রথাগত ক্ষমতার সমীকরণ ভেঙে পড়ে এবং স্টুডিওটি গভীর রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়।

পশ্চিমা ক্যানন বনাম উত্তর-ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন
ইউরোপীয়-আমেরিকান আধুনিকতাবাদী ধারার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে শিল্পী মডেলের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্যভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। পশ্চিমে, আধুনিকতাবাদী অ্যাভান্ট-গার্ড আন্দোলন প্রায়শই এমন মডেলদের ওপর নির্ভর করত যাদের প্রকৃত সৃজনশীল অবদান পুরুষ শিল্পীর রোমান্টিক মিথের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। উদাহরণস্বরূপ, লি মিলারের বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা কিংবা জেল্ডা ফিটজেরাল্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে, ফলে এই নারীরা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কল্পনায় কেবল খামখেয়ালি মিউজ হিসেবেই রয়ে গেছেন।
এর বিপরীতে, বাংলাদেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক মডেলকে কদাচিৎ ব্যক্তিগত রোমান্টিক আবেশ হিসেবে দেখা হয়। বরং তাকে স্পষ্টভাবে একটি সমষ্টিগত রূপ দেওয়া হয়েছে। কামরুল হাসানের মতো বাংলাদেশি শিল্পীরা যখন নারীর অবয়ব এঁকেছেন এবং প্রায়শই তার কাজের নাম দিয়েছেন নায়ার বা তিন কন্যা–তখন সেই মডেলরা খোদ বাংলার সমষ্টিগত রাজনৈতিক সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ইয়াহিয়া খানের দানবীয় কার্টুন-সংবলিত হাসানের আইকনিক পোস্টারের বিপরীতে ছিল গ্রামীণ বাঙালি নারীদের নিয়ে তার উদ্‌যাপনী ও সাবলীল রেখাচিত্র। এ সংকটময় মুহূর্তে, নারী মডেলকে মাতৃভূমির সর্বোচ্চ প্রতীকে উন্নীত করা হয়েছিল, যা একটি নিপীড়ক সামরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের এক তীব্র ঘোষণায় পরিণত হয়েছিল।

অদৃশ্য শ্রম: নিজস্ব কর্তৃত্ব, নামহীনতা এবং সমসাময়িক স্টুডিও
নারী মডেলকে একটি জাতীয় প্রতীকে উন্নীত করা সত্ত্বেও, একটি কঠোর ও সমালোচনামূলক শিল্প ইতিহাসকে স্টুডিওর ভেতরের চলমান বস্তুগত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হতে হবে। গ্যালারির দেয়ালে নারীর প্রতিচ্ছবি উদ্‌যাপিত হলেও, মডেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যিনি পোজ দিচ্ছেন, সেই জীবন্ত মানুষটি প্রায়শই অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক কলঙ্কের জালে বন্দি থাকেন।
সমসাময়িক বাংলাদেশে চারুকলার মডেল হওয়া এখনো একটি অস্বীকৃত এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের রূপ। সমসাময়িক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত মডেলরা প্রায়শই শহুরে শ্রমজীবী পটভূমি থেকে আসেন। তাদের এমন এক রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশের মধ্যদিয়ে চলতে হয়, যা প্রায়শই নগ্ন বা লাইফ-স্টাডি রূপকে নৈতিক ও ধর্মীয় শিষ্টাচারের লঙ্ঘন হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে। ফলে, অনেক মডেল সামাজিক বহিষ্কার এড়াতে সম্পূর্ণ নামহীন থাকার দাবি জানান এবং পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিজেদের পেশা লুকিয়ে রাখেন।
এ বাস্তবতা উত্তর-ঔপনিবেশিক শিল্প ইতিহাসের একটি গভীর বিদ্রূপকে সামনে আনে:
•    প্রতীকী ক্ষেত্র: নারী মডেলের শরীর জাতীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং বিশুদ্ধ নান্দনিক রূপের এক চমৎকার ক্ষেত্র হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়।
•    বস্তুগত ক্ষেত্র: যে প্রকৃত নারী এই মাস্টারপিসগুলোর জন্য শারীরিক ব্লপ্রিন্ট বা ভিত্তি প্রদান করছেন, তিনি সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উভয়ই থেকে বঞ্চিত হন।

তাই সমসাময়িক বাংলাদেশি স্টুডিও গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর পুঁজিবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোরই প্রতিফলন ঘটায়। এটি এমন এক জায়গা যেখানে অভিজাত সাংস্কৃতিক পুঁজি গড়ে তোলার জন্য প্রান্তিক নারীদের শারীরিক শ্রমের ওপর গভীরভাবে নির্ভর করা হয়, অথচ আর্কাইভ থেকে তাদের নাম এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়।

একটি বিকল্প আর্কাইভাল ভবিষ্যতের দিকে

নারী শিল্প মডেলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাস প্রতিরোধ, আত্মীকরণ এবং অসমাপ্ত মুক্তির এক জটিল আখ্যান প্রকাশ করে। মডেল কখনোই ক্যানভাসের ওপর কেবল একটি শূন্য কাঠামোগত উপাদান ছিলেন না। জয়নুল আবেদিনের কালির টানে বন্দি সহনশীল সাঁওতাল নারী থেকে শুরু করে এস এম সুলতানের ভাবনায় বিশাল গ্রামীণ কৃষক মাতৃরূপ এবং অমৃতা শেরগিলের মতো শিল্পীদের মাধ্যমে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া আত্ম-প্রতিফলিত নারীবাদী রূপান্তর–মডেল বরাবরই দৃশ্যমান আধুনিকতা গঠনে এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।

প্রথাগত ‘মিউজডম’-এর নিষ্ক্রিয় বাঁধন থেকে নারী মডেলকে উদ্ধার করতে সমসাময়িক শিল্প সমালোচনাকে একটি প্রগতিশীল, বিকল্প আর্কাইভ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এর জন্য একাকী পুরুষ প্রতিভার প্রাচীন মিথ থেকে সরে এসে এমন একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো গ্রহণ করা প্রয়োজন যা ষ্টুডিওকে যৌথ ও সহযোগিতামূলক কাজের জায়গা হিসেবে সম্মান জানায়। এই নারীদের সামাজিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক শ্রম এবং গভীর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বকে উন্মোচন করার মাধ্যমেই কেবল শিল্পের ইতিহাস আমাদের বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করা ছবিগুলোর সঠিক অর্থ উদ্ধার করতে পারবে। নারী শিল্প মডেলকে আর কেবল অন্যের সৃজনশীলতার দর্পণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; তাকে শিল্পেরই এক অপরিহার্য ও মৌলিক স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয় ও বরেন্দ্র জনপদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয় ও বরেন্দ্র জনপদের ভবিষ্যৎ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি কোনো না কোনোভাবে অবক্ষয়ের শিকার এবং ৩২০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা এর প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহারের কারণে খরা ও মরুকরণ আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র জনপদ এ সংকটের একটি বাস্তব উদাহরণ।

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত বরেন্দ্র অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবে খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। সেচনির্ভর কৃষির বিস্তার, গভীর নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর আগের তুলনায় কয়েক মিটার নিচে নেমে গেছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খরার ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।

গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহর ও শহরতলিতে পরিকল্পনাহীন বহুতল ভবন নির্মাণ, পুকুর ও জলাশয় ভরাট এবং কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে পুকুর খননের প্রবণতা বেড়েছে। এক সময় যে জলাশয়গুলো বর্ষার পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অনেকই আজ বিলুপ্তির পথে। প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত অপচয় হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সবুজ ফসলের মাঠ, ফলের বাগান ও বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা কমে যাওয়ার ফলে উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহী অঞ্চলে একাধিকবার ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। কংক্রিটের বহুতল ভবন, পিচঢালা সড়ক এবং ধাতব অবকাঠামো সূর্যের তাপ দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে।

কৃষিক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (SRDI)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আদর্শ মাত্রা ৩-৫ শতাংশের পরিবর্তে ১-২ শতাংশে নেমে এসেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া, কেঁচো ও অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা, পানি ধারণক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে ধুয়ে আসা রাসায়নিক পদার্থ পুকুর, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড় এবং অণুজীবের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কয়েক হাজার ইটভাটা ও অসংখ্য শিল্পকারখানা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড, কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বায়ুদূষক নির্গত করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC)-এর গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় খরা, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও বাড়বে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্তমান বাস্তবতা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করছে।

আধুনিক নগরজীবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রেফ্রিজারেটর এবং উচ্চ বিদ্যুৎনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের আরাম বাড়ালেও শক্তি ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে উন্মুক্ত সবুজ পরিবেশ, গাছপালা এবং প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নগরজীবন প্রকৃতির সঙ্গে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। জলাশয় সংরক্ষণ, কৃষিজমি রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, জৈব সার প্রয়োগ বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণ, ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবসে আমাদের প্রত্যয় হোক–উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ মাটি, পানি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।

লেখক: কৃষিবিদ, সিইও,  ইয়েস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
[email protected]