অনেক অনেক দিন আগের কথা। তিনজন মানুষ একসঙ্গে পথ চলছিল। তারা ছিল আলাদা স্বভাবের, আলাদা জীবনের মানুষ, কিন্তু সেদিন একই পথের সঙ্গী। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল, নামল মুষলধারে বৃষ্টি। ভিজে একাকার হওয়ার আগে তারা চারপাশে আশ্রয় খুঁজতে লাগল। অদূরে একটি পাহাড় চোখে পড়ল, আর পাহাড়ের গায়ে ছিল একটি গুহা। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তিনজন দ্রুত সেই গুহায় ঢুকে পড়ল।
কিন্তু তারা তখনো জানত না, এই গুহাই হয়ে উঠবে তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার জায়গা। হঠাৎ পাহাড়ের ওপর থেকে বিশাল একটি পাথর গড়িয়ে এল এবং ঠিক গুহার মুখের ওপর এসে আটকে গেল। এক নিমেষে বাইরের আলো নিভে গেল, বন্ধ হয়ে গেল বেরোনোর একমাত্র পথ। তিনজন মিলে অনেক চেষ্টা করল, কাঁধ দিয়ে ঠেলল, হাত দিয়ে চাপ দিল, কিন্তু পাথরটি একচুলও নড়ল না। তারা বুঝে গেল, এই পাথর সরানোর শক্তি মানুষের নেই। ঠিক তখন একজন বলল, ভাইয়েরা, আমাদের কাছে আর কোনো উপায় নেই, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। চলো, আমরা প্রত্যেকে নিজের জীবনের এমন একটি ভালো কাজ স্মরণ করি, যেটা আমরা একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য করেছিলাম, কোনো মানুষকে দেখানোর জন্য নয়। তারপর সেই কাজের অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করি। হয়তো তিনি আমাদের মুক্তি দেবেন। তিনজনই রাজি হলো। অন্ধকার সেই গুহায় তাদের কথা শোনার মতো আর কেউ ছিল না, কেবল আল্লাহ ছাড়া। সেখানে তারা একে একে নিজেদের গোপন আমলের কথা বলতে শুরু করল।
প্রথম মুসাফির: মা-বাবার সেবা করা
প্রথম ব্যক্তি দুই হাত তুলে বলল, হে আল্লাহ! আমার বৃদ্ধ মা-বাবা ছিলেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি তাদের জন্য দুধ নিয়ে যেতাম। আমার নিয়ম ছিল, মা-বাবার আগে আমি ঘরের আর কাউকে, এমনকি আমার সন্তানদেরও সেই দুধ দিতাম না। একদিন কাজে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। ঘরে ফিরে দেখি, তারা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আমি দুধের পাত্র হাতে নিয়ে তাদের মাথার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘুম ভাঙাতে মন চাইল না, তাদের আরাম নষ্ট করতে চাইলাম না। আবার তাদের আগে অন্য কাউকে দেওয়াও আমার নিয়মের বাইরে। তাই আমি পাত্র হাতে নিয়ে সারা রাত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার ছোট সন্তানরা ক্ষুধায় কাঁদছিল আমার পায়ের কাছে, তবু আমি মা-বাবার ঘুম ভাঙাইনি। এভাবেই ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আমি যদি এই কাজটি সত্যিই কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তবে এই পাথরটি আমাদের কাছ থেকে একটু সরিয়ে দাও।
তার দোয়া শেষ হতেই পাথরটি একটু কেঁপে উঠল এবং সামান্য সরে গেল। আলোর সরু একটি রেখা ভেতরে এসে পড়ল, কিন্তু বেরোনোর মতো জায়গা তখনো হলো না।
দ্বিতীয় মুসাফির: পাপের দরজা থেকে ফিরে আসা
এবার দ্বিতীয় ব্যক্তি দোয়ার জন্য দাঁড়াল। সে বলল, হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পৃথিবীতে তাকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। একসময় আমি তার দিকে পাপের ইচ্ছায় এগিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে রাজি হয়নি, আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এরপর একসময় তীব্র অভাব এসে তাকে চেপে ধরল। নিরুপায় হয়ে সে সাহায্য চাইতে আমার কাছে এল। আমি শর্ত দিলাম, সাহায্য পেতে হলে তাকে আমার ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে হবে। প্রয়োজনের কাছে হেরে গিয়ে সে রাজি হলো। আমি তার হাতে অর্থ তুলে দিলাম।
