ধীরে ধীরে বিশ্বকাপ ফুটবল এগিয়ে চলেছে শেষের দিকে। গ্রুপ পর্যায়ের লড়াই শেষে আজ (২৯ জুন) থেকে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্বের যুদ্ধ। বিশ্বকাপের আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেখানে ভুলের সুযোগ নেই। আসবে না ভুল সংশোধনের সুযোগ। জিতলেই সামনে এগিয়ে যাওয়া, হারলেই বিদায়। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের সূচনাতে মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডা। উভয় দল এবারই প্রথমবার নকআউট পর্বে খেলছে। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন কীর্তি গড়ার সুযোগ উভয় দলের। জিতলেই নতুন ইতিহাস, শেষ ষোলোতে পৌঁছানো। আরও একধাপ উঁচুতে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ গ্রুপে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে জায়গা করে নেয়। কানাডা ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ দল। গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে তারা গ্রুপ সেরা হওয়ার সুযোগ হারিয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা চমকের পর চমক তৈরি করেছে। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়াকে অপেক্ষায় রেখে তারা আগেভাগে নকআউট পর্বে খেলা নিশ্চিত করে। এশিয়ার পাওয়ার হাউসখ্যাত দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে শেষ বত্রিশে খেলার টিকিট নিয়ে নেয়।
কাগজে-কলমে এই লড়াইকে মোটেও বড় লড়াই বলা যাবে না। কিন্তু দুই দলের জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব মোটেও কম নয়। হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের মতো শক্তিশালী দল তারা নয়, সেই স্বপ্নও তারা এ মুহূর্তে দেখে না। তবে এটি এমন এক ম্যাচ যে ম্যাচে ইতিহাস লেখা হতে পারে। বিশ্বকাপে তারা আগে কখনো মুখোমুখি হবে। একটা মাত্র প্রীতি ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের। ২০০৭ সালের সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ গোলে জয় পেয়েছিল। অবশ্য এই পরিসংখ্যান আজকের ম্যাচে কোনো প্রতিফলন ফেলতে পারবে না বলা যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপপর্বে নিজেদের সংগঠিত দল হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও তাদের রক্ষণ ছিল দুর্দান্ত। বিশেষ করে দ্রুত প্রতি আক্রমণ ও শারীরিক সক্ষমতা তাদের বড় শক্তি। মাঝমাঠে বল পুনরুদ্ধার করে দ্রুত আক্রমণে ওঠার দক্ষতা কানাডার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। তাদের আত্মবিশ্বাস থাকবে তুঙ্গে। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ফলে দুর্দান্ত মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা নকআউট পর্বে খেলবে।
অন্যদিকে কানাডা এসেছে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পরিচয় দিয়ে। গ্রুপপর্বে তাদের সবচেয়ে বড় বার্তা ছিল–সুযোগ পেলে তারা নির্মম হতে জানে। বিশেষ করে কাতারের বিপক্ষে গোলবন্যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে বহুগুণে। গ্রুপপর্বে আট গোল তাদের। হজম করতে হয়েছে তিন গোল। দক্ষিণ আফ্রিকাও তিন গোল হজম করেছে। তবে গোল করায় অতটা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি বাফানা বাফানারা। মাত্র দুই গোল করেছে। একটা চেক প্রজাতন্ত্রের জালে, একটা দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে।
দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মোটেও সমর্থকদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এ বছর দক্ষিণ আফ্রিকা একটা মাত্র ম্যাচে জয় পেয়েছে। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। কানাডার অবস্থাও তেমনই। বিশ্বকাপে এক জয়সহ মোট জয়ের সংখ্যা দুই। জিতলেই ইতিহাস এমন ম্যাচের আগে কানাডার জন্য স্বস্তির বিষয় ইনজুরিমুক্ত হয়ে দলে ফিরেছেন তারকা খেলোয়াড় ডিফেন্ডার আলফনসো ডেভিস। ইনজুরির কারণে এখনো তিনি মাঠে নামতে পারেননি। এদিক দক্ষিণ আফ্রিকা দলে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা শেষে দলে ফিরছেন মাঝমাঠের তেবোহো মোকোয়েনা। তবে লাল কার্ডের কারণে এ ম্যাচে স্বাভাবিকভাবেই থাকছেন না ফরোয়ার্ড থেম্বা জোয়ানে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘নকআউট পর্বে ছোট ভুলও বড় শাস্তি ডেকে আনতে পারে। আমরা জানি কানাডা দ্রুতগতির ও আক্রমণাত্মক দল। তাই আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকলে আমরা ভালো করতে পারব। গ্রুপপর্বে আমরা আমাদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছি। কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা লড়াই করতে পারি। এখন মানসিক দৃঢ়তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়ার সময় এখন।’
দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক রনওয়েন উইলিয়ামসও আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘এই পর্যায়ে এসে কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। আমাদের প্রত্যেককে শতভাগ দিতে হবে। আমরা শুধু ম্যাচ খেলতে নামছি না, দেশের জন্য ইতিহাস গড়তে নামছি।’
কানাডার শিবিরেও আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই। দলের কোচ হেসে মার্শ জানিয়েছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা সংগঠিত দল। তারা রক্ষণে বেশ শক্ত। প্রতি আক্রমণে বিপজ্জনক। কিন্তু নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। আমরা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাই। নকআউট ফুটবলে সাহসী হতে হয়। সুযোগ তৈরি করেই থেমে গেলে হবে না, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।’
কানাডার অধিনায়ক আলফনসো ডেভিস বলেন, ‘এটাই সেই মঞ্চ, যেখানে বড় খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণ করে। আমরা দল হিসেবে অনেক দূর এসেছি। এখন আর থামতে চাই না। আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই। মাঠে চাপ থাকবে, আবেগ থাকবে। তবে আমরা মাথা ঠাণ্ডা রেখে এগিয়ে যেতে চাই। মাথা ঠাণ্ডা রাখাটাই জরুরি। নিজেদের মাঠে খেলার বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে চাই।’
সব মিলিয়ে রবিবারের লড়াই শুধু দুই দলের ম্যাচ নয়। এটি স্বপ্ন টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। সাহসের পরীক্ষা। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের গল্প নতুন করে লেখার সুযোগ। দেখার পালা শেষ হাসি কার– বাফানা বাফানা নাকি ম্যাপল লিফের যোদ্ধাদের।