কেউ বাবাকে আব্বা বলে, কেউ বাবা বলে, আবার কেউ আব্বু বলে ডাকেন। আমারও দুজন বাবা রয়েছেন, অবাক লাগছে! কিন্তু হ্যাঁ- একজন আমার জন্মদাতা আব্বা, আরেকজন আমার ‘ছোট বাবা’, যিনি আসলে আমার বড় মামা। একজন আমাকে পৃথিবীতে এনেছেন, আর অন্যজন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দায়িত্ব আর ছায়া হয়ে পাশে থেকেছেন। তাই নিজেকে আমি সবসময় সৌভাগ্যবতী মনে করি। কারণ সবার ভাগ্যে দুজন বাবার এমন অকৃত্রিম স্নেহ জোটে না।
২০১৭ সালের পর থেকে আমার দায়িত্ব চলে যায় আমার ছোট বাবার তত্ত্বাবধানে, যখন আমি ঢাকায় হলিক্রস কলেজে ভর্তি হয়েছি।
কলেজের কাছাকাছি একটা হোস্টেলে মামা আমাকে রেখে যান। প্রয়োজনীয় যা কিছু লাগবে সবকিছু আমার ছোট বাবা আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। জিনিসগুলো মধ্যে কিছু জিনিস আমার কাছে এখনও রয়ে গেছে। যেমন, লাল জমিনে সূর্যমুখী ফুলের ছাপ দেওয়া একটা বেডশিট, যা আমি এখনো ব্যবহার করি।
আমার বড় মামা সব কিছু কিনে দিয়ে গেলেও, তিনি আমাকে লবণ কিনে দিয়ে যাননি। হোস্টেলে পান থেকে চুন খসলেই আমি আমার বড় মামাকে ফোন দিতাম।
প্রথম দিনের এই ঘটনার পর আমি মামাকে ফোন দিয়ে বলি, ‘মামা আমার তো নুন নাই, কি দিয়ে খামু’। মামা বললেন, ‘ঠিক আছে আম্মু, আমি অফিস শেষে তোমাকে দিয়ে আসবো’।
ওইদিন বিকেলে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মামা বৃষ্টিতে ভিজে আমার জন্য লবণ কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তখন ভাবছিলাম, এই লোকটা আমাকে এতো ভালোবাসে কেন! বোনের সন্তানকে কেউ এইভাবে ভালোবাসতে পারে!
আমার সঙ্গের যারা হোস্টেলে থাকতো, তারা অবাক হয়ে যেতো মামা তার ভাগ্নিকে এমন ভালোবাসতে পারে!
মজার ব্যাপার হলো, আজও আমার বান্ধবীরা আমার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার আগে আমার মামার কথা জানতে চায়। আমার মামা কেমন আছেন? মামা ভালো আছেন তো?
আমি অসুস্থ হয়ে গেলে অস্থির হয়ে যেতেন মামা। তিনি পুরান ঢাকা থেকে ফার্মগেটে এসে আমাকে সপ্তাহের দুএক দিন ছাড়া, বলতে গেলে অন্য সব দিনই দেখে যেতেন। এমনও হয়েছে, আমি অসুস্থ থাকলে তিনি দিনে তিন বারও এসে দেখে গেছেন। তার একটা ছোট্ট মেয়ে রয়েছে। হুমাইরা। মামা আমাকে বলেন, আমি নাকি তার বড় মেয়ে। তিনি আমাকে আম্মু বলে ডাকেন। কলেজে মামা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন।
কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরুর পর মামার সঙ্গে একটু দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু তার ভালোবাসা আমার প্রতি কখনোই কম ছিলো না। এটা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রাজধানীর বাইরে হওয়ায়।
রাস্তার দূরত্ব বেশি হলেও, মনের দূরত্ব ছিল না। আমার মন খারাপ থাকলে মামা যেন কীভাবে বুঝে যেতেন। একবার কী নিয়ে জানি রাগ করেছি, কথা বলি না, ফোনও ধরি না। সব বন্ধ করে রেখেছি। চিন্তায় মামা আমার ক্যাম্পাসে চলে আসেন। মামা এসে আমার হলের গেটে দাঁড়িয়ে ফোন দিচ্ছিলেন। একে একে ৩৩ বার ফোন দিয়েছেন। কিন্তু আমি ফোন না ধরে ফোনটির দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ রুমে এসে এক জুনিয়র বলছে, আপনার মামা নিচে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ ধরে। বোরকা পরে নিচে গিয়ে দেখি, সত্যি সত্যি মামায় দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর মামাকে ক্যাম্পাসের ছোট অস্থায়ী রেস্টুরেন্টে খাবার খাইয়েছিলাম রাগ কমানোর জন্য। তিনি আমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে চলে যান, আর বলেন- ‘এমন কইরো না আম্মু আর’।
বাড়িতে থাকাকালীন কেউ কিছু বললে খাওয়া বন্ধ করে দিতাম। আমার আবার অভ্যাস খারাপ, খালি গাল ফুলাই অল্পতেই। আমার আব্বা একবার কী যেন বলছিলেন, এর পর রাগ করে এক সপ্তাহে খাবার খাইনি। এটা সর্বোচ্চ না খাওয়ার রেকর্ড আমার জীবেন। এর পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।
আব্বা পরে বলেছিলেন, ‘তোকে আর কিছু বলবো না আমি’।
দুইজনের সঙ্গেই আমার মান-অভিমান চলে এখনও।
দুঃখের ব্যাপার, আমি আমার মামাকে সরাসরি ‘ছোট বাবা’ ডাকিনি একবারও। কখনও বলিনি, ‘ছোট বাবা আমিও আপনাকে অনেক ভালোবসি’।
আমি আমার দুই বাবাকে খুব ভালোবাসি। সবসময় তাদের অনুভব করি। সব সময় ভালো থাকুক আমার এই দুই বাবা।