কিন্তু ঠিক সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে, যখন পাপ একেবারে হাতের নাগালে, তখন সে কেঁপে উঠে বলল, আল্লাহকে ভয় করো। অন্যায়ভাবে এই সীমা লঙ্ঘন করো না। তার মুখে আল্লাহর নাম শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম এবং সরে গেলাম। যাকে আমি সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম, তাকে আমি ছেড়ে দিলাম শুধু তোমার ভয়ে। আর যে অর্থ দিয়েছিলাম, তা-ও ফেরত নিইনি। হে আল্লাহ! আমি যদি এই কাজটি সত্যিই কেবল তোমার ভয়ে ও সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তবে এই পাথরটি আমাদের কাছ থেকে আরও একটু সরিয়ে দাও।
পাথরটি আবার নড়ে উঠল এবং আরও খানিকটা সরে গেল। ভেতরে আরও আলো এল, তবু পুরোপুরি বেরোনোর পথ হলো না।
তৃতীয় মুসাফির: আমানত ফেরত দেওয়া
সবশেষে তৃতীয় ব্যক্তি দোয়া করতে দাঁড়াল। সে বলল, হে আল্লাহ! একবার আমি কিছু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করিয়েছিলাম। কাজ শেষে আমি সবাইকে তাদের মজুরি বুঝিয়ে দিলাম। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন কোনো কারণে তার পাওনা না নিয়েই চলে গেল।
আমি তার সেই সামান্য পাওনা ফেলে রাখিনি। সেটাকে আমি ব্যবসায় খাটাতে শুরু করলাম। বছরের পর বছর সেই অল্প পুঁজি বাড়তে বাড়তে বিশাল সম্পদে রূপ নিল; গরু, ছাগল, উট আর রাখালেও ভরে গেল।
অনেক বছর পর সেই লোকটি একদিন ফিরে এসে তার পুরোনো পাওনা চাইল। আমি আঙুল দিয়ে পুরো পশুপাল দেখিয়ে বললাম, এই সবকিছুই তোমার। এগুলো তোমার সেই মজুরিরই ফসল। সে অবাক হয়ে বলল, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করো না। আমি বললাম, না, আমি ঠাট্টা করছি না। সত্যিই এর পুরোটাই তোমার। এরপর সে সবকিছু নিয়ে চলে গেল, একটি পশুও রেখে গেল না। হে আল্লাহ! আমি যদি এই কাজটি সত্যিই কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তবে বাকি যেটুকু পাথর আটকে আছে, তা-ও সরিয়ে দাও।
তার দোয়া শেষ হতেই পাথরটি সম্পূর্ণভাবে সরে গেল। গুহার মুখ খুলে গেল, আর তিনজন মুসাফির মুক্ত বাতাসে হেঁটে বেরিয়ে এল।
এই ঘটনাটি কোনো বানানো গল্প নয়। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থেই আছে। একবার তিনজন লোক পথ চলছিল। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। তখন পাহাড় থেকে একটি পাথর গড়িয়ে এসে গুহার মুখ বন্ধ করে দিল। তারা একে অপরকে বলল, তোমরা এমন নেক আমলের কথা ভাবো, যা তোমরা কেবল আল্লাহর জন্য করেছিলে; তারপর সেই আমলের অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করো, হয়তো তিনি পাথরটি সরিয়ে দেবেন। (বুখারি, ২২১৫, ৫৯৭৪; মুসলিম, ২৭৪৩)।
সেই তিনজন মুসাফির বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গুহায় ঢুকেছিল। কিন্তু তাদের প্রকৃত মুক্তি এনে দিয়েছিল বৃষ্টি নয়, তাদের বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা সেই গোপন আমলগুলো। বছরের পর বছর তারা কাউকে না বলে, কোনো বাহবা না নিয়ে এই কাজগুলো করে গিয়েছিল। আর সেই নীরব আমলই বিপদের দিনে পাহাড়সমান পাথর সরিয়ে দিল।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেও একদিন কোনো না কোনো ‘গুহা’ আসে, কোনো বিপদ, কোনো অসহায় মুহূর্ত, যখন চারপাশের সব দরজা বন্ধ মনে হয়। সেদিন আমাদের কাছে দেখানোর জন্য কী আছে? মানুষকে দেখানো লোকদেখানো আমল সেদিন কাজে আসবে না। কাজে আসবে শুধু সেই আমল, যা আমরা নীরবে, কেবল আল্লাহর জন্য জমিয়ে রেখেছি।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক