প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর কতটা সফল বা ব্যর্থ তা নিয়ে জনমনে যেমন ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে, তেমনি এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই সফরে ঢাকা-বেইজিং কতটা কাছাকাছি এল বা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য কতটা চিন্তার কারণ হলো, তা নিয়েও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক প্রতিশ্রুতি ততটা না মিললেও নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত সম্পর্কের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতার পরীক্ষায় যেতে হবে। এই সফরে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা-বেইজিংকে কৌশলগত সহযোগিতায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে টু প্লাস টু কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়টি অন্য পরাশক্তি দেশ বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে চিন্তায় ফেলতে পারে। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
তাতে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে তারেক রহমান তা বাস্তবায়ন করবেন এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ঢাকা-বেইজিং টু প্লাস টুর বিষয়টি ট্রাম্পের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এ ছাড়া তাইওয়ানের একক স্বাধীনতা ও সার্বভৗমত্ব ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান তাতে বিএনপি সরকারের এক চীন-নীতিতে মতপার্থক্য স্পষ্ট। গত অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে ছিল, সেখান থেকে বাংলাদেশকে বের করে এনে একটি স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির সঙ্গে চীনের কমিউনস্টি পার্টির সমঝোতা স্মারক সই একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ফলে চীনের সঙ্গে এমন এক রাজনৈতিক বন্ধনে যুক্ত হলো বিএনপি সরকার, যেটা যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের জন্য সতর্ক বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ যাতে বেশি মাখামাখি না করে। কিন্তু এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র যেটা চায় না, সেই সম্পর্কের দিকে এগিয়ে গেছে বর্তমান সরকার।
এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও যোগাযোগ ও অর্থনীতির পরিধি বাড়াতে মায়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে বেইজিং। সফরের শেষ দিন গত শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এই করিডরের মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো এবং বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করা।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে গতকাল শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডরের ধারণা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। এটি একটি প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মায়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু মায়ানমারের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে চীনের ইউনানে নানা পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়, সেখান থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযোগ হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যয় ও সময় দুই-ই কমবে। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে মায়ানমারের রাখাইন হয়ে ত্রিদেশীয় একাধিক রুট তৈরি করেও বাণিজ্য-সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ আছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, সফরে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সেগুলো যদি বাস্তবায়ন করতে পারে সরকার, তাহলে এটিকে ইতিবাচক বলা যাবে। আর যদি অন্য পরাশক্তির চাপে বাস্তবায়ন না করতে পারে তাহলে সফরকে ইতিবাচক বলার সুযোগ নেই। তবে এই সফরের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে– পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ এবং ত্রিদেশীয় ইকোনমিক করিডর চালুর বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠোর বাণিজ্য চুক্তি নির্বাচনের তিন দিন আগে যেমন অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারে, এর বাইরে গিয়ে চীনের সঙ্গেও যে কৌশলগত সম্পর্কের চুক্তি করতে পারে বিএনপি সরকার, সেটা এই সফরে করেছে। এখানে চীন দেখার চেষ্টা করছে, বাংলাদেশ সরকার এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করতে কতটা সক্ষম। বাংলাদেশ সরকার যদি সেই সক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাহলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্রে এক পা রেখে সেটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সম্পর্ক এগোবে না।
তিনি আরও বলেন, এই সফরে বিএনপির সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সমঝোতা স্মারক চুক্তিটি ভালো হয়েছে। এটি চীনের এমন এক দলের সঙ্গে করা হলো, যে দলটি চীনের সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কাজেই দুই দেশের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যদি সুসম্পর্ক ভালো থাকে তাহলেও সব সহযোগিতায় এগিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা–এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ‘টু প্লাস টু’ একটা সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে। যেখানে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি যারা রয়েছেন, তাদের নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে সংলাপ শুরু হবে।
এ ছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মায়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর ভালো হয়েছে বলেই আমরা মনে করছি। ভালো বলছি এ কারণে যে, যেসব বিষয় আমরা চেয়েছিলাম তার সবই হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এর কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আছে। এই সফরের ফলে সেই সহযোগিতাগুলো নতুনমাত্রা পাবে। নতুন নতুন ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা বাড়বে।
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা ঠিক করিডর নয়, এটা হচ্ছে–কানেকটিভিটি। অর্থনৈতিক কানেকটিভিটিকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকে ভাবতে হবে। এর সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। এটি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ হতে পারে। আর চীনের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতাও ইতিবাচক বলে মনে করেন তিনি। তবে এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সেটা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ কোনো দেশ একটা বিষয় নির্বাচনের আগে চাপিয়ে দিলে সেটা মানতে হবে– এটা ঠিক নয়।