জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। কিন্তু কখনো কখনো সেই জীবনদাতার অনিচ্ছাকৃত ভুলেই নিভে যায় রোগীর জীবনপ্রদীপ। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর এমন ঘটনা হরহামেশাই খবরের শিরোনাম হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের ব্যাপারে ইসলামি শরিয়াহর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক আইনি কাঠামো রয়েছে? চিকিৎসকের দক্ষতা, অভিভাবকের অনুমতি এবং প্রেসক্রিপশনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এখানে নির্ধারিত হয় অপরাধ ও দণ্ড।
ইসলামি ফিকাহর বিধান অনুযায়ী, একজন চিকিৎসক যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হন, তবেই তার জন্য চিকিৎসা করা বৈধ। এই ধরনের স্বীকৃত চিকিৎসক যদি রোগীর অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্ত স্বীকৃত নীতিমালা (Medical Protocol) মেনে চিকিৎসা করেন, আর এর পরও দুর্ভাগ্যবশত রোগীর মৃত্যু হয়–তবে সেই চিকিৎসকের ওপর কোনো ধরনের আইনি বা আর্থিক দায় বর্তাবে না। একে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে দক্ষ চিকিৎসকও যদি রোগীর অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কিংবা স্বীকৃত নীতিমালার বাইরে গিয়ে খামখেয়ালিপূর্ণ চিকিৎসা করেন, তবে তাকে অবশ্যই দায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে:
সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি হলে: তাকে পূর্ণ ‘দিয়ত’ বা রক্তপণ (ক্ষতিপূরণ) দিতে হবে।
আংশিক ভুল পদ্ধতি হলে: তাকে অর্ধেক দিয়ত দিতে হবে।
বর্তমানে দেশে ভুয়া এবং অদক্ষ চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। ইসলামি আইনের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর। যিনি চিকিৎসার উপযুক্ত নন বা অদক্ষ, তার জন্য চিকিৎসা পেশায় আসাই সম্পূর্ণ নাজায়েজ বা হারাম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুনানে আবু দাউদের ৪৫৮৬ নম্বর হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি চিকিৎসাবিদ্যা না জেনে (অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও) কারও চিকিৎসা করে, (আর এতে রোগীর কোনো ক্ষতি হলে) তবে তাকেই এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তাই কোনো অদক্ষ ব্যক্তির চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হলে, রোগীর অভিভাবকের অনুমতি থাকুক বা না থাকুক এবং তিনি নীতিমালা মানুন বা না মানুন–তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে ‘পূর্ণ দিয়ত’ বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ইসলামি আইনে অপরাধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে সাজার ভিন্নতা রয়েছে। এই বিধানটি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন চিকিৎসায় ডাক্তারের হাত সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে; যেমন- সার্জারি বা অপারেশন করা, ইনজেকশন পুশ করা কিংবা নিজ হাতে রোগীকে ভুল ওষুধ খাওয়ানো।
কিন্তু ডাক্তার যদি শুধু কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন এবং পরে রোগী নিজে বা তার অভিভাবক বাজার থেকে এনে সেই ওষুধ সেবন করেন–তবে সেই ভুল ওষুধের কারণে মৃত্যু হলেও ডাক্তারের ওপর সরাসরি ‘যামান’ বা দিয়ত ওয়াজিব হয় না। তবে রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী অবহেলার জন্য তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ইসলামের এই সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ আইনি রূপরেখা একদিকে যেমন দক্ষ চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেয়, অন্যদিকে রোগীদের অধিকার নিশ্চিত করে অদক্ষদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক