পোষা প্রাণীর মৃত্যু সব সময় কষ্টদায়ক। অনেকে মনে করেন, মৃত্যু সম্পর্কে কেবল মানুষের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীববিজ্ঞানে মৃত্যু একটি সর্বজনীন বিষয়। অনেক প্রাণী তাদের সঙ্গীর মৃত্যুতে নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির প্রাণীবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জ্যাকুলিন বয়েড তার পোষা কুকুর ববির মৃত্যুর পর প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। ওরাল মেলানোমায় আক্রান্ত হয়ে কুকুরটির মৃত্যুর পর তিনি অন্য কুকুরদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।
মৃত্যুর সবচেয়ে প্রাথমিক ধারণা হলো একটি প্রাণী বুঝতে পারে যে, অন্য প্রাণীর জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে এবং সে আর ফিরে আসবে না। প্রাণিজগতে সঙ্গীর মৃত্যুতে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিছু প্রাণী বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে মরার ভান করে। যেমন–ওপোসাম নামের প্রাণী শিকারির হাত থেকে বাঁচতে এই কৌশল নেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় থ্যানাটোসিস বলা হয়। কিছু পাখি, সাপ ও কীটপতঙ্গের মধ্যেও এই আচরণ দেখা যায়।
গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যেও শোক প্রকাশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, কাছের সঙ্গী কুকুর বা বিড়ালের মৃত্যুতে অনেক সময় বিড়াল খাওয়া, ঘুমানো বা বিচরণ কমিয়ে দেয়। ডলফিনের মতো সামুদ্রিক প্রাণীরা মৃত শাবকের প্রতি গভীর মনোযোগ দেখায় এবং দিনের পর দিন তাদের বহন করে। ২০১৮ সালে একটি স্ত্রী অর্কা তার মৃত শাবককে ১৭ দিন ধরে বহন করেছিল। এছাড়া হাতি, প্রাইমেট এবং পাখিদের মধ্যেও মৃত সঙ্গীর প্রতি মানুষের মতো শোক প্রকাশের আচরণ করতে দেখা গেছে।
সব প্রাণীর প্রতিক্রিয়া আবেগতাড়িত নয়। কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি কেবলই বেঁচে থাকার তাগিদ। যেমন–মৌমাছিরা মৃত সঙ্গীর গন্ধ বা মরদেহ থাকা ফুল এড়িয়ে চলে। মূলত শিকারির হাত থেকে বাঁচতে তারা এমন আচরণ করে। আবার লাল পিঁপড়ারা রোগবালাইয়ের ঝুঁকি এড়াতে মৃত সঙ্গীদের বাসা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে। এগুলো তাদের সম্পূর্ণ সহজাত আচরণ। অন্যদিকে শিম্পাঞ্জিদের মতো উন্নত বুদ্ধিমত্তার প্রাণীর আচরণ অনেকটা মানুষের শোকের কাছাকাছি। তারা মৃত সঙ্গীর শরীর পরিষ্কার করে ও শাবকের মরদেহ দীর্ঘ সময় আগলে রাখে।
গবেষক জ্যাকুলিন বয়েড তার পোষা কুকুর ববির মৃত্যুর পর নিজের অন্য কুকুরদের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি মৃত কুকুরটিকে ঘাসের ওপর রাখার পর দেখেন, অন্য কুকুরগুলো সেটিকে শুঁকে দেখে চলে গেলেও বার্টি নামের একটি কুকুর প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে মৃত সঙ্গীর পাশে বসে ছিল। সে তার বন্ধুকে শুঁকে ও চেটে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, প্রাণীরাও নিজেদের মতো করে মৃত্যু উপলব্ধি করতে পারে। মানুষের মতো হয়তো তাদের শোক প্রকাশের ভাষা নেই, তবে সঙ্গীর মৃত্যুতে তাদের সামাজিক ও মানসিক আচরণে পরিবর্তন আসে।
