প্রবন্ধ রচনা : মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকার
ভূমিকা: মাদকাসক্তি নামক ছোট অথচ ভয়ংকর শব্দটি বর্তমান বিশ্বে বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজের জন্য আরও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদিকাল থেকেই মানুষ নেশার জালে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এই নেশারই নাম মাদকাসক্তি। মাদকদ্রব্য বলতে এমন বস্তুগুলোকে বোঝায় যেগুলো শরীরে প্রবেশ করলে কিছু স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক ঘটে এবং বারবার এসব দ্রব্য গ্রহণের আগ্রহ জন্মায়। তবুও মানুষ যুগ যুগ ধরে এই নেশায় আক্রান্ত। এই নেশায় আক্রান্ত ব্যক্তি সহজে নেশা কাটিয়ে উঠতে পারে না। ফলে তার জীবনে নেমে আসে দুর্দিন এবং ঘন অন্ধকার।
মাদকাসক্তি কী: বিভিন্ন নেশার দ্রব্য গ্রহণ করে নেশা করার প্রবণতাই মাদকাসক্তি। নেশা ক্ষণিকের জন্য মনের যন্ত্রণা লাঘব করে, সব বেদনা থেকে রেহাই পেতে সাহায্য করে, নেশার ফলে বাস্তব চৈতন্যকে অবলুপ্ত করে তাকে নিয়ে যায় এক স্বতন্ত্র জগতে এসব বিশ্বাস থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তির বিকাশ ঘটে। মাদকদ্রব্য হিসেবে বহু উপকরণ রয়েছে। যেমন–মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, মারিজুয়ানা, চরস, প্যাথিডিন, ফেনসিডিল ইত্যাদি। সাম্প্রতিককালে হেরোইনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। জীবনের হতাশা, ব্যর্থতা, বিষাদ, মাদকদ্রব্য খাওয়ার কৌতূহল থেকেই মানুষের জন্য নেশা গ্রহণের সূত্রপাত ঘটে। জীবনের অস্থিরতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সঙ্গদোষ, কালো টাকার উত্তাপ ও ব্যয়ের অপরিচ্ছন্ন পন্থা যুবসমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর দিক: মাদকদ্রব্য গ্রহণের আসক্তি সুপ্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। এটি যুগে যুগে সমস্যার সৃষ্টি করছে। এক সময় চীন দেশের লোকজন আফিম খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিককালে মাদকাসক্তির প্রভাবে বহুলোকের সন্তানদের বিশেষত যুবসমাজের মধ্যে ধ্বংস নেমে আসছে, শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ অবক্ষয়ের। মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে বিভিন্ন রকম দৈহিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে দেহের অক্ষমতা বৃদ্ধি করে। মাদকাসক্তির ফলে মানসিক ভারসাম্যহীন্যতার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন চেতনানাশক মাদকদ্রব্য ব্যবহারের ফলে মানসিক আচ্ছন্নতা, দেহের মাংসপেশির কম্পন ও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। ফলে মাদকাসক্তির পরিণাম হিসেবে ব্যক্তিজীবনে আসে ব্যর্থতা এবং জাতির জন্য নেমে আসে দুর্দিন।
মাদকাসক্তির প্রভাব: সারা বিশ্বে মাদকাসক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক উন্নত দেশে মাদকাসক্তির ব্যাপকতা ওই জাতির জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাড়ায়। এই সর্বনাশা নেশা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকদ্রব্যের প্রসারের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। তবে তরুণ সমাজের মধ্যে এর সম্প্রসারণের প্রবণতা বেশি। শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা, বেকারত্বের অভিশাপ, দারিদ্র্যের গ্রাস এসব কারণে যুবসমাজ ক্রমেই নেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। নেশাগ্রস্তদের নৈতিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে তারা অন্যায় ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। মাদকদ্রব্যের দাম বেশি হওয়ায় নেশাগ্রস্তরা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনে তৎপর হচ্ছে।
আরো পড়ুন : কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ৩য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার: উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের যুবসমাজ মারাত্মকভাবে মাদকাসক্তির শিকার। বাংলাদেশে কী পরিমাণ মাদকদ্রব্য ব্যবহার করা হয় এবং কত লোক মাদকাসক্ত তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান এখনো নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে মোট জনসংখ্যার ১৭ ভাগ মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে। দেশে ৩৫০টি বৈধ গাঁজার দোকান আছে। দর্শনায় রয়েছে সরকার অনুমোদিত একমাত্র মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেশীয় মদ প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন ও বিক্রি হয়।
মাদকদ্রব্যের ব্যবহার: আজকাল মাদকদ্রব্য বিভিন্নভাবে সেবন করা হয়। এক ধরনের মাদক আছে যা নাকে টানা হয়। আবার কোনো মাদক ধোঁয়ার সঙ্গে সেবন করা হয়। কোনোটি গিলে খাওয়া হয়। আবার কোনোটি ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখের মতো মাদক সেবনকারী রয়েছে এবং এ সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়ছে। বিভিন্ন পেশাজীবী, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্যের ধরন বা প্রকার: বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য চালু রয়েছে। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম ইত্যাদি অনেক প্রাচীনকালের মাদকদ্রব্য। বর্তমানে হেরোইন, ইয়াবা, মারিজুয়ানা, এলএসডি, হাসিস, কোকেন, প্যাথিডিন, ফেনসিডিল ইত্যাদি বেশি প্রচলিত। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে হেরোইন সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাদকদ্রব্য। তবে বিশ্বব্যাপী ক্যাফেইন, নিকোটিন এবং অ্যালকোহল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক। অন্য মাদকদ্রব্যের চেয়ে এর দাম তুলনামূলক বেশি এবং মানুষকে নেশায় আক্রান্ত করে গভীরভাবে।
মাদক সেবনের কারণ: জীবনের প্রতি বিমুখতা ও নেতিবাচক মনোভাব থেকেই মাদকাসক্তির জন্ম। অভ্যাস থেকে আসক্তি, এ জন্য ধূমপান করা ব্যক্তি একদিন পরিণত হয় হেরোইন আসক্তিতে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যক্তিদের অনেক ভোগের উপকরণ রয়েছে। বর্তমানে সিনেমা ও টেলিভিশনে যেসব অশ্লীল নৃত্য, ছবি, কাহিনি ইত্যাদি দেখানো হয় সেসব অনুকরণ করতে গিয়ে তরুণ সমাজ তাদের নৈতিক অধঃপতন ডেকে আনছে। তা ছাড়া আবার অনেক সময় অস্থিরতা, কুচিন্তা, অভাব অনটন, পারিবারিক কলহের কারণে তরুণ সমাজ এই মোহের জালে আচ্ছন্ন হয়।
মাদকের উৎসভূমি: গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান) এবং গোল্ডেন ওয়েজ হেরোইনের মূল উৎস। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো আফিম। পপি ফুলের নির্যাস থেকে কৃষকরা তৈরি করেন কাঁচা আফিম। আফিম থেকেই তৈরি হয় সর্বনাশা হেরোইন। প্রাপ্ত তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, জ্যামাইকা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ের, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে মারিজুয়ানা উৎপন্ন হয়। হাসিস উৎপন্ন করার জন্য জ্যামাইকা, মরক্কো, জর্ডান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত ও নেপাল অধিক পরিচিত।
(বাকি অংশ ২য় পর্বে প্রকাশ করা হবে)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর