বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন মাত্র এক দিন। এরপর আর কখনো শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ হয়নি। সংসারের অভাব-অনটন তাকে বই থেকে নয়, স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যে মানুষটির আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে গিয়েছিল, তিনি থামিয়ে রাখেননি নিজের শেখার পথ। বইকেই করেছেন শিক্ষক। বইকেই বানিয়েছেন আজীবনের সঙ্গী। বইয়ের আলোয় নিজেকে গড়ে তুলেছেন স্বশিক্ষিত, আলোকিত মানুষ হিসেবে। বইয়ের জগতে বিচরণ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার মাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের (৫৭) জীবন যেন বইয়ের পাতায় লেখা এক অনুপ্রেরণার গল্প। ছোট্ট একটি টিনের ঘরে তার বসবাস। বাইরে থেকে সাধারণ সেই ঘরটির ভেতরে রয়েছে অন্য এক রত্নভান্ডার। এক পাশে শোয়ার জায়গা, অন্য পাশে সারি সারি বই। ঘরে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করতে হয়, কিন্তু সেই ঘরে বসে যে মানুষটি জ্ঞানের সাধনা করেন, তার চিন্তার পরিধি অনেক বিস্তৃত। অনেক গভীর।
কৃষক উপেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের বড় ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। তবে তার শিক্ষা শুরু হয়েছিল গৃহেই। মা গীতা রানী, যিনি নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন, তিনিই ছেলের প্রথম বর্ণপরিচয় ঘটান। সেই সামান্য শিক্ষাই হয়ে ওঠে তার সারা জীবনের জ্ঞানের ভিত্তি।
এক দিন গ্রামের শিক্ষক এরফান কাকা তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। শ্রেণিকক্ষে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ পড়তে দিলে ছোট্ট সত্যেন্দ্রনাথ সেগুলো অনর্গল পড়ে শোনান। শিক্ষক বিস্মিত হন। কিন্তু সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম এবং শেষ স্কুলে যাওয়া। এরপর অভাব-অনটনের বাস্তবতা তাকে আর বিদ্যালয়ের পথে ফিরতে দেয়নি। তবে শিক্ষা থেকে নয়, তিনি দূরে ছিলেন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। সমবয়সী বন্ধুদের স্কুলে যেতে দেখে তার ভেতরে জন্ম নেয় জানার ও শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কৈশোরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। প্রথমে উপন্যাস, তারপর ধীরে ধীরে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সমাজচিন্তা–একসময় বইয়ের জগৎই হয়ে ওঠে তার প্রকৃত শিক্ষাঙ্গন।
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজও থামেনি। বই পড়ে তিনি আজ বিস্ময়কর এক জ্ঞানভান্ডার। তার বিশ্বাস, ‘বইপুস্তক বা সাহিত্যচর্চা ছাড়া মানবতার পূর্ণ বিকাশ হয় না।’ জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজের পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পদাবলী কীর্তন গেয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ভ্রমণের প্রতিটি পথই তার কাছে ছিল বই খোঁজার নতুন নতুন সুযোগ। রেলস্টেশনের ছোট্ট লাইব্রেরি, পুরোনো বইয়ের দোকান কিংবা যেখানেই ভালো বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন, সেখান থেকেই সংগ্রহ করেছেন। আজও কোনো বই ভালো লাগলে সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন।
নিজে কখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলেছেন স্বপ্নসম উচ্চতায়। বড় ছেলে সঞ্জয় কুমার প্রামাণিক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে কাজ করছেন। মেয়ে নীপা প্রামাণিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সত্যেন্দ্রনাথের বিশ্বাস, তার বইপড়ার অভ্যাসই সন্তানদের পড়াশোনায় অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে বুঝত। আমার বই পড়ার ঝোঁক তাদেরও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।’
তার ছোট ভাই ভবেন্দ্রনাথ প্রামাণিক বর্তমানে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তবুও বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথকেই তিনি নিজের অন্যতম শিক্ষক মনে করেন। তার স্মৃতিতে এখনো ভাসে বিদ্যুৎবিহীন রাতের সেই দৃশ্য–তেলের বাতির ক্ষীণ আলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ে গেছেন সত্যেন্দ্রনাথ। বাবার বকুনি, সংসারের অভাব–কিছুই তাকে বই থেকে দূরে রাখতে পারেনি।
নিজের লেখাপড়ার সুযোগ না থাকলেও ছোট দুই ভাইকে মানুষ করতে, তাদের শিক্ষিত করে তুলতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন তিনি। আজ সেই ত্যাগকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প আমাদের বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধু আক্ষেপ একধরনের অপূর্ণতার। তার মনে নতুন গান আসে, নতুন সুর জন্ম নেয়। কীর্তন গাইতে পারেন, কিন্তু লিখে রাখতে পারেন না। লেখার অক্ষমতাই তার জীবনের একমাত্র আক্ষেপ। তবুও তিনি থেমে যাননি। প্রতিদিন বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে তিনি নতুন করে জীবনকে চিনতে শেখেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ ছাড়াও একজন মানুষ যে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে পারেন, সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক তার জীবন্ত উদাহরণ। তার জীবন যেন বলে–বিদ্যালয়ে যাওয়া নয়, শেখার ইচ্ছাই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে তোলে।
সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক বলেন, ‘আমি স্কুলে পড়ার সুযোগ পাইনি, কিন্তু বইকে কখনো ছেড়ে দিইনি। আমার বিশ্বাস, মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক বই। বই মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষ হতে শেখায়। আজ যদি আমার জীবনে কোনো আলোর দিক থেকে থাকে, সেটি এই বই পড়ার অভ্যাসের কারণেই অর্জিত হয়েছে।’