...ঝড়, জল আর কালবৈশাখীর ঝঞ্ঝা বুকে নিয়ে যখন নতুন বছরের সূর্য ওঠে, তখন এক বুক শঙ্কা আর প্রার্থনা নিয়ে ‘গ্রাম রক্ষা’র মন্ত্রণায় মগ্ন হন লক্ষ্মণ মুন্ডা। শহর ছাড়িয়ে আট ক্রোশ দূরের মুন্সীবাজার, সেখান থেকে মহাসড়ক পেরিয়ে আরও দেড় ক্রোশ ধূলিমলিন পথ ভাঙলে তবেই দেখা মেলে করিমপুর চা বাগানের। মনু ভ্যালির এই গহীন কোণে কেবল মুন্ডারাই নন; কড়া, ভূমিজ, রিকিয়াসনসহ হরেক রকম আদিম জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান। ধর্মবিশ্বাসে বৈচিত্র্য থাকলেও বঙ্গাব্দের শুরুতে এসে তারা সবাই এক মোহনায় মেশেন। সেই মোহনার নাম ‘গ্রাম পূজা’। বছরের এই একটা সময়ে সব বিভেদ ভুলে প্রকৃতির আদিম উপাসনায় মেতে ওঠেন প্রান্তিকের এই মানুষ।
নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তার মানুষ মূলত প্রকৃতিরই সন্তান। তাদের উপাস্য আলাদা, পূজার নাম ভিন্ন, এমনকি একই দেবতাকে তারা ডাকেন নানাবিধ নামে। এই বৈচিত্র্যই যেন তাদের আধ্যাত্মিক পরিচয়কে আরও বিমূর্ত এবং রহস্যময় করে তোলে। সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তনে তাদের বহু প্রাচীন আচার আজ বিলুপ্তির পথে। তবু বাপ-ঠাকুরদার স্মৃতি আর বুনো সংস্কৃতির শেকড়টুকু আঁকড়ে ধরে আজও তারা টিকে আছেন পরম মমতায়।
কাদা-মাটির বেদি ও পঞ্চভূতের দর্শন
শহুরে জাঁকজমকপূর্ণ পূজার সঙ্গে তাদের কোনো মিল নেই। এদের পূজার সব উপকরণই অকৃত্রিমভাবে মেলে প্রকৃতির আঁচল থেকে। কাদা-মাটির বেদিতে কোনো জৌলুসপূর্ণ প্রতিমা থাকে না; কচি বাঁশের কাঠামোয় লাল সুতা বেঁধে, বুনো জবা আর দুধসাদা কাঠমালতি গুঁজে তারা অবয়ব দেন মনের ভেতরের দেবতাকে। তারা বিশ্বাস করেন প্রকৃতিই পরম মাতা। মা যেমন তার সন্তানকে স্তন্যপানে পরিপুষ্ট করেন, প্রকৃতিও তেমনি ফল, ফুল আর জলে তৃপ্ত করে মানবজাতিকে। তাদের আদিম বিশ্বাস মাটি, জল, বাতাস, আকাশ ও আগুন–এই পঞ্চভূতের আশীর্বাদেই মানবদেহের নির্মাণ এবং এর ভেতরেই অবসান। অঞ্চলভেদে কেউ আরাধনা করেন রাম, কৃষ্ণ বা কালীর; কেউ মাতেন ‘জাহের বঙ্গা’র বন্দনায়। মহামারি থেকে বাঁচতে অলমিক সমাজ যে ‘মাত্তালাম’ পূজা করে, তা মূলত শীতলা দেবীরই রূপ। আবার কালী বা বনদুর্গার পূজাকে তারা বলে ‘আমতেলি’। এই পূজার সুরের মিল পাওয়া যায় উত্তর জনপদের অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর ‘আমলোবান’ পূজায়। মুন্ডাদের প্রধান দেবতা ‘জাহের বঙ্গা’ মূলত তাদের গ্রাম দেবতা। তার সন্তুষ্টির ওপরই নির্ভর করে গ্রামের আগামী বছরের নিরাপত্তা ও ফসলের প্রাচুর্য।
বিদঘুটে বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব দ্রোহ
সনাতন হিন্দু সমাজের সঙ্গে এই নৃগোষ্ঠীর মৌলিক তফাৎটা গড়ে ওঠে পূজার পৌরোহিত্যে। সমতলের মানুষ যেখানে চক্রবর্তী বা কুলীন ব্রাহ্মণের ওপর পূজার ভার সঁপেন, সেখানে এই প্রান্তিক মানুষ বেছে নেন পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মানুষকে। শ্রদ্ধাবনত এই পদের নাম ‘অসাই’। এই ‘অসাই’ নির্বাচন কেবল একটি ধর্মীয় নিয়ম নয়, এটি আসলে আমাদের তথাকথিত মূলধারার সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব ও কড়া প্রতিবাদ। প্রবল জাত্যভিমান আর ছুঁতমার্গের দেয়াল তুলে আমরা যুগে যুগে এই মানুষের ব্রাত্য করে রেখেছি। আমাদের সামাজিক মণ্ডপগুলোয় তাদের ঠাঁই হয়নি। আমাদের অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে এই অন্ত্যজ শ্রেণিটি সমাজ থেকে ক্রমশ দূরে সরতে সরতে আজ ঠাঁই নিয়েছে গহীন অরণ্যের প্রান্তে। আর তাই, শহুরে বর্ণপ্রথার সেই বিদঘুটে অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা নিজেদের ‘অসাই’ নিজেই বেছে নেয়।

স্বকীয় কৃষি ও জল-প্রকৃতির মিতালী
প্রকৃতির এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব ও অভিনব কৃষি অর্থনীতি। চা কলোনির পাশে এক চিলতে ধানি জমি, ছোট পুকুরের মাছ কিংবা বাড়ির কোণের আম-কলা-লেবু বাগানই এখন তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। দেবতাকে তারা অন্য কোথাও থেকে কিনে আনা নৈবেদ্য দেয় না, উৎসর্গ করে নিজেদের ফলানো টাটকা ফসল। আমরা যখন সমতলে বসে উন্নত বীজ, সেচ আর রাসায়নিক কীটনাশক নিয়ে প্রতিনিয়ত হাহাকার করি, তখন এই প্রান্তিক মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব জৈব পদ্ধতিতে, নিজস্ব বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণ করে ফলিয়ে চলছেন বিষমুক্ত ফসল। তাদের এই অভিনব কৃষি পাঠশালা আধুনিক বিজ্ঞানকেও চমকে দেওয়ার মতো। একই চিত্র তাদের জল ব্যবস্থাপনায়। সুপেয় জলের তীব্র সংকটে যখন ঝিরি বা নালার অস্বচ্ছ জলই তাদের ভরসা, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে তাদের প্রাচীন কুটির শিল্প। পূজার দিনগুলোয় মাটির কলসি ও ভাঁড়ের কদর বাড়ে। প্লাস্টিকের এই যুগে জল সংরক্ষণের জন্য মাটির কলসির এই পুনরুত্থান যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি ঐতিহ্যবাহী।
ক্যান্টনমেন্টের চেয়েও ছিমছাম এক স্বর্গভূমি
এই নৃগোষ্ঠীর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরলে তাদের গৃহ ব্যবস্থাপনার নান্দনিকতায় মুগ্ধ হতে হয়। মেঠো পথে কোনো ঝরা পাতার আবর্জনা নেই, ঝোপঝাড়ের বিশৃঙ্খলা নেই। কাদা-মাটির লেপা উঠানগুলো এতটাই তকতকে যে, এক পলকে ভুল করে সামরিক সেনানিবাস বা কোনো পরিকল্পিত আধুনিক আবাসন বলে ভ্রম হতে পারে! বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের চুক্তিটা যেন অলিখিত। ঘরের পাশের সুবিন্যস্ত পুকুরগুলো বাস্তুতন্ত্রের একেকটি জীবন্ত উদাহরণ। সাপের উপদ্রব থাকা বড় জলাশয়গুলোয় মানুষের নামা নিষেধ। সেখানে ফোটা লালপদ্ম, শাপলা বা ভাঁটফুল ছেঁড়া পাপ–কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে না। প্রকৃতির প্রতি এই পরম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তৈরি হয় তাদের নিজস্ব লোকজ স্তব ও স্তুতি। বৈদিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো তাদের নেই, কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত পৌরাণিক কেচ্ছা আর সুরের মায়ায় তারা অনন্য। কোনো এক কালবৈশাখীর ঝরঝর বৃষ্টির রাতে যখন দেশোয়ালি বা নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ভাষায় এই জনপদের মায়েরা সুর তোলেন, বোনেরা গীত গান–তখন ভাষা না বুঝেও চোখ ভিজে আসে। স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার কী আকুল ও ঐকান্তিক প্রয়াস!
উৎসবের রং ও অন্তিম বাস্তবতা
এদের উৎসবে রং এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বসনে ও ভূষণে বিচিত্র রঙের ছোঁয়া। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের প্রহর ভেদে বদলে যায় উৎসবের এই রং। তবে তাদের উৎসবের পোশাকের সুতায় হাত দিলে টের পাওয়া যায় অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর কশাঘাত। সস্তা সিনথেটিক বা পলিয়েস্টারের কাপড়ে ঢাকা পড়ে যায় তাদের উৎসবের জৌলুস। একটু সচ্ছলতার মুখ দেখলে তবেই গজ কাপড় কিনে শার্ট বা মায়েরা বছরে বড়জোর একটা তাঁতের শাড়ির বিলাসিতা করতে পারেন। তবু এই অভাব, অবহেলা আর প্রান্তিকতার ভেতরেও তাদের উৎসবের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। সমতলের তথাকথিত সুশীল সমাজের মতো জাত্যভিমান বা ছুঁতমার্গ নেই ওদের ডেরায়। সেখানে সবার একটাই পরিচয়–মানুষ। শহুরে বাবুদেরও তারা বুকে টেনে নেয়, মেতে ওঠে উদ্বাহু নৃত্যগীতে। কারণ তারা জানে, মানুষ আর প্রকৃতির চেয়ে বড় সত্য এই চরাচরে আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রান্তিকের এই বুনো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শেকড়কে ভুলে আমরা যতই যান্ত্রিক হই না কেন, দিনশেষে আমাদের ফিরতে হবে প্রকৃতির এই আদিম পাঠশালাতেই।
লেখক: সাংবাদিক, আলোকচিত্রী
বিশেষ কৃতজ্ঞতা
হরেন্দ্রনাথ সিং, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, রাজশাহী
পরিমল সিংহ বাড়াইক, সভাপতি, চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্ট
লক্ষ্মণ মুন্ডা, সাধারণ সম্পাদক, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ
নৃপেন মুন্ডা, চা শ্রমিক নেতা, দরগাবিল, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ
ছোটন সর্দার, অমড়িয়া মালপাহাড়িয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, নাটোর