সমাজে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার মতো ভয়াবহ ঘটনা আমাদের প্রতিনিয়ত নাড়া দেয় এবং এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করে। শিশুরা যেহেতু শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল, তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। একটি নিরাপদ শৈশবই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক করে গড়ে তোলে। লিখেছেন রোদসী
শিশুর সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা
শিশুর নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তার সঙ্গে খোলামেলা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা। অনেক পরিবারে দেখা যায়, শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় না বা ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যার ফলে শিশু নিজের সমস্যা বা অস্বস্তি প্রকাশ করতে পারে না। অথচ শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে নির্দ্বিধায় তার অনুভূতি, ভয়, অস্বস্তি বা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে।
প্রতিদিনের ছোট ছোট কথোপকথন যেমন স্কুল কেমন গেল, কার সঙ্গে খেলল, কী ভালো বা খারাপ লাগল এসব অভ্যাস শিশুর মানসিক নিরাপত্তা তৈরি করে।
শরীরের সীমানা ও নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া
শিশুকে তার শরীর সম্পর্কে বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাকে বোঝাতে হবে কোন ধরনের স্পর্শ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি অস্বস্তিকর বা অনুচিত। এই শিক্ষা ভয় দেখিয়ে নয়, বরং আত্মসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে দিতে হবে।
শিশুকে শেখাতে হবে, যদি কেউ তাকে এমনভাবে স্পর্শ করে বা এমন কিছু বলে যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে সে যেন সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য বড়দের বিশেষ করে বাবা-মা বা শিক্ষককে জানায়। শিশুকে এই বার্তা দিতে হবে যে, সে কোনো অবস্থাতেই দোষী নয় এবং সব সময় সাহায্য পাওয়া সম্ভব।
অপরিচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা
শিশুকে অপরিচিত মানুষের বিষয়ে সতর্কতা শেখানো প্রয়োজন, তবে আতঙ্ক তৈরি না করে। তাকে বোঝাতে হবে যে, সব অপরিচিত মানুষ খারাপ নয়, কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকা জরুরি।
যেমন কেউ যদি তাকে ডেকে নেয়, কোনো উপহার দেয় বা একা কোথাও যেতে বলে, তাহলে সে যেন আগে অভিভাবকের অনুমতি নেয়। একই সঙ্গে ‘না বলা’ শেখানোও গুরুত্বপূর্ণ শিশু যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অস্বস্তিকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
দৈনন্দিন চলাফেরা ও নিরাপদ রুটিন
শিশুর দৈনন্দিন রুটিন যতটা সম্ভব নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। স্কুলে যাওয়া-আসার পথ, সময় এবং সঙ্গী সম্পর্কে অভিভাবকের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। অচেনা পরিবেশে শিশুকে একা না পাঠানো এবং নির্ভরযোগ্য পরিবহন বা দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুকে তার আশপাশের নিরাপদ স্থান যেমন পুলিশ স্টেশন, পরিচিত দোকান বা প্রতিবেশীর বাড়ি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যেতে পারে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে সে সাহায্য নিতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন ঝুঁকি
বর্তমান যুগে শিশুদের নিরাপত্তা শুধু বাস্তব জগতে নয়, ডিজিটাল দুনিয়াতেও নিশ্চিত করতে হয়। মোবাইল, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক সময় অচেনা ব্যক্তি শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুর অনলাইন কার্যক্রম নজরদারি করা, বয়স উপযোগী কনটেন্ট নিশ্চিত করা এবং অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া।
আচরণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ
শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন যেমন অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গা বা ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলা এসব লক্ষণকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। অনেক সময় শিশু সরাসরি কিছু না বললেও তার আচরণেই অস্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো বিচার না করে ধৈর্যসহকারে শিশুর কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া।
সামাজিক দায়িত্ব ও সম্মিলিত প্রতিরোধ
শিশু নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতিবেশী, শিক্ষক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবাইকে শিশুদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে। কোনো সন্দেহজনক আচরণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখলে তা উপেক্ষা না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।