একটি সুস্থ-সবল তরুণ, যার চোখে ছিল স্বপ্ন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। একদিন ‘শুধু একবার চেষ্টা করে দেখি’ এই কৌতূহল থেকে সে নেশার জগতে পা রাখল। কয়েক বছর পর সেই উজ্জ্বল মুখ পরিণত হলো এক জীবন্ত কঙ্কালে। মাদক এভাবেই নীরবে একটি প্রাণ, একটি পরিবার ও একটি গোটা সমাজকে গিলে খায়। প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার এই অভিশাপে তাদের সবচেয়ে আদরের সন্তানকে হারাচ্ছে, অথচ একটুখানি সচেতনতাই হয়তো তাদের বাঁচিয়ে দিতে পারত।
আজ আমরা বিজ্ঞান ও ইসলাম উভয়ের আলোকে দেখব, কেন এই পথ থেকে দূরে থাকা আসলে জীবন-মরণের প্রশ্ন। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মাদক সরাসরি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ বা পুরস্কার-কেন্দ্রকে আক্রমণ করে। নেশাদ্রব্য মস্তিষ্কে কৃত্রিমভাবে ডোপামিন নামের রাসায়নিক প্লাবিত করে দেয়, যা সাময়িক সুখানুভূতি জাগায়। কিন্তু মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে ডোপামিন তৈরি করা কমিয়ে দেয়, ফলে নেশা ছাড়া মানুষ আর কোনো আনন্দই অনুভব করতে পারে না। এটিই আসক্তির মূল রহস্য। সময়ের সঙ্গে একই অনুভূতি পেতে আরও বেশি ডোজ লাগে, আর হঠাৎ বন্ধ করলে শুরু হয় অসহনীয় যন্ত্রণা।
মাদক শুধু মস্তিষ্ক নয়, পুরো শরীরকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। এটি লিভার ও কিডনি অকেজো করে দেয়, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে, ফুসফুস ধ্বংস করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে ফেলে। একই সিরিঞ্জ ব্যবহারে ছড়ায় এইডস ও হেপাটাইটিসের মতো মারণ রোগ। মানসিকভাবে এটি জন্ম দেয় বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রতি বছর মাদক পৃথিবীজুড়ে লাখ লাখ তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় মাদকের একটিও উপকারী দিক নেই, আছে শুধু ধ্বংস।
আরও ভয়ংকর হলো, মাদক একটি ‘প্রবেশদ্বার’-এর মতো কাজ করে। গবেষণা বলছে, ছোট নেশা দিয়ে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তা মানুষকে আরও কঠিন ও প্রাণঘাতী মাদকের দিকে টেনে নেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণরা, কারণ এই বয়সে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশটি তখনো পুরোপুরি পরিণত হয় না। ফলে একটি জাতির সম্ভাবনাময় প্রজন্ম অঙ্কুরেই ঝরে পড়ে। মাদক তাই কেবল ব্যক্তির রোগ নয়, এটি গোটা জাতির রক্তে ছড়িয়ে পড়া এক ধীর বিষ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞান যা আজ আবিষ্কার করছে, ইসলাম তা ১৪০০ বছর আগেই ঘোষণা করেছে। আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফল হও। (সুরা মায়িদা, ৯০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সর্বজনীন নীতি দিয়ে গেছেন, ‘প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ, আর প্রত্যেক মদই হারাম।’ (সহিহ মুসলিম)।
তিনি আরও বলেছেন, যে বস্তু বেশি খেলে নেশা হয়, তার সামান্য পরিমাণও হারাম (তিরমিজি, আবু দাউদ)। এই নীতির ভিত্তিতে ইসলামি আইনবিদরা ঐকমত্যে ঘোষণা করেছেন, ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদক ও নেশাদ্রব্য হারাম। কারণ এগুলো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিবেক ও বুদ্ধি কেড়ে নেয়। আর বিবেক রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য।
যে সন্তানকে মা ১০ মাস গর্ভে ধারণ করেছেন, রাতের পর রাত জেগে বড় করেছেন, সেই সন্তান যখন নেশায় বুঁদ হয়ে টলতে টলতে ঘরে ফেরে, তখন মায়ের বুকটা কীভাবে ভেঙে যায়, তা ভাষায় বলা যায় না। নেশা কখনো একা একজনকে শেষ করে না; সঙ্গে নিয়ে ডোবায় গোটা পরিবারকে। স্ত্রী হারায় তার স্বামীকে, সন্তান হারায় তার বাবাকে, আর বৃদ্ধ মা-বাবা হারায় শেষ বয়সের একমাত্র অবলম্বন। যে হাত আল্লাহর সামনে সিজদার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেই হাত একসময় কাঁপতে থাকে কেবল এক ছিলিম নেশার জন্য। ভাবুন, কিয়ামতের দিন এই অপচয় করা জীবনের হিসাব আমরা কী দিয়ে দেব? এই যুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত ঢাল হলেন অভিভাবক।
প্রথমত, সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই আল্লাহভীতি ও নামাজের অভ্যাসে গড়ে তুলুন। কারণ, যে হৃদয়ে আল্লাহর ভয় বাসা বাঁধে, সেখানে নেশা সহজে ঢুকতে পারে না। দ্বিতীয়ত, সন্তানের বন্ধুবান্ধব ও সঙ্গ সম্পর্কে সজাগ থাকুন, কারণ অধিকাংশ আসক্তিরই সূচনা হয় খারাপ সঙ্গ থেকে। তৃতীয়ত, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক রাখুন, যেন সে তার সমস্যা লুকিয়ে না রেখে নির্ভয়ে আপনাকে বলতে পারে। তাকে পর্যাপ্ত সময় ও ভালোবাসা দিন কারণ যে সন্তান ঘরে আদর ও মনোযোগ পায় না, সে প্রায়ই বাইরে নেশার মধ্যে মিথ্যা সান্ত্বনা খোঁজে।
আর কেউ যদি ইতোমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়ে, তাকে ঘৃণা করে দূরে ঠেলে না দিয়ে চিকিৎসা ও সংশোধনের পথে ফিরিয়ে আনুন। সর্বোপরি, আল্লাহর কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া করুন। কারণ, হেদায়েত একমাত্র তারই হাতে। মাদক দুনিয়াতে ধ্বংস করে শরীর, আর আখিরাতে ডেকে আনে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। বিজ্ঞান যাকে ‘নীরব ঘাতক’ বলে, শরিয়ত তাকে বলে ‘শয়তানের অপবিত্র কাজ’।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক