৩৩ বছর পর নির্বাচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) থাকলেও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই শনিবার (২৭ জুন) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম সিনেট অধিবেশন। জাকসু মনোনীত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধির মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস)-এর ছাত্রত্ব শেষ হওয়ায় তারা আর সিনেট সদস্য হিসেবে থাকছেন না। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সিনেটে আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬টিতে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সিনেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, কাগজে-কলমে শূন্য পদের সংখ্যা ১৬ হলেও কার্যত অকার্যকর সদস্যের সংখ্যা ৫০-এরও বেশি।
তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সরকারের সময়ে দায়িত্বে থাকা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত, প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন অনেকেই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেট সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। তাদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে সিনেটের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন না, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে কার্যকর সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে দাবি তাদের।
এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে সিনেটের কোরাম পূরণ হবে কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। গত বছরের ৪২তম সিনেট অধিবেশনেও কোরাম পূরণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছিল। একই অধিবেশনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে কয়েকজন শিক্ষক সভাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর থেকে সিনেটের তালিকাভুক্ত কয়েকজন সদস্য কোনো অধিবেশনেই অংশ নেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিনেটের মোট সদস্যসংখ্যা ৯৪। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব, স্পিকার কর্তৃক মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, চারজন কলেজ অধ্যক্ষ এবং দুইজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধির পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। সম্প্রতি জাকসু মনোনীত ভিপি ও জিএসের ছাত্রত্ব শেষ হওয়ায় শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে ১৬টিতে পৌঁছেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ১৯(২) ধারা অনুযায়ী, শিক্ষার্থী সদস্যদের মেয়াদ এক বছর। একই ধারার দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারালে তিনি সিনেট সদস্যপদও হারাবেন।
জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, 'গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাকসুর কার্যনির্বাহী সভায় জাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান আমাদের জানিয়েছেন, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ায় আমরা দুজন আর সিনেট সদস্য থাকছি না। এরপর আমরা জাকসুর পক্ষ থেকে নতুন দুজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধিকে মনোনয়নের দাবি জানাই। কিন্তু উপাচার্য আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, নতুন করে মনোনয়নের সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।'
ছাত্রত্ব শেষ হওয়া দুই প্রতিনিধির জায়গায় জাকসু নতুন করে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, 'চলে গেল মানে চলে গেল।'
তবে সিনেটের শূন্য পদগুলোতে নির্বাচন বা মনোনয়ন প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে একাধিকবার জানতে চাওয়া হলেও উপাচার্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি। তিনি শুধু বলেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকা এবং কার্যত অকার্যকর সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদে অংশীজনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ এবং কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমানউল্লাহ খান/আজহার/